মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আলোড়ন তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। অভিযোগ উঠেছে উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের চরম অবহেলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এই নারী। মৃত্যুর বেশ কয়েকদিন পর উদ্ধার করায় পচন ধরেছিল মরদেহে। নূরজাহান বেগমের সন্তানেরা তার ভরপোষণে অবহেলা করেছেন বলেও উঠেছে অভিযোগ।
এ ঘটনার জের ধরে নূর জাহান বেগমের সন্তানদের বুধবার (৩ জুন) আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। অন্যদিকে তার ছেলে এবং মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য এ কে এম আনিসুর রহমানকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
মিরপুরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের ভবনটির চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে গত ৩১ মে উদ্ধার করা হয় নূর জাহান বেগমের মরদেহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো কিছু দেখা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, মরদেহে পোকার উপস্থিতিও দেখেছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের দাবির ভিত্তিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, মরদেহ উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ আগে মারা যান নূরজাহান বেগম। পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পর খবর দেয়া হয় একজন নার্সকে। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে জানানোর পর উদ্ধার করা হয় মৃতদেহ।
তবে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে, এই মৃত্যু ঘিরে এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মরদেহের ময়না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মর্গে আনার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো এক সময়ে নূর জাহানের মৃত্যু হয়েছে। অনেক দিন আগে মৃত্যুর কারণে শরীরে পচন ধরার দাবির কোনো সত্যতা নেই। পিঠে যে ক্ষত দেখা গেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় তার নাম ‘বেডসোর’ বা ‘শয্যাক্ষত’। বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত দেখা যায়। দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে শরীরের কোনো অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে ফোসকা বা ক্ষতসহ পচনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
অনুসন্ধানে নূর জাহান বেগমের ঘরে নোংরা পরিবেশের বেশ কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছে কালের কণ্ঠ। তবে সন্তানরা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন অথবা ভরণপোষণ দেননি- এমন অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। যে ফ্ল্যাট থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়, সেটি তার মেয়ের। জীবনের শেষ দুটি বছর তিনি মেয়ের সঙ্গেই থেকেছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ছিলেন দুই ছেলের কাছে। মারা যাওয়ার দুই দিন আগে ঈদের দিন ছোট ছেলে গিয়েছিলেন ওই ফ্ল্যাটে, কোরবানির মাংস খাইয়ে এসেছেন মাকে।
সন্তানদের দাবি, মারা যাওয়ার দিনই (৩১ মে) তার মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এর পরদিন তাকে চাঁদপুরের উত্তর উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। নূর জাহান বেগমের বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান গ্রামের বাড়িতে উপস্থিত থেকে দাফন প্রক্রিয়া তদারক করেন।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক ও রহস্যের জট খুলতে টানা দুই দিন অনুসন্ধান করেছে কালের কণ্ঠ। প্রয়াত এই নারীর বড় ছেলে যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান, ছোট ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান। মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক।
