• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

জন্মের পূর্বেই যে চার বিষয়ের ফায়সালা হয়ে যায়

ভিসা কেনাবেচার ব্যবসা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
ভিসা কেনাবেচার ব্যবসা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান সময়ে বিদেশে কর্মসংস্থান, ব্যবসা কিংবা বসবাসের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের ভিসার ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে অনেক স্থানে ‘ভিসা ব্যবসা’ নামে একটি প্রচলিত প্রথা গড়ে উঠেছে। দেখা যায়, কেউ সরকারি বা কোম্পানির দেওয়া ভিসা অধিক মূল্যে বিক্রি করছেন, আবার কেউ ভিসা সংগ্রহে নিজের খরচ ও পরিশ্রমের বিনিময়ে নির্ধারিত অর্থ নিচ্ছেন। এ দুটি বিষয়কে অনেকে একই মনে করলেও ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এদের বিধান এক নয়। 

কেননা ভিসা নিজেই কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়; বরং এটি একটি অনুমতিপত্র। তাই এর ওপর শরিয়তের সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান প্রযোজ্য হয় না। তবে ভিসা সংগ্রহে বৈধ সেবা, সময়, শ্রম ও ব্যয়ের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম বৈধ ব্যবসাকে অনুমোদন দিয়েছে; কিন্তু এমন কোনো লেনদেন বৈধ নয়, যেখানে বিক্রয়ের উপযুক্ত বস্তুই নেই বা অন্যায়ভাবে অর্থ গ্রহণ করা হয়।

ভিসা কি ব্যবসার পণ্য?
শরিয়তের দৃষ্টিতে বিক্রয়যোগ্য বস্তুর কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন— এক. তা মাল (সম্পদ) হতে হবে। দুই. বিক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে। তিন. শরিয়তসম্মতভাবে হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে। কিন্তু ভিসা কোনো সম্পদ নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্রদত্ত প্রবেশ বা কাজের অনুমতি। ফলে এটি স্বাধীনভাবে কেনাবেচার পণ্য নয়। এ কারণেই ফুকাহায়ে কেরাম (নিরেট অধিকার)-এর ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ বলেননি।

আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ির গ্রন্থে এসেছে, ‘নিরেট অধিকার-এর বিনিময় বা বিক্রয় বৈধ নয়।’ আবার রাদ্দুল মুহতার-এ আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, ‘অগ্রক্রয়ের অধিকার (حق الشفعة)-এর মতো বিমূর্ত অধিকার বিক্রি করা যায় না। এর ওপর ওয়াকফ বা হিবা (দান) করাও বৈধ নয়।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৪/৫১৮, ৭/৩৩–৩৪)
অতএব, ভিসা যেহেতু একটি অনুমতিগত অধিকার, তাই সেটিকে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে বিক্রি করা শরিয়তের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাহলে ভিসার জন্য অর্থ নেওয়া কখন বৈধ?
যদি কোনো ব্যক্তি—
১. ভিসা সংগ্রহে বৈধভাবে আবেদন করেন,
২. দৌড়ঝাঁপ করেন,
৩. কাগজপত্র প্রস্তুত করেন,
৪. সময় ও শ্রম ব্যয় করেন,
৫. সরকারি ফি বা অন্যান্য বৈধ খরচ বহন করেন,

তাহলে তিনি তার প্রকৃত ব্যয় এবং বৈধ সেবার পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারবেন। এটি ভিসা বিক্রি নয়; বরং বৈধ সেবা বা প্রতিনিধিত্ব-এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ।

কখন ভিসা বিক্রি হারাম হবে?
নিম্নোক্ত অবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বৈধ হবে না—
১. কোম্পানি বা সরকার কাউকে বিনামূল্যে ভিসা দিয়েছে কর্মী আনার জন্য;
২. ভিসা সংগ্রহে কোনো ব্যক্তিগত ব্যয় বা শ্রম হয়নি;
৩. শুধুমাত্র ‘ভিসা আছে’—এই কারণে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

এক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে বিক্রি হচ্ছে একটি অনুমতি, যা বিক্রয়যোগ্য সম্পদ নয়। ফলে এভাবে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ অন্যায় উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত হবে।

সুতরাং ভিসা নিজেই কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। এটি একটি অনুমতিপত্র বা নিরেট অধিকার মাত্র। আর ‘কোনো জিনিসের শুধুমাত্র অধিকার’ সাধারণভাবে কেনাবেচা করা শরিয়তসম্মত নয়। তবে ভিসা সংগ্রহে প্রকৃত খরচ, বৈধ শ্রম, সময় ও সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ বৈধ। কোনো খরচ বা শ্রম ছাড়াই শুধু ভিসার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বৈধ নয়। দালালি, এজেন্সি বা প্রতিনিধিত্বের সেবার পারিশ্রমিক এবং ভিসা বিক্রি—এ দুটি বিষয় এক নয়।

