আরব সাগরের তীরে আলো ঝলমলে মুম্বাই যেন এক মোহের নগরী। বলিউডের সেলিব্রেটিদের অধিকাংশই থাকেন এই নগরীতে। কিন্তু ঝলমলে আলোর নিচেই যেন গহীন অন্ধকারের বাস। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই নগরীর পথঘাট সব তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে যায় জনজীবন। শুধু স্থবিরতাই নয়, এই দুর্যোগ অনেকসময় প্রাণঘাতীও। এবারের বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় গাছ উপড়ে, ভবন ধ্বসে, ম্যানহোলে পড়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে ১১ বছর বয়সী স্কুলছাত্র বিহান শ্রীবাস্তবের মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়েছে। বাবা-মার একমাত্র সন্তান বিহান মুম্বাইয়ের চেম্বুর এলাকার ইউনিভার্সাল হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তো। ৩০ জুন স্কুল ছুটি হওয়ার পর বিহান আর সবার সঙ্গে স্কুলবাসে করে বাড়ি ফিরছিল। রাস্তার পাশে থাকা একটি বিশাল অশ্বত্থ গাছ হঠাৎ শিকড়সহ উপড়ে সরাসরি চলন্ত বাসটির ওপর ভেঙে পড়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় বিহান শ্রীবাস্তব।
পরদিন ১ জুলাই বৃহন্মুম্বাই মিউনিসিপাল করপোরেশন (বিএমসি) তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি গত সোমবার তাদের রিপোর্ট দেয়। সেই রিপোর্ট নিয়েই এখন তোলপাড়। রিপোর্টে রাস্তার ঠিকাদার ও সুপারভাইজারকে দায়ী করা হলেও বিএমসির সড়ক ও উদ্যান বিভাগের কাউকে দায়ী করা হয়নি। রিপোর্টে বিহানের পরিবারকে ৭ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে ঠিকাদার দেবেন ৫ লাখ, আর সুপারভাইজারকে দিতে বলা হয় ২ লাখ।
তবে বিএমসির এই অভ্যন্তরীন তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বিএমসির সাধারন সভায় সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বিএমসির সাধারণ সভায় মেয়র ঋতু তাওড়ে তদন্ত রিপোর্ট ছিঁড়ে ফেলেন এবং তৃতীয় পক্ষের অধীনে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করার দাবি জানান। শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঋতু তাওড়ে বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) আমরা করপোরেশনে সর্বসম্মতভাবে প্রশাসনের ওই প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা প্রতিবেদনের অনুলিপিটি ছিঁড়ে ফেলেছি এবং প্রশাসনকে একটি পুনঃতদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। পাশাপাশি এই ঘটনাটি পুনরায় খতিয়ে দেখতে তদন্ত প্যানেলে দুজন কর্পোরেটরকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেছি।’
মেয়র ঋতু তাওড়ে তদন্ত কমিটির রিপোর্টকে অনভিপ্রেত আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমি প্রতিবেদনটি পড়ে দেখেছি, যেখানে কেবল ঠিকাদার এবং সুপারভাইজারকে ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে, অথচ নাগরিক সংস্থার সড়ক ও উদ্যান বিভাগকে কোনো দোষ দেওয়া হয়নি।’
এর আগে বৃহস্পতিবার বিহানের বাবা গৌরব শ্রীবাস্তব বলেন, ‘আমরা আশা করছি যে এই প্রতিবেদনের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হবে এবং একটি পুনঃতদন্ত হবে, যা হবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ এবং এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।’
সাক্ষাৎকারে বিহানের বাবা অভিযোগ করেছিলেন, অবহেলার একটি বিষয়কে প্রাকৃতিক দুর্যোগে রূপ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি প্রমাণ হওয়া উচিত যে এটি মানুষের অবহেলা এবং এই কাজের সাথে যুক্ত থাকা পুরো ব্যবস্থার মানুষদের শাস্তি হওয়া উচিত। আমি মনে করি তাতেই বিচার পাওয়া যাবে এবং কিছু নতুন নিয়ম তৈরি করা উচিত অথবা প্রক্রিয়ার উন্নতি করা উচিত, যাতে আগামী বর্ষায় অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে একই ঘটনা না ঘটে।’
মেয়রের কণ্ঠেও গৌরবের কথার অনুরনন, ‘আমিও একজন মা। তাদের সন্তান চলে গেছে। তাদের সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এই প্রতিবেদনটি ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্য ৭ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করেছে, যার আমি তীব্র বিরোধিতা করছি। আমি বর্ষার আগে ব্যক্তিগতভাবে সেই রাস্তাটি পরিদর্শন করেছিলাম এবং সাইট ইঞ্জিনিয়ারকে দুর্বল গাছগুলোর ব্যাপারে সতর্ক করেছিলাম। আমরা একটি মূল্যবান জীবন হারিয়েছি, আর তারা তার মূল্য নির্ধারণ করেছে ৭ লাখ টাকা। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’




