• ই-পেপার

নারী ক্রিকেটে প্রথম ‘টাইম আউট’ রিতসি চোডেন

হেলসিংবার্গের অভিশপ্ত বিকেল

যেভাবে চুরমার হয়েছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় অহংকার

ফুয়াদ হাসান
যেভাবে চুরমার হয়েছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় অহংকার
ছবি : এআই

ফুটবলের দীর্ঘ ও আবেগে ঠাসা ইতিহাসে কিছু হার থাকে, যা শুধু সাময়িক কষ্ট দেয়। আবার কিছু হার এমনও থাকে, যা দেশটির জাতীয় চেতনায় স্থায়ী ক্ষত বা এক চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায়। ১৯৫৮ সালের ১৫ জুন, সুইডেনের হেলসিংবার্গের সেই অভিশপ্ত বিকেলটি আর্জেন্টিনার জন্য ছিল দ্বিতীয় ধরনের।

সেদিন সুইডেনের ওলিম্পিয়াস্টাডিওনে যা ঘটেছিল, তা চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে শুধূ একটি ফুটবল ম্যাচ হেরে যাওয়া ছিল না। ওটা ছিল একটা অবাস্তব মোহভঙ্গের নিষ্ঠুর গল্প। যে মোহের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল মাত্রাতিরিক্ত আত্মঅহংকার, নান্দনিক শ্রেষ্ঠত্ব আর একটা অন্ধ বিশ্বাসের ওপর। যে বিশ্বাস বলত, শুধু ঈশ্বরপ্রদত্ত ফুটবলীয় প্রতিভা দিয়েই বিশ্বজয় সম্ভব!

ইতিহাস পরবর্তী সমযে আলবিসেলেস্তেদের সেই চরম অপমানকে গভীর শোক ও অবিশ্বাস্য এক শব্দবন্ধে মনে রেখেছে—‘এল দেসাস্ত্রে দে সুয়েসিয়া’ বা ‘সুইডেনের বিপর্যয়’। 

সেদিন চেকোস্লোভাকিয়া আক্ষরিক অর্থেই আর্জেন্টিনাকে ৬-১ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। যে ফলাফলটি আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় হারের কলঙ্কিত রেকর্ড হয়ে আছে। তবে এই বিপর্যয়কে শুধু গোলবন্যার স্কোরলাইন দিয়ে বোঝা যাবে না। হেলসিংবার্গের সেই ম্যাচটি ছিল আসলে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলীয় রোমান্টিকতার সঙ্গে ইউরোপীয় ফুটবলের নির্মম আধুনিকায়নের এক মহাকর্ষীয় সংঘর্ষ।

শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা মোহ

অসীম আত্মবিশ্বাস আর বিপুল মর্যাদা নিয়ে সুইডেনের মাটিতে পা রেখেছিল আর্জেন্টিনা। মাত্র এক বছর আগে, ১৯৫৭ সালের সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে (বর্তমানে কোপা আমেরিকা) পেরুর মাটিতে চোখধাঁধানো আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে তারা শিরোপা জিতেছিল। গোটা লাতিন আমেরিকা জুড়েই তখন আর্জেন্টিনাকে মহাদেশের সেরা ফুটবল শক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো।

দলের তারকাদের নামগুলোও সেই আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া দিচ্ছিল। গোলপোস্টের নিচে ছিলেন আমাদিও কারিজো। আধুনিক গোলকিপিংয়ের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি। ছিলেন রিভার প্লেটের কিংবদন্তি ‘লা মাকিনা’ (দ্য মেশিন) আক্রমণভাগের অন্যতম শেষ প্রতিনিধি আনহেল লাব্রুনা। উইংয়ে জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে নাচাতে ওরেস্তেস ওমর করবাত্তা, আর সেন্টার ফরোয়ার্ডে গোলমেশিন হোসে সানফিলিপো।

