• ই-পেপার

জুমার দিন সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

সুরা মুলক তিলাওয়াতের মহিমান্বিত ফজিলত

মুফতি ওমর বিন নাছির
সুরা মুলক তিলাওয়াতের মহিমান্বিত ফজিলত
সংগৃহীত ছবি

মৃত্যুর পরই শুরু হয় আখিরাতের প্রথম ধাপ—আলমে বরজাখ বা কবরের জীবন। এ জীবনে সফলতার জন্য প্রয়োজন ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর রহমত। তাই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এমন কিছু আমল নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা আখিরাতের পথে আলোর দিশা হয়ে দাঁড়ায়। সেই মহামূল্যবান আমলগুলোর অন্যতম হলো প্রতিদিন সুরা মুলক তিলাওয়াত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সুরার এমন ফজিলতের কথা জানিয়েছেন, যা প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে এ সুরার প্রতি বিশেষ ভালোবাসা সৃষ্টি করে।

সুরা মুলক পবিত্র কোরআনের ৬৭তম সুরা। এতে মোট ৩০টি আয়াত রয়েছে। ‘মুলক’ অর্থ—রাজত্ব, সার্বভৌমত্ব ও সর্বময় ক্ষমতা। সুরার শুরুতেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন— ‘অতি বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১)
এই সুরায় আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টি জগতের নিখুঁত ব্যবস্থা, মৃত্যু ও জীবনের উদ্দেশ্য, কিয়ামত, জান্নাত-জাহান্নাম এবং মানুষের জবাবদিহিতার বিষয় অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

সুরা মুলক পাঠের মহিমান্বিত ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরআনে ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সুরা আছে। তা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, অবশেষে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সেটি হলো—'তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক'।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪০০)»

অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘এটি (সুরা মুলক) কবরের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী।’ (সুনান নাসায়ি)

সহিহ হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা সাজদা ও সুরা আল-মুলক তিলাওয়াত না করে ঘুমাতে যেতেন না।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৮৯২)
এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তিলাওয়াত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

সুরা মুলকের বিষয়বস্তু
১. আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার ঘোষণা (আয়াত ১–৪) এ অংশে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, জীবন-মৃত্যুর উদ্দেশ্য এবং সাত আসমানের নিখুঁত সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

২. জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতা (আয়াত ৫–১৫) অবিশ্বাসীদের পরিণতি, জাহান্নামের ভয়াবহতা এবং মুমিনদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ তুলে ধরা হয়েছে।

৩. আল্লাহর শাস্তির সতর্কবার্তা (আয়াত ১৬–২২) মানুষকে অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

৪. মানুষকে আত্মসমালোচনার আহ্বান (আয়াত ২৩–২৪) আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন—তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় দিয়েছেন; অথচ মানুষ খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

৫. কিয়ামত সম্পর্কে মানুষের প্রশ্ন (আয়াত ২৫–২৭) অবিশ্বাসীরা কিয়ামতের সময় জানতে চাইলেও, এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

৬. আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার শিক্ষা (আয়াত ২৮–৩০) শেষ আয়াতগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবন, পানি, রিজিক—সবকিছুই আল্লাহর দান; তিনি চাইলে মুহূর্তেই তা কেড়ে নিতে পারেন।

কখন সুরা মুলক পড়বেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা সাজদা ও সুরা মুলক তিলাওয়াত না করে কোনো দিন ঘুমাতেন না। তার মানে এই নয় যে সুরাটি দিনে পড়া যাবে না। যেকোনো সময়ই পড়া যাবে, তবে রাতে বিশেষ জিকির হিসেবে এ সুরা পড়া উত্তম। সুরাটি নামাজের সঙ্গে পড়াও ভালো। মুখস্থ না থাকলে দেখে দেখে অর্থ বুঝে পড়লে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়।