আলোচিত ভবনটিতে বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক খোলা থাকলেও ভিতরের আরেকটি গেট তালা দেওয়া। কলিং বেল চাপলে নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে একজন নারী বেরিয়ে আসেন। প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, তিন বছর তিনি নিচ তলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। তবে চার তলার ফ্ল্যাটের নূর জাহান বা তার মেয়ে ফাতিমার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি।
ওই নারী বলেন, ‘তিনি (ফাতিমা) কারো সঙ্গে কথা বলতেন না। বাসায় কাউকে ঢুকতেও দিতেন না। চুপচাপ বাসা থেকে বের হতেন, চুপচাপ ঢুকতেন। মাথার চুল আউলা-ঝাউলা থাকতো বেশিরভাগ সময়। মাঝে মাঝে দেখতাম শুকনা খাবার নিয়ে আসতেন। তবে সবজি, মাছ, মাংস নিয়ে কখনো বাসায় ঢুকতে দেখিনি। এছাড়া গত তিন বছরে তার মাকেও কখনো দেখিনি। শুনেছি ঈদের দিন তার (মৃত বৃদ্ধা) নাতি খাবার দিয়ে গেছে। লাশ উদ্ধারের দিন পুলিশ আসার পর শুনলাম তিনি মারা গেছেন। তার আগে আমরা কিছুই জানতাম না।’
বাড়ির অন্যদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখালে তিনি বলেন, ‘গেট খোলার ব্যাপারে বাড়িওয়ালার নিষেধ আছে। তাই ভেতরে ঢোকা যাবে না। এছাড়া এই দুপুরে ভবনে কোনো পুরুষ মানুষও নাই।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভবনটির মালিকানা নূর জাহান বেগমের মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার শ্বশুরপক্ষের। ফাতিমার স্বামী মারা যান ২০১৭ সালে। স্বামীর মালিকানা সূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটেই মাকে নিয়ে থাকতেন ফাতিমা।
ওই ভবনে ভাড়া থাকা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান ফাতিমার জীবন অগোছালো হয়ে পড়ে। নিঃসঙ্গতা কাটাতে প্রায় দুই বছর আগে ভাইয়ের বাসা থেকে নিয়ে আসেন মাকে। তবে মা-মেয়ের জীবন এরপর আরো অগোছালো ও বিচ্ছিন্ন হয়ে উঠতে শুরু করে।’
ফাতিমার ভাই বুয়েটের অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, তার দুলাভাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক। তারা মোট ছয় ভাইবোন ছিলেন। এর মধ্যে চার জন মারা গেছেন। আলোচিত ভবনটির নিজের ফ্ল্যাটে ফাতিমা একাই থাকতেন। নিঃসঙ্গতা কাটাতে ২০২৪ সালে বুয়েট শিক্ষক ভাইয়ের বাসা থেকে মাকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে।
মানসিক জটিলতার ইঙ্গিত
কালের কণ্ঠ প্রতিবেদক ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাননি। তবে নূর জাহানের মরদেহ উদ্ধারের সময়কার ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো ফ্ল্যাটে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ। রান্নাঘরের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। নূর জাহানের নিথর দেহ পড়ে ছিল বিছানায়। এসব দৃশ্যের ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ‘সন্তান পরিত্যাক্ত অবস্থায়’ করুণ মৃত্যু হয়েছে এই নারীর।
তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মেয়ের ফ্ল্যাটেই ছিলেন নূর জাহান বেগম। তার কক্ষের মতো একই ধরনের নোংরা পরিবেশ ছিল পুরো ফ্ল্যাটে। এমনকি মেয়ে ফাতিমার কক্ষের চিত্রও একই রকম বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে যাওয়া নার্স ও পুলিশ কর্মকর্তা।
নূর জাহান বেগমের ছোট ছেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমানও ফ্ল্যাটে নোংরা পরিবেশের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, বেশ কয়েক বার ফ্ল্যাট পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েও মা এবং বোনের অনীহার কারণে সফল হননি। এর কারণ হিসেবে তিনি মায়ের দীর্ঘদিনের মানসিক জটিলতার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। এই জটিলতা ধীরে ধীরে মেয়ের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০০৮ সালের নভেম্বরের দিকে আমার বাবা মারা যান। এর পরের বছরেই মাকে নিজের কাছে নিয়ে আসি। আমি তখন বুয়েট ক্যাম্পাসের টু বেডরুমের একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। এরপর পোস্ট ডক্টরাল স্টাডির জন্য ২০১১-১২ সালের দিকে দেশের বাইরে যাওয়ার সময় মা আমার শ্বশুর-শাশুড়ির বাসায় ছিলেন। ২০১৩ সালে দেশে ফেরার পরে আবার আমার বাসায় নিয়ে আসি। উনি অনেক সময় নিজে নিজেই হয়ত একটু গ্রামের বাড়িতে কাটিয়ে আসতেন, আবার আরেক ভাই ও বোনের বাসাতেও মাঝেমধ্যে বেড়াতে যেতেন।’