সবচেয়ে বড় কথা, দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছিল আর্জেন্টিনা। রাজনৈতিক কোন্দল আর ফিফার সঙ্গে দূরত্বের কারণে ১৯৩৪ সালের পর বিশ্বমঞ্চে দেখা যায়নি ফুটবলপাগল এই দেশটিকে। ফলে, ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপকে তারা শুধু একটি টুর্নামেন্ট হিসেবে দেখেনি; ভেবেছিল বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার এক রাজকীয় প্রত্যাবর্তন হতে যাচ্ছে।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের নায়ক গুইলার্মো স্তাবিল তখন দলের প্রধান কোচ। বলিভিয়া ও চিলির বাধা টপকে দলকে মূল পর্বে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। বুয়েনস অ্যাইরেসের বাতাসে তখন উড়ছিল অহংকারের রেণু। সবার মনে একটাই দৃঢ় বিশ্বাস—আর্জেন্টিনার শৈল্পিক ফুটবলের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে ইউরোপীয় রক্ষণভাগ।

কিন্তু এই অতি-আত্মবিশ্বাসের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক আত্মঘাতী দুর্বলতা, আর তা হচ্ছে, ‘আত্মতুষ্টি’। আর্জেন্টাইন ফুটবল তখনো শারীরিক প্রস্তুতি, কঠোর ট্যাকটিক্যাল কাঠামো কিংবা দলীয় শৃঙ্খলাকে খুব একটা পাত্তা দিত না। তাদের কাছে ঈশ্বরের দেওয়া প্রতিভা, তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনী ক্ষমতা (ইমপ্রোভাইজেশন) আর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই ছিল শেষ কথা। 

অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ফুটবল যে খোলনলচে বদলে গেছে, সেই খবর বুয়েনস আইরেসে পৌঁছায়নি! আর্জেন্টিনা বুঝতেই পারেনি, বিশ্ব ফুটবল তত দিনে অনেক এগিয়ে গেছে।

ইউরোপের বদলে যাওয়া

লাতিনরা যখন ফুটবলের রোমান্টিকতা নিয়ে মেতে আছে, ইউরোপীয় ফুটবল তখন প্রবেশ করছে শৃঙ্খলা, অ্যাথলেটিসিজম এবং ট্যাকটিক্যাল আধুনিকায়নের এক নতুন যুগে।

চেকোস্লোভাকিয়া ছিল সেই আধুনিকায়নের এক আদর্শ উদাহরণ। আর্জেন্টিনার মতো গ্ল্যামার বা তারকাখ্যাতি হয়তো তাদের ছিল না, কিন্তু তাদের ছিল নিখুঁত ভারসাম্য, সুশৃঙ্খল কাঠামো আর দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। ওয়েলস এবং পূর্ব জার্মানির মতো দলকে পেছনে ফেলে, টানা সাত ম্যাচে অপরাজিত থেকে তারা বিশ্বকাপে এসেছিল।

আর্জেন্টিনার মতো তারা শুধু কোনো একক খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত জাদুর ওপর নির্ভরশীল ছিল না। চেকোস্লোভাকদের মূল শক্তি ছিল দলীয় বোঝাপড়া, মাঠজুড়ে ক্ষীপ্র মুভমেন্ট, দুর্দান্ত ফিজিক্যাল কন্ডিশনিং এবং কঠোর ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা।

তখনো উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের জন্ম হয়নি (যা শুরু হয় ১৯৬০ সালে)। তবে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ এবং সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কাপের কল্যাণে ইউরোপীয় ফুটবল তত দিনে রীতিমতো বুলেটের গতি পেয়ে গেছে। চেকোস্লোভাকিয়া উঠে এসেছিল সেই কঠিন ও আধুনিক পরিমণ্ডল থেকেই।

সেখানেই আর্জেন্টিনা দল খেলতে নেমেছিল এই ভাবনায় যে—ফুটবল তো শুধু শিল্প দিয়েই জেতা যায়!

চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে সেই মহাবিপর্যয়ের আগেই কিন্তু একটা বড় সতর্কবার্তা এসেছিল। কিন্তু অন্ধ অহংকারে বুঁদ হয়ে থাকা আর্জেন্টিনা তা ধর্তব্যের মধ্যেই নেয়নি।

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ওরেস্তেস ওমর করবাত্তা। এই গোল যেন আর্জেন্টিনার সেই পুরনো ধারণাকেই সিলমোহর দিল—‘আমরাই সেরা, আমাদের শিল্পের সমকক্ষ কেউ নেই।’

কিন্তু ম্যাচ যত গড়িয়েছে, পশ্চিম জার্মানি তাদের শারীরিক শক্তি, গতি আর ট্যাকটিক্যাল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে থেকে ছিটকে দেয়। শেষ পর্যন্ত জার্মানি ম্যাচটি জেতে ৩-১ ব্যবধানে।

এমন হারের পরও আর্জেন্টিনার টনক নড়েনি। এটাকে স্রেফ একটা ‘খারাপ দিন’ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়। পরের ম্যাচে নর্দান আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩-১ ব্যবধানের সহজ জয় দলের আত্মবিশ্বাস আবার আকাশচুম্বী করে তোলে। ফলে চেকোস্লোভাকিয়ার বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের শেষ ও নির্ণায়ক ম্যাচটিকে তারা স্রেফ একটা আনুষ্ঠানিকতা মনে করেছিল। 

এই ঔদ্ধত্যের পেছনে ছিল অতীত ইতিহাস। দুই বছরেরও কম সময় আগে, বুয়েনস আইরেসে এই চেকোস্লোভাকিয়াকে ১-০ গোলে অনায়াসে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। তাই খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সাংবাদিক সবার ধারণা ছিল হেলসিংবার্গের ম্যাচটি জিতে অনায়াসেই পরের রাউন্ডে যাবে আলবিসেলেস্তেরা। ইতিহাসের পাতায় এটিই ছিল সবচেয়ে চড়া মূল্যের এক ভুল হিসাব।

হেলসিংবার্গের সেই দুঃস্বপ্ন

ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠের চিত্রটা আর্জেন্টিনার জন্য এক জীবন্ত দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। খেলার মাত্র অষ্টম মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত শটে চেকোস্লোভাকিয়াকে এগিয়ে নেন মিলান দভোরাক। এই এক গোলেই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের ভঙ্গুর দশা আর ছন্নছাড়া ফুটবলের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে। 

এর ঠিক ৯ মিনিট পর, ডিফেন্ডার ফ্রান্সিসকো লোম্বার্দোর এক দুর্বল ক্লিয়ারেন্সের সুযোগ নিয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন জেদনেক জিকান। 

মাঠে তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা! তারা শুধু গোল হজম করছিল না, প্রতিপক্ষের খেলার গতি আর তীব্রতার কাছে খেই হারিয়ে ফেলেছিল। ইউরোপীয়রা খেলছিল প্রচণ্ড গতি, নিখুঁত পাসিং আর দুর্দান্ত শারীরিক শক্তি নিয়ে। যে আর্জেন্টাইনরা টেকনিক দিয়ে প্রতিপক্ষকে নাচাতে অভ্যস্ত, তারা হঠাৎ আবিষ্কার করল এক সুশৃঙ্খল দলগত শক্তির সামনে তাদের ব্যক্তিগত জাদু কতটা অসহায়! 

প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই জিকান নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-০। অপমান ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিল আর্জেন্টিনা। ৬৫ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান ৩-১ করেন করবাত্তা। গ্যালারির আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মনে ক্ষণিকের জন্য আশা জেগেছিল, হয়তো মান-সম্মানটুকু বাঁচানো যাবে।

কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি দিতে চার মিনিট পরেই জিরি ফুরিসল আবার ব্যবধান ৪-১ করে দেন। এরপর ম্যাচের শেষ দিকে (৮২ ও ৮৯ মিনিটে) ভাস্লাভ হোভোরকা আরো দুটি গোল করলে আর্জেন্টিনার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়ে যায়।

