সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও উদারতা মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। কিন্তু আজকের যুগে এই গুণটি বিরল হয়ে পড়ছে। সহনশীলতা কখনোই নিজের অধিকার নষ্ট করা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা নয়। বরং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়াই প্রকৃত সহনশীলতা। এ কারণেই মিসরের শাসক হওয়ার পরও নবী ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের ক্ষমা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের প্রতি কোনো ভর্ত্সনা নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনিই সর্বাধিক দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯২)
সহনশীলতা মানে বাড়াবাড়ি নয়, আবার অবহেলাও নয়। মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দিতে হবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখতে হবে, তবে তা হতে হবে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।
আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় আলোচনা করো।’ (সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ১২৫)
কিভাবে সত্যিকার সহনশীল মানুষ হওয়া যায়, এ বিষয়ে কোরআন-হাদিসের আলোকে নিম্নে আলোচনা করা হলো—
১. ধৈর্য ধারণ করা : সহনশীল হতে হলে সর্বপ্রথম ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্যেরও বিভিন্ন স্তর আছে, আর তার মধ্যে সর্বোচ্চ হলো সুন্দর ধৈর্য (সবরুন জামিল) যে ধৈর্যে অভিযোগ বা অসন্তোষ থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করো।’ (সুরা : আল-মুদ্দাসসির, আয়াত : ৭)
২. উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা করো : সহনশীল মানুষ অকারণ তর্ক-বিতর্কে জড়ায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি জান্নাতের প্রান্তে একটি ঘরের দায়িত্ব নিচ্ছি সেই ব্যক্তির জন্য, যে সত্যের ওপর থেকেও তর্কবিতর্ক পরিত্যাগ করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৪৬৪)
৩. মানুষের সঙ্গে মেশা এবং তাদের কষ্ট সহ্য করা : সহনশীল ব্যক্তি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন না; বরং মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের কষ্ট ও আচরণ ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন। তিনি কোমলতা ভালোবাসেন। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সব কাজে কোমলতা পছন্দ করেন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৮১)
৪. সহযোগিতা সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ : অনেক সময় এমন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, যাদের চিন্তা, ধর্ম বা সংস্কৃতি আমাদের থেকে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু যদি সেই সহযোগিতা মানবকল্যাণে হয়, তবে তা প্রশংসনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৮৯)
৫. জ্ঞানের ক্ষেত্রে অহংকার ত্যাগ করা : সহনশীল ব্যক্তি কখনো মনে করেন না যে তিনি সব জানেন। তিনি ছোট-বড় সবার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—কাক আমাদের শিখিয়েছে মৃতদেহ দাফনের পদ্ধতি। হুদহুদ পাখি শিখিয়েছে, কোনো সংবাদ গ্রহণের আগে তা যাচাই করা কতটা জরুরি। সে বলেছিল, ‘আমি এমন বিষয় জেনেছি, যা তুমি জানো না। আমি তোমার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি।’ (সুরা : আন-নামল, আয়াত : ২২)
৬. মানুষের প্রতি সুধারণা পোষণ করা : এটিও সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পিঁপড়াটি তার সঙ্গীদের বলেছিল, ‘তোমরা নিজেদের বাসায় প্রবেশ করো, যাতে সুলায়মান ও তার বাহিনী অজান্তে তোমাদের পিষে না ফেলে।’ (সুরা : আন-নামল, আয়াত : ১৮)
লক্ষ করুন, সে বলেনি যে সুলায়মান ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ক্ষতি করবেন; বরং বলেছে, ‘তারা বুঝতে পারবে না।’ অর্থাৎ সে তাদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করেছে।
৭. সত্যবাদী ও নির্মল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি সত্যবাদী, নির্মল হৃদয়ের এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যার হৃদয় পবিত্র এবং যার জিহ্বা সত্যবাদী।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘পবিত্র হৃদয় কী?’ তিনি বললেন, ‘যে হৃদয়ে কোনো পাপ, সীমা লঙ্ঘন বা হিংসা নেই।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৯১)
৮. আশাবাদী হওয়া এবং অন্যদেরও আশাবাদী করা : সহনশীল ব্যক্তি কখনো নিরাশাবাদী হন না। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতেও আশার আলো দেখান। ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর রহমত থেকে শুধু কাফিররাই নিরাশ হয়।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)
৯. অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও ন্যায় ও দয়া প্রদর্শন করা : সহনশীল ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম চুক্তিবদ্ধ নাগরিককে হত্যা করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৬৪৫৭)
তিনি আরো উৎসাহ দিয়েছেন অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও দান-সদকা করতে। (সিলসিলাহ সহিহাহ : ২৭৬৬)
১০. কেনাবেচায় উদার হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্যেও উদার ও সহজ-সরল হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে বিক্রয়ের সময়, ক্রয়ের সময়, পাওনা আদায়ের সময় এবং দেনা পরিশোধের সময় উদারতা প্রদর্শন করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩৪৯৫)
এই দশটি গুণ ছাড়াও আরো একটি উল্লেখযোগ্য গুণ হলো- সবার প্রতি দয়াশীল হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি ছোট-বড় সবার প্রতি স্নেহশীল এবং অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, পরম দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর মানুষের প্রতি দয়া করো, আকাশের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩৫২২)
পরিশেষে তুমি যদি ধৈর্যশীল হও, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারো, জীবনের সব ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, সত্যের ওপর থেকেও অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়িয়ে চলো, মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের কষ্ট সহ্য করো, কোমলতা ও সহযোগিতাকে ভালোবাসো, জ্ঞানের ক্ষেত্রে অহংকার না করে সবার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, কোনো সংবাদ যাচাই না করে বিশ্বাস করো না, মানুষের জন্য অজুহাত খুঁজে নাও এবং তাদের সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করো, কথাবার্তা ও কাজে সত্যবাদী হও, নির্মল হৃদয় নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকো, নিজে আশাবাদী হও এবং অন্যদেরও আশাবাদী করো, ভিন্নমত ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সদাচরণ করো, কেনাবেচা ও লেনদেনে উদার হও, ছোট-বড় সবার প্রতি দয়া করো, তাহলে তুমি সহনশীলতার পথে অগ্রসর হচ্ছ।