আমাদের করণীয়
১. প্রতিদিন রাতে সুরা মুলক তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা।
২. সুরাটি মুখস্থ করার চেষ্টা করা।
৩. অর্থ ও তাফসির বুঝে পড়া।
৪. এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
৫. সন্তানদেরও এ সুরা শেখানো।

সুরা মুলক আল্লাহর মহিমা, আখিরাতের জবাবদিহি এবং ঈমানকে দৃঢ় করার এক অনন্য শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সুরার বিশেষ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন এবং নিয়মিত তিলাওয়াতের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত প্রতিদিন বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে এ সুরা পাঠ করা, এর অর্থ অনুধাবন করা এবং এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গঠন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুরা মুলকের বরকত লাভের তাওফিক দান করুন, কবরের শাস্তি থেকে হেফাজত করুন এবং কিয়ামতের দিন এ সুরার সুপারিশ নসিব করুন। আমিন।
 

যে ১০ গুণ মানুষকে প্রশংসনীয় করে তোলে

হাদি উল ইসলাম
যে ১০ গুণ মানুষকে প্রশংসনীয় করে তোলে
সংগৃহীত ছবি

সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও উদারতা মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। কিন্তু আজকের যুগে এই গুণটি বিরল হয়ে পড়ছে। সহনশীলতা কখনোই নিজের অধিকার নষ্ট করা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা নয়। বরং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়াই প্রকৃত সহনশীলতা। এ কারণেই মিসরের শাসক হওয়ার পরও নবী ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের ক্ষমা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের প্রতি কোনো ভর্ত্সনা নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনিই সর্বাধিক দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯২)

সহনশীলতা মানে বাড়াবাড়ি নয়, আবার অবহেলাও নয়। মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দিতে হবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখতে হবে, তবে তা হতে হবে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।
আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় আলোচনা করো।’ (সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ১২৫)

কিভাবে সত্যিকার সহনশীল মানুষ হওয়া যায়, এ বিষয়ে কোরআন-হাদিসের আলোকে নিম্নে আলোচনা করা হলো—

১. ধৈর্য ধারণ করা : সহনশীল হতে হলে সর্বপ্রথম ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্যেরও বিভিন্ন স্তর আছে, আর তার মধ্যে সর্বোচ্চ হলো সুন্দর ধৈর্য (সবরুন জামিল) যে ধৈর্যে অভিযোগ বা অসন্তোষ থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করো।’ (সুরা : আল-মুদ্দাসসির, আয়াত : ৭)

২. উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা করো : সহনশীল মানুষ অকারণ তর্ক-বিতর্কে জড়ায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি জান্নাতের প্রান্তে একটি ঘরের দায়িত্ব নিচ্ছি সেই ব্যক্তির জন্য, যে সত্যের ওপর থেকেও তর্কবিতর্ক পরিত্যাগ করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৪৬৪)

৩. মানুষের সঙ্গে মেশা এবং তাদের কষ্ট সহ্য করা : সহনশীল ব্যক্তি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন না; বরং মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের কষ্ট ও আচরণ ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন। তিনি কোমলতা ভালোবাসেন। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সব কাজে কোমলতা পছন্দ করেন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৮১)

৪. সহযোগিতা সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ : অনেক সময় এমন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, যাদের চিন্তা, ধর্ম বা সংস্কৃতি আমাদের থেকে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু যদি সেই সহযোগিতা মানবকল্যাণে হয়, তবে তা প্রশংসনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৮৯)

৫. জ্ঞানের ক্ষেত্রে অহংকার ত্যাগ করা : সহনশীল ব্যক্তি কখনো মনে করেন না যে তিনি সব জানেন। তিনি ছোট-বড় সবার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—কাক আমাদের শিখিয়েছে মৃতদেহ দাফনের পদ্ধতি। হুদহুদ পাখি শিখিয়েছে, কোনো সংবাদ গ্রহণের আগে তা যাচাই করা কতটা জরুরি। সে বলেছিল, ‘আমি এমন বিষয় জেনেছি, যা তুমি জানো না। আমি তোমার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি।’ (সুরা : আন-নামল, আয়াত : ২২)