মায়ের মানসিক কিছু জটিলতার ইঙ্গিত দিয়ে অধ্যাপক আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সব সময় উনার ইচ্ছাটাকেই একটু বেশি প্রাধান্য দিতাম। কারণ উনি একটু সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। এটা সিজোফ্রেনিয়া বা এই টাইপের কিনা- আমরা নিশ্চিত নই। তবে আব্বা বলতেন, এরকম কিছু একটা আছে। আমরা ডিটেইল ডিগ আউট করিনি, তবে দেখতাম উনি একটু সন্দেহবাতিক ছিলেন। এজন্য উনার ইচ্ছাটাকেই প্রাধান্য দিতাম।’
তবে নূর জাহান বেগমকে কখনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নেয়া হয়নি বলে স্বীকার করেন অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘উনার সমস্যাটি বাবা বেঁচে থাকতেই ছিল। আমরা এটা কখনো ওইভাবে ডিল করিনি। এই বাড়ে তো কমে, এটা আসলে কোনো ফিক্সড বিষয় ছিল না। সন্দেহটা এরকম ছিল যে, ধরেন মাঝেমধ্যে কেউ কোনো শব্দ করল। উনার মনে হতো কেন করল এই টাইপের। ফোনে অপরিচিত কেউ বা গ্রাম থেকে কেউ ফোন করলে উনার মনে হতো হঠাৎ কেন ফোন করল? অপরিচিত কাউকে নিয়ে অবজেকশন ছিল। এগুলো নিয়ে সমস্যায় পড়তে হলেও এটা যে অত বড় কোনো চিন্তার বিষয় সেটাও আবার আমরা কখনো মনে করিনি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বলে ডাক্তারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কথাও চিন্তা করিনি।’
মেয়ের সঙ্গে ছিলেন শেষ দুই বছর
নূর জাহান বেগমের মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার স্বামী মারা যান ২০১৭ সালে। এর পর থেকে নিঃসন্তান ফাতিমার জীবনে নেমে আসে নিঃসঙ্গতা। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক দুই দিন চেষ্টা করেও ফাতিমার সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ামাত্র তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তবে তার ভাই অধ্যাপক আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিয়ের পর মোস্টলি ও (ফাতিমা) শ্বশুরবাড়িতে হাজব্যান্ডের সঙ্গেই থাকত। হাজব্যান্ডের মৃত্যুর পরে হয়ত একটু অ্যালুফ (নিঃসঙ্গ) হয়ে পড়েছিল। আরেকটা বিষয় হলো, ছেলেমেয়ে থাকলে হয়ত একটু এক ধরনের সামাজিকতা গড়ে ওঠে। সন্তানদের খাতিরেই মানুষ অনেক ধরনের সামজিকতায় অংশ নেয়। ধরুন আমি নিজের বাসায় দাওয়াত দিলাম, আবার আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে ওই বাসায় গেলাম। বাচ্চারা বাচ্চারা আবার একটা ফ্রেন্ডশিপ গড়ে তোলে। ওই জায়গাটায় তো অবশ্যই মিসিং ছিল।’
নিঃসঙ্গ জীবনের মাঝেই ২০২৪ সালে মা নূর জাহান বেগমকে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন ফাতিমা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ভবনের এক বাসিন্দা জানান, এরপর থেকে ফাতিমা সবার কাছ থেকে নিজেকে আরো বিচ্ছিন্ন রাখতে শুরু করেন। ভবনের ভাড়াটিয়া কারো সঙ্গেও তার তেমন কোন কথা হতো না। নূর জাহান বেগমকেও বাসার বাইরে কেউ কখনো দেখেননি।
বোনের বাসায় মায়ের চলে চাওয়ার বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০২৪ সালের দিকে উনি (নূর জাহান) আবার বোনের কাছে থাকার কথা চিন্তা করলেন। বললেন, তিনি মিরপুরে থাকবেন। আমরাও ভাবলাম বোন তো একা, দুইজন থাকলে হয়ত বেটার হবে। সবচেয়ে বড় কথা আমরা উনাকে কোনো বিষয় নিয়ে জোর করতাম না অতটা। বাট বোনের বাসায় যাওয়ার পরেও মোর অর লেস আমার সঙ্গে অ্যাটাচড ছিলেন।’
ফ্ল্যাটের ভেতরে কেন নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটের একটিতে থাকতেন নূর জাহান বেগম, আরেকটিতে তার মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা। নূর জাহানের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথম তার সন্তানদের নিশ্চিত করেন মিরপুরের ল্যাব প্লাস ডায়াগনোস্টিকের নার্স তামান্না আহমেদ।