ইসলাম মানুষের উপার্জনকে হালাল ও স্বচ্ছ রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ভিসাকে ব্যবসার পণ্য বানিয়ে মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে, যদি কেউ বৈধভাবে সেবা প্রদান করে তার ন্যায্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রকৃত শ্রম, ব্যয় বা বৈধ সেবার বিনিময় ছাড়া শুধুমাত্র ভিসাকে পণ্য বানিয়ে অধিক মূল্যে বিক্রি করা ইসলামী ফিকহের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, এ বিষয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উচিত আল্লাহভীতি অবলম্বন করা, সন্দেহজনক লেনদেন থেকে বিরত থাকা এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য মুফতিদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ঘটনার আলোকে ফতোয়া গ্রহণ করা। কারণ হালাল উপার্জন শুধু দুনিয়ার বরকতেরই কারণ নয়; বরং আখিরাতের সফলতারও অন্যতম ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুক। আমিন। 

প্রিয়জনের বিচ্ছেদে পঠিতব্য দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
প্রিয়জনের বিচ্ছেদে পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

প্রিয়জনের বিচ্ছেদ মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। বাবা-মা, সন্তান, জীবনসঙ্গী, আত্মীয় কিংবা প্রিয় কোনো মানুষের মৃত্যু বা বিচ্ছেদ হৃদয়কে গভীরভাবে শোকাহত করে। এমন মুহূর্তে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন, কিন্তু ইসলাম শোককে হতাশায় নয়—ধৈর্য, দোয়া ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসায় রূপান্তর করতে শিক্ষা দেয়। তাই বিপদ-আপদ ও প্রিয়জন হারানোর বেদনাময় সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতকে একটি মহামূল্যবান দোয়া শিখিয়েছেন। দোয়াটি হলো—

 إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

উচ্চারণ : ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহুম্মা আজুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়া আখলিফ লী খাইরাম মিনহা।
অর্থ : নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১৮)

সুরা মুলক তিলাওয়াতের মহিমান্বিত ফজিলত

মুফতি ওমর বিন নাছির
সুরা মুলক তিলাওয়াতের মহিমান্বিত ফজিলত
সংগৃহীত ছবি

মৃত্যুর পরই শুরু হয় আখিরাতের প্রথম ধাপ—আলমে বরজাখ বা কবরের জীবন। এ জীবনে সফলতার জন্য প্রয়োজন ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর রহমত। তাই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এমন কিছু আমল নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা আখিরাতের পথে আলোর দিশা হয়ে দাঁড়ায়। সেই মহামূল্যবান আমলগুলোর অন্যতম হলো প্রতিদিন সুরা মুলক তিলাওয়াত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সুরার এমন ফজিলতের কথা জানিয়েছেন, যা প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে এ সুরার প্রতি বিশেষ ভালোবাসা সৃষ্টি করে।

সুরা মুলক পবিত্র কোরআনের ৬৭তম সুরা। এতে মোট ৩০টি আয়াত রয়েছে। ‘মুলক’ অর্থ—রাজত্ব, সার্বভৌমত্ব ও সর্বময় ক্ষমতা। সুরার শুরুতেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—‘অতি বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১)
এই সুরায় আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টি জগতের নিখুঁত ব্যবস্থা, মৃত্যু ও জীবনের উদ্দেশ্য, কিয়ামত, জান্নাত-জাহান্নাম এবং মানুষের জবাবদিহিতার বিষয় অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

সুরা মুলক পাঠের মহিমান্বিত ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোরআনে ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সুরা আছে। তা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, অবশেষে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সেটি হলো—‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’।” (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪০০)»

অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘এটি (সুরা মুলক) কবরের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী।’ (সুনান নাসায়ি)

সহিহ হাদিসে আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা সাজদা ও সুরা আল-মুলক তিলাওয়াত না করে ঘুমাতে যেতেন না।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯২)
এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তিলাওয়াত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

সুরা মুলকের বিষয়বস্তু
১. আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার ঘোষণা (আয়াত ১–৪) এ অংশে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, জীবন-মৃত্যুর উদ্দেশ্য এবং সাত আসমানের নিখুঁত সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

২. জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতা (আয়াত ৫–১৫) অবিশ্বাসীদের পরিণতি, জাহান্নামের ভয়াবহতা এবং মুমিনদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ তুলে ধরা হয়েছে।

৩. আল্লাহর শাস্তির সতর্কবার্তা (আয়াত ১৬–২২) মানুষকে অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

৪. মানুষকে আত্মসমালোচনার আহ্বান (আয়াত ২৩–২৪) আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন—তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় দিয়েছেন; অথচ মানুষ খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

৫. কিয়ামত সম্পর্কে মানুষের প্রশ্ন (আয়াত ২৫–২৭) অবিশ্বাসীরা কিয়ামতের সময় জানতে চাইলেও এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

৬. আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার শিক্ষা (আয়াত ২৮–৩০) শেষ আয়াতগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবন, পানি, রিজিক—সবকিছুই আল্লাহর দান; তিনি চাইলে মুহূর্তেই তা কেড়ে নিতে পারেন।