রেফারির শেষ বাঁশি যখন বাজল, স্কোরবোর্ডে তখন জ্বলজ্বল করছে এক অবিশ্বাস্য-অকল্পনীয় ফল,  ‘চেকোস্লোভাকিয়া ৬-১ আর্জেন্টিনা’।

এই হারের মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা আর্জেন্টিনাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দেশের সংবাদপত্রগুলো একে ‘জাতীয় লজ্জা’ বলে আখ্যায়িত করে। এই হার শুধু জাতীয় দল নয়, বরং আর্জেন্টিনার গোটা ফুটবল দর্শন ও কাঠামোর দিকেই আঙুল তুলে দেয়।

বিশ্বকাপের সফর শেষ করে যখন দল দেশে ফেরে, তখন এদেইসা বিমানবন্দরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক নরক গুলজার পরিস্থিতি। ক্ষুব্ধ জনতা গালিগালাজ এবং কয়েন ছুড়ে মারতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিমানটিকে বুয়েনস অ্যাইরেসের মূল রানওয়ে থেকে দূরে ল্যান্ড করাতে হয়েছিল।

সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে করে গোলরক্ষক আমাদিও কারিজো পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, ‘মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল। তারা আমাদের মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। আমাদের দেশদ্রোহী বলে চিৎকার করছিল সবাই।’

এই এক হার অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার ও সুনাম চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। দীর্ঘ ২০ বছর জাতীয় দলের কোচের দায়িত্বে থাকা গুইলার্মো স্তাবিল পদত্যাগ করেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান কিংবদন্তি আনহেল লাব্রুনা। বিদায়বেলায় তার কণ্ঠে ছিল নির্মম সত্যের স্বীকারোক্তি, ‘আমরা আসলে বাস্তবতা না জেনেই খেলতে গিয়েছিলাম। এক সপ্তাহে তিনটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মতো শারীরিক বা ট্যাকটিক্যাল কোনো প্রস্তুতিই আমাদের ছিল না।’

কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টাইনরা বিশ্বাস করত, মাঠে যেকোনো সমস্যার সমাধান কেবল ব্যক্তিগত জাদুকরী প্রতিভা দিয়েই সম্ভব। শারীরিক কসরত কিংবা জিম সেশনকে তারা একপ্রকার অবজ্ঞাই করত। ট্যাকটিক্যাল ছক বাঁধার চেয়ে সহজাত সৃজনশীলতাকে মনে করা হতো শ্রেষ্ঠ। ফুটবলকে তারা দেখত স্রেফ একটা ‘আর্ট’ বা শিল্প হিসেবে।

হেলসিংবার্গের সেই বিকেল আর্জেন্টিনার সেই সনাতন বিশ্বদর্শনকে এক ঝটকায় গুঁড়িয়ে দেয়। আধুনিক ফুটবলে কেবল প্রতিভা দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না এমন রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি আর্জেন্টিনাকে দাঁড় করায় ‘সুইডেনের বিপর্যয়’। 

তৎকালীন আর্জেন্টিনার অত্যন্ত প্রভাবশালী ক্রীড়া সাময়িকী ‘এল গ্রাফিকো’ তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, ‘এই শিক্ষা অত্যন্ত নির্মম এবং এটা আমাদের শিখতেই হবে... নয়তো আমরা আরো পেছনে পড়ে যাব।’

সেই সতর্কবার্তা আসলেই ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। হেলসিংবার্গের এই অপমানই আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর পর থেকেই কোচিংয়ের ধরন, ফিটনেসের মানদণ্ড, ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার আধুনিকায়ন নিয়ে শুরু হয় তুমুল কাজ। ধীরে ধীরে, অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবল আধুনিক ফুটবলের দাবি মেনে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করে।

ফুটবল ইতিহাস সাধারণত শুধু জয়ীদের গল্পই মনে রাখে, বিজয় উৎসবের আলোয় ঢাকা পড়ে যায় পরাজয়ের অন্ধকার। কিন্তু কিছু কিছু হার একটি জাতিকে জয়ের চেয়েও বেশি বদলে দেয়, নতুন করে গড়ে তোলে।