বোনের কাছ থেকে ফোন পেয়ে ৩১ মে বিকেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমান ওই ডায়াগনোস্টিক সেন্টার থেকে তামান্নাকে নিয়ে মিরপুরের ফ্ল্যাটে ছুটে যান। তামান্না কালের কণ্ঠকে জানান, শুধু নূর জাহানের কক্ষ নয়, পুরো ফ্ল্যাটই ছিল নোংরা এবং অপরিচ্ছন্ন। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে ফ্ল্যাটে ঢোকা যাচ্ছিল না। মরদেহ উদ্ধারের সময়কার একটি ভিডিওতেও একই অবস্থা দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে যাওয়া পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুর রহমানও জানান, ফ্ল্যাটের প্রতিটি কক্ষ ছিল অগোছাল এবং নোংরা।
নূর জাহান বেগমের ছেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমানের দাবি, ফ্ল্যাটের নোংরা পরিবেশ দূর করার জন্য বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে মা এবং বোনের অনীহায় তা সফল হয়নি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় ওই বাসায় গিয়ে নোংরা এবং অগোছালো পরিবেশ দেখেছি। বোনকে বললাম যে এগুলো তো পরিষ্কার করানো দরকার, তুমি বললে আমি বুয়েট থেকেও লোক পাঠিয়ে দিতে পারি। আমার কিছু ওখানে কিছু ক্লিনার হয়ত শুক্রবারে ছুটির দিনে এসে কাজ করে যাবে। কিন্তু ও বলত এত দূর থেকে পাঠানোর দরকার নেই, আমিই করাবো। এরপরে আমি গত বছরের জুলাই-আগস্টের দিকে একটা গৃহকর্মী মেয়েকে পেলাম। বৃদ্ধ মানুষের সঙ্গে থাকবে, খাওয়া-দাওয়ায় সাহায্য করবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবে এরকম মানুষ সাধারণত পাওয়া যায় না। কিন্তু ওকে পেয়েছিলাম। বোনকে গিয়ে বললাম, এই যে ওকে নিয়ে এসেছি। ও এখন থেকে এখানে থাকবে। বোন বিষয়টা পছন্দ করল কিনা জানি না, যাই হোক ওকে দিয়ে ঘর পরিষ্কার করালাম, সব বুঝিয়ে দিয়ে এলাম। এর সাতদিনের মাথায় কেন যেন বোন আমাকে বলল, ও আর এখানে থাকবে না, তুমি এসে নিয়ে যাও। মাও একই কথা বলল। এখন কথা হচ্ছে, ওদের ডিসিশন এমন হলে আমার কী করার থাকতে পারে। এরপর ওই মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনেছি।’
সবশেষ ঈদের দিন নিজের ছেলেকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন অধ্যাপক আশিকুর রহমান। সেদিনও ঘরের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি।
তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ঈদের আমি ছেলেকে নিয়ে মাংস নিয়ে উনার (মা) সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। একটা দেয়াল ঘড়িও নিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটা দেয়ালে টাঙিয়ে দিলাম। উনার চোখে সমস্যা ছিল। জিজ্ঞেস করলাম ঘড়িতে সময় দেখতে পাচ্ছে কিনা। উনি বলল হ্যাঁ দেখা যাচ্ছে। তারপরে জানতে চাইলাম তুমি কি হাসপাতালে যাবা? তোমার কেমন লাগছে বা কী? তো বলল না হাসপাতালে যাবে না। ঈদের ছুটিতে আমার বোন মোটামুটি টেক কেয়ার করতে পারছে, কোনো অসুবিধা নাই। আমি তখনও ওই গৃহকর্মী মেয়েটাকে আনব কিনা জানতে চেয়েছি। কারণ সে এখন আবার অ্যাভেইলেবল। কিন্তু উনি রাজি হলেন না। তো এই হচ্ছে মূল বিষয়। এখানে অবশ্যই আমাদের পক্ষ থেকেও কিছু গ্যাপ থাকতে পারে, বাট যেভাবে মিডিয়া প্রচার করছে অবভিয়াসলি সেরকম কিছু না।’
ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা
নূর জাহান বেগমের প্রতি সন্তানদের অবহেলার পাশাপাশি ভরণপোষণ না দেয়ার অভিযোগ প্রচার করেছে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম। তবে এর কোনো সত্যতা নেই বলে দাবি করেছে পরিবার। বিশেষ করে মেয়ের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে মায়ের বসবাস করার পরেও কেন এ ধরনের অভিযোগ উঠছে তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, বোনের বাসায় থাকলেও তিনিসহ আরেক ভাই মায়ের বিভিন্ন প্রয়োজনে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিতেন। কানাডায় তাদের কোনো ভাই নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়মিত যোগোাযোগ তো ছিলই, এর বাইরেও উনি (মা) আমাকে যখনই বলতেন সঙ্গে সঙ্গে বিকাশেও টাকা পাঠিয়ে দিতাম। উনি ফোন করে হয়ত বলতেন, এক হাজার টাকা বা পনেরশ টাকা পাঠিয়ে দাও। আমি পাঠিয়ে দিতাম।’