৬. মানুষের প্রতি সুধারণা পোষণ করা : এটিও সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পিঁপড়াটি তার সঙ্গীদের বলেছিল, ‘তোমরা নিজেদের বাসায় প্রবেশ করো, যাতে সুলায়মান ও তার বাহিনী অজান্তে তোমাদের পিষে না ফেলে।’ (সুরা : আন-নামল, আয়াত : ১৮)

লক্ষ করুন, সে বলেনি যে সুলায়মান ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ক্ষতি করবেন; বরং বলেছে, ‘তারা বুঝতে পারবে না।’ অর্থাৎ সে তাদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করেছে।

৭. সত্যবাদী ও নির্মল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি সত্যবাদী, নির্মল হৃদয়ের এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যার হৃদয় পবিত্র এবং যার জিহ্বা সত্যবাদী।’  সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘পবিত্র হৃদয় কী?’ তিনি বললেন, ‘যে হৃদয়ে কোনো পাপ, সীমা লঙ্ঘন বা হিংসা নেই।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৯১)

৮. আশাবাদী হওয়া এবং অন্যদেরও আশাবাদী করা : সহনশীল ব্যক্তি কখনো নিরাশাবাদী হন না। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতেও আশার আলো দেখান। ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর রহমত থেকে শুধু কাফিররাই নিরাশ হয়।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)

৯. অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও ন্যায় ও দয়া প্রদর্শন করা : সহনশীল ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম চুক্তিবদ্ধ নাগরিককে হত্যা করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৬৪৫৭)

তিনি আরো উৎসাহ দিয়েছেন অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও দান-সদকা করতে। (সিলসিলাহ সহিহাহ : ২৭৬৬)

১০. কেনাবেচায় উদার হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্যেও উদার ও সহজ-সরল হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে বিক্রয়ের সময়, ক্রয়ের সময়, পাওনা আদায়ের সময় এবং দেনা পরিশোধের সময় উদারতা প্রদর্শন করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩৪৯৫)

এই দশটি গুণ ছাড়াও আরো একটি উল্লেখযোগ্য গুণ হলো- সবার প্রতি দয়াশীল হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি ছোট-বড় সবার প্রতি স্নেহশীল এবং অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, পরম দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর মানুষের প্রতি দয়া করো, আকাশের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩৫২২)

পরিশেষে তুমি যদি ধৈর্যশীল হও, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারো, জীবনের সব ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, সত্যের ওপর থেকেও অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়িয়ে চলো, মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের কষ্ট সহ্য করো, কোমলতা ও সহযোগিতাকে ভালোবাসো, জ্ঞানের ক্ষেত্রে অহংকার না করে সবার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, কোনো সংবাদ যাচাই না করে বিশ্বাস করো না, মানুষের জন্য অজুহাত খুঁজে নাও এবং তাদের সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করো, কথাবার্তা ও কাজে সত্যবাদী হও, নির্মল হৃদয় নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকো, নিজে আশাবাদী হও এবং অন্যদেরও আশাবাদী করো, ভিন্নমত ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সদাচরণ করো, কেনাবেচা ও লেনদেনে উদার হও, ছোট-বড় সবার প্রতি দয়া করো, তাহলে তুমি সহনশীলতার পথে অগ্রসর হচ্ছ।

জুমার দিন যে আট আমল কখনো ছাড়বেন না

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে আট আমল কখনো ছাড়বেন না
সংগৃহীত ছবি

ইসলামে জুমার দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে জুমার দিন দ্রুত মসজিদে গমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিন নামাজের আজান হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচাবিক্রি বন্ধ করো, তা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝো। এরপর নামাজ শেষ হলে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ৯-১০)

