নিকারাগুয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় পরিষদে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করার একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর। কয়েক দিন আগে তিনি বলেছিলেন, ‘সরকার দখল বা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করার জন্য তাদের আর কোনো নির্বাচন হবে না।’ ওর্তেগার এই বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক। তিনি বলেন, নিকারাগুয়ার সব রাজনৈতিক মতের মানুষের ভোট দেওয়ার এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ৮০ বছর বয়সী ওর্তেগা ২০০৭ সাল থেকে নিকারাগুয়ার ক্ষমতায় আছেন। তার শাসনামলে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই কঠোর হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার অনেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং অনেকের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে।
রবিবার ১৯৭৯ সালের সানদিনিস্তা বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক ভাষণে ওর্তেগা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ওই বিপ্লবের সময় তিনি যে বামপন্থী সানদিনিস্তা দলের সদস্য ছিলেন, সেই দল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত স্বৈরশাসক আনাস্তাসিও সোমোসাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল। ভাষণে ওর্তেগা অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত বিরোধী গোষ্ঠীগুলো ‘ষড়যন্ত্র করছে’ এবং নির্বাচন জয়ের জন্য সংগঠন তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘অভ্যুত্থানকারীদের ঠেকাতে একটি দেয়াল তৈরি করার’ জন্য নতুন আইন করা হবে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যত অর্থই তারা পাক না কেন, বিরোধীরা ক্ষমতা দখল করতে পারবে না।
ওর্তেগার বক্তব্যের নিন্দা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, এই মন্তব্য ওর্তেগা সরকারের ‘আসল কর্তৃত্ববাদী চরিত্র’ প্রকাশ করেছে। রুবিও আরো বলেন, ওর্তেগা এবং তার স্ত্রী রোসারিও মুরিয়ো, যাকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ‘সহ-রাষ্ট্রপতি’ ঘোষণা করেছেন, তারা এখন ‘জনসমর্থনের ভান করাটাও ছেড়ে দিয়েছেন’। তবে নিকারাগুয়ার জাতীয় পরিষদের প্রধান গুস্তাভো পোররাস এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সরকারপন্থী একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আইনসভা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নির্বাচন কর্তৃপক্ষ আলোচনা করছে কীভাবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা যায়।
নিকারাগুয়ার সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের নভেম্বরে। সেই নির্বাচনে ওর্তেগা জয়ী হন। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের গ্রেপ্তার করা হয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয় অথবা দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া বিরোধী দলের আরো অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন কম পরিচিত প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যাদের বড় ধরনের জনসমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় পরিষদ একটি সাংবিধানিক সংস্কার অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করা হয়। নতুন ব্যবস্থার অধীনে রোসারিও মুরিয়োও ‘সহরাষ্ট্রপতি’ হন। এর ফলে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওর্তেগাকে যদি দায়িত্ব পালনে অক্ষম ঘোষণা করা হয় তাহলে মুরিয়োর ক্ষমতা গ্রহণের পথ সহজ হবে।
২০১৮ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর থেকে দেশটিতে প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নির্বাসনে থাকা বিরোধী রাজনীতিকরা ওর্তেগার নতুন উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিরোধী নেতা হুয়ান সেবাস্তিয়ান চামোরো বলেন, এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ওর্তেগা নিকারাগুয়াকে চীন, উত্তর কোরিয়া ও কিউবার মতো একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান। সাবেক বিরোধী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফেলিক্স মারাদিয়াগা, যিনি ওর্তেগা সরকারের সময় কারাবন্দি ছিলেন। তিনি এএফপিকে বলেন, এই উদ্যোগ দেখায় যে ওর্তেগা ভিন্নমতকে ভয় পান। তিনি বলেন, ‘ওর্তেগা বুঝতে পারছেন, তিনি বিরোধীদের পুরোপুরি দমন করতে পারেননি। তিনি জানেন, পরিবর্তনের ইচ্ছা এখনো মানুষের মধ্যে রয়েছে এবং মানুষ এখনো দেশের জন্য লড়াই করছে।’