১৯৫৮ সালের হেলসিংবার্গের সেই বিপর্যয়টাই আসলে আর্জেন্টিনার ফুটবলের ভবিষ্যতের বীজ বপন করে দিয়েছিল। সেদিন যদি আর্জেন্টিনা ওই নির্মম আঘাত না পেত, তবে হয়তো পরবর্তী সময়ে সিজার লুইস মেনোত্তির সেই ক্ষুরধার ট্যাকটিস দেখা যেত না, আসত না কার্লোস বিলার্দোর সেই বাস্তবসম্মত নির্মম ফুটবল কৌশল। হয়তো ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই মহাকাব্যিক পুনরুত্থান কিংবা ২০২২-এ লিওনেল মেসির হাত ধরে বিশ্বজয়ের গল্পটাও লেখা হতো না। 

মিসরের বিপক্ষে খেলছেন না নেইমার

ক্রীড়া ডেস্ক
মিসরের বিপক্ষে খেলছেন না নেইমার
নেইমার

বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে নতুন করে চোটের সমস্যায় পড়েছেন ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার। ফলে শনিবার মিসরের বিপক্ষে ব্রাজিলের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে খেলতে পারবেন না তিনি।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) জানিয়েছে, কাফ মাসলের চোটের কারণে নেইমার দলের সঙ্গে ক্লিভল্যান্ড সফরে যাচ্ছেন না। তিনি নিউ জার্সিতে দলের ট্রেনিং ক্যাম্পেই থেকে যাবেন এবং চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন।

৩৪ বছর বয়সী নেইমার পুরো মৌসুমজুড়েই চোটের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তবু কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাকে বিশ্বকাপ দলে অন্তর্ভুক্ত করায় বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

বিশ্বকাপের আগে মিসরের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ব্রাজিলের শেষ প্রস্তুতি। তবে সেখানে দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ তারকাকে না পাওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সেলেসাও শিবিরে।

আগামী ১৩ জুন নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ব্রাজিল। এরপর গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ হাইতি ও স্কটল্যান্ড।

নেইমারের চোট কতটা গুরুতর এবং তিনি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। 

বিশ্বকাপের আগে স্পেনকে রুখে দিল ইরাক

ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপের আগে স্পেনকে রুখে দিল ইরাক
ছবি : রয়টার্স

বিশ্বকাপের আগে প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে প্রত্যাশিত জয় পেল না স্পেন। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা ইরাকের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছাড়ে। 

স্পেনের মাঠ এস্তাদিও আবাঙ্কা-রিয়াসোরে ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য দেখায় স্বাগতিকরা। অষ্টম মিনিটেই অ্যালেক্স বায়েনার শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন ইরাক গোলরক্ষক আহমেদ বাসিল।

আরো পড়ুন
তালেবানের নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরছে আফগান নারী দল

তালেবানের নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরছে আফগান নারী দল

 

তবে ১৬ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। দানি ওলমোর পাস থেকে বল পেয়ে দুর্দান্ত দৌড়ে বক্সে ঢুকে গোল করেন ফেরান তোরেস। তার গোলে এগিয়ে যায় স্পেন।

ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ স্পেনের হাতেই ছিল, কিন্তু ২৭তম মিনিটে হঠাৎই সমতায় ফেরে ইরাক। বাম দিক থেকে দূরপাল্লার এক চমৎকার লব শটে গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়াকে পরাস্ত করেন মেরচাস দোস্কি।

প্রথমার্ধের বাকি সময়ে আরো কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিল স্পেন। তোরেসের একটি দূরপাল্লার শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে, আর দানি ওলমোর আরেকটি প্রচেষ্টা রুখে দেন বাসিল।