যাচাই ছাড়াই মৃত্যুর পর মৃতদেহে পচনের তথ্য
নূর জাহাম বেগমের মৃতদেহ উদ্ধারের পর প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পরে মূলধারার অনেক সংবাদমাধ্যম দাবি করে অন্তত সপ্তাহখানেক আগে তিনি মারা গেছেন। এই দাবির একমাত্র উৎস ছিল স্থানীয় কিছু ব্যক্তির বক্তব্য, যারা কেউই এর কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি।
বিষয়টি নিয়ে কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক মৃতদেহ উদ্ধারের সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত নার্স, পুলিশ কর্মকর্তা, ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এতে সপ্তাহখানেক আগে নূর জাহান বেগমের মৃত্যু অথবা মৃতদেহে পচনের কারণে পোকা জন্মানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মর্গে আসার ২৪ ঘণ্টা আগের যেকোনো সময়ে নূর জাহান বেগম মারা গেছেন।
অধ্যাপক আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, ঈদে দেখা করে আসার দুদিন পর ৩১ মে বিকেলে তার বোন ফোন করে মায়ের সাড়া না পাওয়ার খবর জানান। এরপর তিনি বুয়েটের বাসা থেকে রওনা হয়ে মিরপুরের ল্যাব প্লাস ডায়াগনোস্টিকের নার্স তামান্না আহমেদ নিয়ে ওই বাসায় যান।
তামান্না আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আমার আরেকে কলিগকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকার পর মেয়ে উনার মার রুমটা দেখিয়ে দেন। পরে দেখি মহিলা খাটের উপরে শুয়ে আছে, উনার গায়ে একটা কম্বল দেওয়া। উনি ডান কাত হয়ে তাকিয়ে আছেন। আমরা পালস চেক করে দেখলাম পালস নাই। আমার কলিগ বিপি চেক করলো। তখন দেখলাম উনার বগলের নিচ থেকে একটা পোকার মতো কী যেন বের হচ্ছে। লাশটা শক্ত হয়ে আছে।’
তামান্না আরো বলেন, ‘মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম উনি (নূর জানান) কখন থেকে এভাবে আছেন। উনি বললেন সকালে মাকে আপেল খাইয়েছেন, বেলা একটা-দুইটার দিকে দুপুরের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করেছেন। তখনও নাকি সে জীবিত ছিল।’
তামান্না এরপর ট্রিপল নাইন নম্বরে কল করে ঘটনাটি পুলিশকে জানান। দেহে পোকার বিষয়টি নিয়ে আবারও প্রশ্ন করলে তিনি আগের তথ্য পরিবর্তন করে বলেন, ‘উনার পুরো শরীরটা দেখি নাই। জাস্ট হাতটা দেখছি, আর গলাটা দেখছি। গলা শক্ত হয়ে ডান কাত হয়েছিল, এখানে কোনো পোকা ছিল না। কিন্তু বগলের নিচে মে বি পোকা ছিল। আমি সিওর না, আমার কাছে মনে হচ্ছে ওইখানে পচন ধরছিল। আমি জাস্ট এক পলক দেখামাত্রই হাত নামিয়ে ফেলেছি।’
তামান্না আহমেদের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যান পল্লবী থানার ওসি মো. হাসান বাসির এবং উপপরিদর্শক শামসুর রহমান। এসআই শামসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাথার ডান পাশে হালকা একটু আঘাতের দাগ আছে। হয়ত পড়ে গেছিলেন। প্রথমে সুরতহাল প্রতিবেদনে আমি এটা লিখিনি। পরে ফরেনসিক ডাক্তার আঘাতের দাগ দেখতে পেয়ে বিষয়টা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেন।’
নূরজাহান বেগমের মরদেহে পচন ছিল কিনা জানতে চাইলে শামসুর রহমান বলেন, ‘হাতগুলো স্বাভাবিক ছিল। তবে অনেক দিন ধরে শুয়ে ছিলেন তো, তাই পিঠের দিক দিয়ে পচে গেছে। পিঠ থেকে পাঁজর পর্যন্ত পচে গেছে।’