কখন সুরা মুলক পড়বেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা সাজদা ও সুরা মুলক তিলাওয়াত না করে কোনো দিন ঘুমাতেন না। তার মানে এই নয় যে সুরাটি দিনে পড়া যাবে না। যেকোনো সময়ই পড়া যাবে, তবে রাতে বিশেষ জিকির হিসেবে এ সুরা পড়া উত্তম। সুরাটি নামাজের সঙ্গে পড়াও ভালো। মুখস্থ না থাকলে দেখে দেখে অর্থ বুঝে পড়লে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়।

আমাদের করণীয়
১. প্রতিদিন রাতে সুরা মুলক তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা।
২. সুরাটি মুখস্থ করার চেষ্টা করা।
৩. অর্থ ও তাফসির বুঝে পড়া।
৪. এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
৫. সন্তানদেরও এ সুরা শেখানো।

সুরা মুলক আল্লাহর মহিমা, আখিরাতের জবাবদিহি এবং ঈমানকে দৃঢ় করার এক অনন্য শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সুরার বিশেষ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন এবং নিয়মিত তিলাওয়াতের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত প্রতিদিন বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে এ সুরা পাঠ করা, এর অর্থ অনুধাবন করা এবং এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গঠন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুরা মুলকের বরকত লাভের তাওফিক দান করুন, কবরের শাস্তি থেকে হেফাজত করুন এবং কিয়ামতের দিন এ সুরার সুপারিশ নসিব করুন। আমিন।
 

জুমার দিন সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

মুফতি ওমর বিন নাছির
জুমার দিন সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী
সংগৃহীত ছবি

সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে জুমার দিন আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময়। এটি মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এই দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে এবং কিয়ামতও সংঘটিত হবে জুমার দিনেই। তাই জুমার দিন শুধু একটি ইবাদতের দিন নয়; বরং এটি ঈমান, আত্মশুদ্ধি, ঐক্য ও আখিরাতের স্মরণে নিজেকে প্রস্তুত করার এক মহামূল্যবান সুযোগ। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের ফজিলতের পাশাপাশি এ দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত ভবিষ্যতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারও সংবাদ দিয়েছেন। এসব ভবিষ্যদ্বাণী মানুষের জন্য সতর্কবার্তা, যাতে তারা গাফিলতি ছেড়ে আল্লাহর পথে ফিরে আসে এবং কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

১. কিয়ামত সংঘটিত হবে জুমার দিনেই
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দিনগুলোর ওপর সূর্য উদিত হয়, তার মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এ দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, এ দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে এবং কিয়ামতও সংঘটিত হবে জুমার দিনেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)

এ হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রতি জুমা কিয়ামতের একটি স্মারক। তাই প্রতিটি জুমাকে আখিরাতের প্রস্তুতির নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

২. জুমার দিন এমন একটি সময় রয়েছে, যখন দোয়া কবুল হয়
নবী (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম বান্দা সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কল্যাণের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ অবশ্যই তা কবুল করেন।’ এরপর তিনি হাতের ইশারায় বোঝালেন, সেই সময়টি খুবই অল্প।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৫২)

আলেমদের অধিকাংশের মতে, এই সময়টি আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

৩. দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না
রাসুলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘মদিনার প্রতিটি প্রবেশপথে ফেরেশতা পাহারায় থাকবে। তাই সেখানে প্লেগ এবং দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৮০)

আরো বর্ণিত হয়েছে, দাজ্জাল জুমার দিন মদিনার নিকটবর্তী এক লবণাক্ত প্রান্তরে অবস্থান করবে এবং শহরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হবে। এটি মহানবী (সা.)-এর একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী, যা শেষ যুগের ঘটনাবলির অংশ।

৪. জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পাঠের নির্দেশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। অতএব এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কেননা তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

এ হাদিস অনুযায়ী জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা বিশেষ আমল।

৫. জুমার দিনের গুরুত্ব অবহেলা করলে অন্তর মোহরাঙ্কিত হয়ে যায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা অবহেলাবশত জুমা ত্যাগ করে, তারা যেন অবশ্যই বিরত হয়; অন্যথায় আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেবেন। অতঃপর তারা গাফিলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৬৫)
এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক কঠোর সতর্কবার্তা। ধারাবাহিকভাবে জুমা পরিত্যাগ করলে মানুষের হৃদয় কঠিন হয়ে যায় এবং ঈমান দুর্বল হতে থাকে।

জুমার দিন শুধু একটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন নয়; বরং এটি ঈমানকে নবায়ন, গুনাহ থেকে তাওবা এবং আখিরাতের প্রস্তুতির এক অনন্য সুযোগ। মহানবী (সা.) জুমার দিনকে কেন্দ্র করে যে ভবিষ্যদ্বাণীগুলো করেছেন, সেগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একদিন কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, আর সেই দিনের জন্য প্রস্তুতিই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

তাই আসুন, প্রতিটি জুমাকে জীবনের শেষ জুমা মনে করে আন্তরিক তাওবা করি, সালাতের প্রতি যত্নবান হই, বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি, দোয়ায় মগ্ন থাকি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে সফল আখিরাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার মর্যাদা যথাযথভাবে উপলব্ধি করে তার হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।