জুমার দিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো—

১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা : আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—এক. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। দুই. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন। তিন. এই দিনে আদম (আ.)-কে মৃত্যু দিয়েছেন। চার. এই দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা দেবেন। যতক্ষণ সে হারাম কিছু প্রার্থনা করবে না। পাঁচ. এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)

২. জুমার নামাজ আদায় : সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী সময়ের পাপ মোচন করে; যদি সেই ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)

৩. জুমার দিন গোসল করা : জুমার দিন গোসল করা ও আগে আগে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আউস বিন আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালো করে গোসল করল, দ্রুততর সময়ে মসজিদে গেল ও (ইমামের) কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ (খুতবা) শুনল, তার জন্য প্রতি কদমের বদলে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব থাকবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫)

৪. মসজিদে প্রথমে প্রবেশ করা : জুমার দিন মসজিদে আগে প্রবেশ করা ও মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার বিশেষ গুরুত্ব আছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, অতঃপর প্রথমে মসজিদে গেল সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে এরপর মসজিদে গেল, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। আর যে এরপর ঢুকল, সে যেন ছাগল কোরবানি করল, এরপর যে ঢুকল সে যেন মুরগি কোরবানি করল, আর যে এরপর ঢুকল সে ডিম সদকা করল। অতঃপর ইমাম খুতবার জন্য এলে ফেরেশতারা আলোচনা শোনা শুরু করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪১)

৫. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত : জুমার দিন একটি সময় আছে, যখন মানুষ আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ১০৪৮)

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যদি কোনো মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, তাহলে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে দান করেন। এই মুহূর্তটি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর। (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)

৬. সুরা কাহাফ পাঠ : জুমার অন্যতম আমল সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে তা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য আলোকিত হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এই সুরার শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে অতঃপর দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সহিহ তারগিব, হাদিস : ১৪৭৩, আল মুসতাদরাক : ২/৩৯৯)

৭. গুনাহ মাফ হয় : সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

৮. দরুদ পাঠ : জুমার দিন নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা কর্তব্য। আউস বিন আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এই দিনে শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং এই দিনে সবাইকে বেহুঁশ করা হবে। অতএব, তোমরা এই দিনে আমার ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ পড়ো। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ সাহাবারা বললেন, আমাদের দরুদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনার দেহ একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে? তিনি বলেন, ‘আল্লাহ জমিনের জন্য আমার দেহের ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

মানব দেহের ‘ত্বক’ নিয়ে কোরআনে যা বলা হয়েছে

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
মানব দেহের ‘ত্বক’ নিয়ে কোরআনে যা বলা হয়েছে
সংগৃহীত ছবি

মানুষের ত্বক হলো মানবদেহের বহিরাবরণ। এটি মানবদেহের সর্ববৃহৎ অঙ্গ। এটি সমগ্র শরীরকে সম্পূর্ণরূপে আবৃত করে রাখে। ত্বক এমন একটি আবরণ বা অঙ্গ, যা দেহের বাইরের অংশকে ঢেকে রাখে এবং তাকে সুরক্ষা প্রদান করে। পবিত্র কোরআনে ‘ত্বক’ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত ও তার তাৎপর্য নিম্নে তুলে ধরা হলো—

শক্তি, ক্ষমতা ও অনুভূতির (সংবেদনশীলতার) নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করেছে, অচিরেই আমি তাদের আগুনে নিক্ষেপ করব। যখনই তাদের চামড়া (ত্বক) পুড়ে যাবে, তখনই আমি তার পরিবর্তে নতুন চামড়া সৃষ্টি করে দেব, যাতে তারা শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করতে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ৫৬)

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, আল-আমাশ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে যখন তাদের চামড়া আগুনে পুড়ে যাবে, তখন আল্লাহ তাদের জন্য কাগজের মতো সাদা নতুন চামড়া সৃষ্টি করবেন। (ইবনে আবি হাতিম)

ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াজিদ আল-হাদরামি (রহ.)-এর মতে, ‘আল্লাহ একজন কাফিরের জন্য এক শ স্তরের চামড়া সৃষ্টি করবেন। প্রত্যেক দুই স্তরের মাঝখানে থাকবে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শাস্তি।’ (ইবন আবি হাতিম)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, আগুনে পোড়ার ফলে ব্যথা অনুভবের প্রধান কেন্দ্র হলো ত্বকের বাইরের স্তর, যেখানে ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুগুলো অবস্থান করে। যদি পোড়া ক্ষত ত্বক অতিক্রম করে গভীর মাংসপেশি পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে আগের তুলনায় ব্যথার অনুভূতি কমে যায়; কারণ গভীর টিস্যু, পেশি ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গে ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুর ঘনত্ব অনেক কম।

তাই চিকিৎসকরা বলেন, যে পোড়া ক্ষত শুধু ত্বক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, তা অত্যন্ত তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করে; পক্ষান্তরে আরো গভীর ও গুরুতর পোড়া ক্ষত তুলনামূলকভাবে কম ব্যথা অনুভূত করায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কোরআনের এই আয়াত ইঙ্গিত করে যে জাহান্নামের আগুন যখন ত্বক পুড়িয়ে ফেলবে—যেখানে ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুগুলো আছে, তখনই আল্লাহ নতুন ত্বক সৃষ্টি করবেন, যাতে শাস্তির অনুভূতি অবিরাম চলতে থাকে এবং তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে আজাবের স্বাদ গ্রহণ করে।

ভয় ও আল্লাহভীতির নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী অবতীর্ণ করেছেন—একটি এমন কিতাব, যার বক্তব্য পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বারবার পুনরাবৃত্ত। যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের ত্বক তা শুনে শিহরিত হয়ে ওঠে। অতঃপর তাদের ত্বক ও হৃদয় আল্লাহর স্মরণে কোমল হয়ে যায়। এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি যাকে ইচ্ছা এর মাধ্যমে সৎপথে পরিচালিত করেন। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোনো পথপ্রদর্শক নেই।’ (আয-ঝুমার, আয়াত : ২৩)

ইমাম ইবন কাসির (রহ.) বলেন, এটি নেককার বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। তারা যখন মহান আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে, তখন তাতে বর্ণিত সুসংবাদ, সতর্কবাণী, ভীতি ও শাস্তির হুমকি উপলব্ধি করে তাদের ত্বক ভয়ে কেঁপে ওঠে। এরপর যখন তারা আল্লাহর রহমত, অনুগ্রহ ও ক্ষমার আশাবাণী স্মরণ করে, তখন তাদের ত্বক ও হৃদয় প্রশান্ত ও কোমল হয়ে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হয়। এভাবেই তারা কাফিরদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তির নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশেষে যখন তারা জাহান্নামে পৌঁছাবে, তখন তাদের কান, তাদের চোখ এবং তাদের ত্বক তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ২০)

ইমাম ইবন কাসির (রহ.) বলেন, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে যা কিছু করেছে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে—সব কিছুর ব্যাপারে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ্য দেবে; কোনো কিছুই গোপন থাকবে না। আল্লাহ আরো বলেন, তারা তাদের ত্বককে বলবে, ‘তোমরা কেন আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে?’ তারা বলবে, ‘আল্লাহ আমাদের কথা বলার শক্তি দিয়েছেন, যিনি সব কিছুকেই কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনিই প্রথমবার তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ২১

যখন মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে, তখন তারা নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ত্বককে ভর্ৎসনা করবে। তখন অঙ্গগুলো জবাব দেবে—আল্লাহই আমাদের কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছেন, যিনি সব কিছুকে কথা বলার শক্তি দিয়েছেন। তিনিই প্রথমবার তোমাদের সৃষ্টি করেছেন; সুতরাং তাঁর আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কারো নেই।