নূর জাহান বেগমের ময়নাতদন্ত হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে। এতে জড়িত একজন না প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাশ পচা-গলা ছিল না। ওই দিন উনি বিকেলেই সম্ভবত মারা গেছেন। আর রাতে মর্গে আসে লাশ। পিঠে ঘা ছিল, যেটাকে বেডসোর বলে। পাঁজরেও ঘা দেখেছি। ছোপ ছোপ ঘাগুলো একেক সাইজের। দুই থেকে তিন ইঞ্চি সাইজের ঘা। পিঠের জায়গায় জায়গায় ঘা ছিল। ওই ঘায়ের মধ্যে পোকা দেখিছি। ওই পোকাগুলোই সারা শরীরে ছড়িয়েছে।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. নাশাত জাবীন নূরজাহান বেগমের মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে বডিটা ফ্রিজিং গাড়িতে করে আসে। শরীর ডিকম্পোজিশন (পচন) ছিল না, তবে বেডসোর (শয্যাক্ষত) ছিল।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আইনুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেডসোর হলো ত্বকের এমন এক ধরনের ক্ষত, যা দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে শরীরের কোনো অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়লে তৈরি হয়। সাধারণত কোমর, পিঠ, নিতম্ব, গোড়ালি বা কনুইয়ে এটি বেশি দেখা যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেডশোর বেশি দেখা যায়। রোগীর বেড পজিশনিং ঠিক করা, অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া, নিয়মিত ড্রেসিং করাসহ বেশকিছু চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগের উপশম হতে পারে।’
নূর জাহান বেগমের যুগ্ম সচিব ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
মেয়ের ফ্ল্যাট থেকে নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের পর তাদের সন্তানদের বিরুদ্ধ তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেক সংবাদমাধ্যমেও তাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে তার এক ছেলে এবং মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য এ কে এম আনিসুর রহমানকে বুধবার প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে সরকার।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক একাধিকবার চেষ্টা করেও আনিসুর রহমানের কোনো বক্তব্য নিতে পারেননি। তবে পল্লবী থানার এসআই শামসুর রহমান জানান, পুলিশকে তিনি মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকার তথ্য দিয়েছেন। দাবি করেছেন, বোনের বাসায় যাওয়ার পরেও মায়ের খোঁজ খবর নিতেন।
নূরজাহান বেগমকে সোমবার চাঁদপুরের উত্তর উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। বড় ছেলে আনিসুর রহমান উপস্থিত থেকে দাফন প্রক্রিয়া তদারক করেন বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন আরেক সন্তান আশিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘পোস্টমর্টেমের পর ঢাকা থেকে ফ্রিজিং ভ্যানে করে আমার ভাই ও মামাত ভাই মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। আমি ঢাকার বিষয়গুলো সামলেছি, আর ওরা গ্রামে দাফনের কাজ করেছে।’
মানসিক জটিলতার বিয়োগান্তক সমাপ্তি?
নূর জাহান বেগমের দীর্ঘদিনের মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার ছেলের দেয়া তথ্য থেকে। একইসঙ্গে ভবনটির বাসিন্দাদের তথ্য থেকে নূর জাহানের মেয়ের অস্বাভাবিক আচরণের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে ফাতিমা মিরপুরের যে স্কুলে শিক্ষকতা করছেন সেখানকার প্রধান শিক্ষকের দাবি, স্কুলের শিশুদের সঙ্গে তার আচরণ স্বাভাবিক, তবে সহকর্মীদের সঙ্গে বাড়তি কথা বলেন না।
ঈদের পরে স্কুলটি এখনও খোলেনি। এর প্রধান শিক্ষক মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ফাতিমাকে দিয়ে বাচ্চাদের ডায়েরি ও খাতা লেখাই। তিনি প্লে-নার্সারির বাচ্চাদের হাতে ধরে লেখা শেখান। সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত স্কুলে থাকেন। চুপচাপ মানুষ, শুধু নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। তার কোনো খারাপ আচরণ কখনো দেখিনি। বাসার দৃশ্য নোংরা হলেও স্কুলে, পরিপাটি হয়ে আসেন।’