আরো পড়ুন
ফ্রান্সকে হারিয়ে চমক আইভরি কোস্টের

ফ্রান্সকে হারিয়ে চমক আইভরি কোস্টের

 

দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক পরিবর্তনের কারণে ম্যাচের ছন্দ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। হেসুস রদ্রিগেস, গঞ্জালো গার্সিয়া ও ইয়েরেমি পিনো সুযোগ পেলেও জয়সূচক গোল আর পাওয়া হয়নি স্পেনের।

বিশ্বকাপের আগে এই ড্র স্পেনের জন্য কিছুটা হতাশার হলেও টানা ২৯ ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রেখেছে তারা।

অন্যদিকে ফ্রান্স, নরওয়ে ও সেনেগালের সঙ্গে কঠিন গ্রুপে থাকা ইরাক এই ফল থেকে আত্মবিশ্বাস পাবে। শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের আগে বড় বার্তাই দিল তারা।

তালেবানের নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরছে আফগান নারী দল

ক্রীড়া ডেস্ক
তালেবানের নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরছে আফগান নারী দল
সংগৃহীত ছবি

এক সময় তালেবান শাসনের ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। ফুটবল মাঠ তো দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপনও হয়ে উঠেছিল কঠিন। তবে হার মানেননি আফগানিস্তানের নারী ফুটবলাররা। দীর্ঘ পাঁচ বছরের সংগ্রাম, অপেক্ষা এবং অদম্য সাহসের পর আবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন তারা।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানে নারীদের সব ধরনের খেলাধুলা কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা নিপীড়নের ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তাদের মধ্যে ছিলেন গোলরক্ষক ফাতিমা ইউসুফি ও মিডফিল্ডার মোনা আমিনিও।

ফাতিমা মাত্র একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নেন। সঙ্গে ছিল শুধু একটি স্বপ্ন। আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ফুটবল খেলবেন।

ফাতিমা, মোনাদের আফগান নারী দলের ১৩ জন খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ায় বসতি গড়েন। এরপর গত পাঁচ বছর তারা অনুশীলন চালিয়ে গেছেন, অপেক্ষা করেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরার সুযোগের।

অবশেষে চলতি বছরের এপ্রিলে সেই সুখবর আসে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা আফগান নারী দলকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অনুমোদন দেয়।

বর্তমানে আফগান উইমেন ইউনাইটেড কর্মসূচির ২৩ সদস্য নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে রয়েছেন। সেখানে তারা কুক দ্বীপপুঞ্জের একটি দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবেন।

মোনা আমিনি বলেন, ‘যেদিন শুনলাম আমরা আবার আফগানিস্তানের পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলতে পারব, সেটি ছিল বিশেষ একটি দিন। গত চার-পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফল এটি।’

ফাতিমা ইউসুফিও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘অস্ট্রেলিয়ায় আসার সময় আমরা সবকিছু হারিয়েছিলাম। পরিবার, শৈশবের স্মৃতি এবং জাতীয় দল। আবার জাতীয় দল হিসেবে খেলতে পারব, এর চেয়ে বড় সুখের খবর আর হতে পারে না।’

আফগান নারী দলের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ ছিল ২০১৮ সালে। এরপর দীর্ঘ বিরতি। তবে গত বছর ‘ইউনাইট’ টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে লিবিয়ার বিপক্ষে জয় পায় দলটি। তিন বছর পর জাতীয় সঙ্গীত শোনার সেই মুহূর্তকে জীবনের অন্যতম আবেগঘন অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন খেলোয়াড়রা।

আফগানিস্তানে থাকা নারী ও কিশোরীদের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্বও অনুভব করেন তারা। মোনা বলেন, ‘আমরা তাদের কণ্ঠস্বর হতে চাই। ভবিষ্যতের আফগান নারী জাতীয় দলের জন্য নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই।’

ফাতিমার বিশ্বাস, তাদের দল এক দিন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখাতে চাই মেয়েরাও সমাজের অংশ, তারা শিক্ষা ও খেলাধুলার অধিকার রাখে।’