মনোবিশেষজ্ঞরা নূর জাহান বেগমের ঘটনাটিকে একটি জটিল মানসিক দৃশ্যপটের বিয়োগান্তক পরিণতি হিসেবে দেখছেন। মায়ের পাশাপাশি মেয়েকে নিয়েও জানাচ্ছেন উদ্বেগ।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার সামগ্রিক বিবরণে মনে হচ্ছে, এক্ষেত্রে জটিল মানসিক রোগ হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশি। বিশেষ করে এটি সিজোফ্রেনিয়া হয়ে থাকলে রোগীর মধ্যে অনেক ভ্রান্ত চিন্তা-ভাবনা কাজ করে। রোগীকে অনেকভাবে কনভিন্সের চেষ্টা করেও নিজস্ব বিশ্বাস থেকে নড়ানো যায় না। উনি যেটা বিলিভ করেন সেখানেই ফিক্সড থাকতে চান। তার মধ্যে নানা রকমের সন্দেহ থাকতে পারে এবং সন্দেহগুলা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার পরিবারের মধ্যেই হয়। অনেক সময় অনেকে মনে করেন সবাই তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। এটার আসলে একমাত্র নিরাময়ের উপায় চিকিৎসা এবং ওষুধ।’
এ ধরনের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অনেক বেশি সজাগ ও দায়িত্ববান হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. মেখলা সরকার বলেন, ‘রোগী তার সমস্যাটিকে রোগ মনে করেন না বলে চিকিৎসা নিতে চান না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের জন্য বিষযটা ডিফিকাল্ট হয়ে যায়। তবে এরপরেও একটা ব্যাপার আছে। রোগী যদি ডাক্তারের কাছে না আসেন তাহলে চিকিৎসা হবে কী করে? এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরাও আমাদের কাছে এলে কিন্তু আমরা একটা হেল্প করতে পারি।’
নূর জাহানের মেয়ের প্রতিও যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মেয়েরও মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। হয়ত এই সমস্যাটা মার মতো অত প্রকট না, কিন্তু একই রকম প্রবলেম থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যেরই উচিত— উনি চিকিৎসা নিতে না চাইলেও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া। সেখানে কিন্তু তারা কিছু হেল্প পাবে, কিছু গাইডলাইন পাবে যে কীভাবে তাকে হেল্প করতে পারে।’
‘সামাজিক বিচার’ নিয়ে উদ্বেগ
নূর জাহান বেগমের মৃত্যু ঘিরে ‘অপ্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে’ পরিবারের বাকি সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে হেনস্তা করার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী এবং সংবাদমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা।
আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন একটা মবের শাসনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমরা নিজেরাই আসলে একটা মব তৈরির হোতা হয়ে গিয়েছি। প্রত্যেকটা মানুষ এবং ইভেন আমাদের ইনস্টিটিউশনগুলো, সংবাদপত্রগুলোও স্রোতে গা ভাসাচ্ছে। নারী মারা গেলেন, হয়তো তাদের পারিবারিক সমস্যা থাকতে পারে, সেখানে অবহেলা থাকতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে এই ফ্ল্যাটটা তো দীর্ঘদিন ধরে এখানে। এতদিন তাদের প্রতিবেশীরা কোথায় ছিলেন?’
তিনি বলেন, ‘অনেক বড় বড় পত্রিকায় নিউজগুলো দেখেছি। আমি কোথাও আসলে কোনো ম্যাটার পাচ্ছিলাম না। সবাই একই কথা লিখছে—প্রতিবেশী বলেছে, নার্স বলেছে। আমার কাছে সবচেয়ে যেটা খারাপ লেগেছে তা হলো, একজন মারা গেছেন, তার মেয়ে আছে, সেখানে ঘরে ঢুকে ধারণ করা ভিডিও মিডিয়া কীভাবে প্রচার করছে? এটা তো আইনেরও লঙ্ঘন। আপনারা ঘরের ভেতরে ঢুকে এভাবে কারো পার্সোনাল বিষয় হুটহাট প্রচার করতে পারেন না। সাগর-রুনী হত্যার পরে এভাবে আলামত নষ্ট করার ক্ষেত্রে মিডিয়াও বড় ভূমিকা রেখেছিল বলেও আমার মনে হয়।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে যারা এখন খুব মাতামাতি করছেন, খোঁজ নিলে হয়ত দেখা যাবে তাদের অনেকেই হয়ত নিজেদের মা-বাবার খোঁজখবর নেন না। বিষয়টি যেভাবে ছড়িয়েছে তাতে পুরো পরিবারটিকে এখন ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এভাবে ন্যায়বিচারের কথা বলে আমরা নিজেরাই হয়ত হন্তারক হিসেবে কাজ করছি।‘
ঘটনাটির উপস্থাপনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আসলে কারো... মানে যারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, অথবা মৃতের পরিবারের সদস্যদের কোনো বক্তব্য নেয়া ছাড়াই বলে দিলাম সাত দিন আগে মারা গেছে বা তাকে ভরণপোষণ দেয়া হয়নি। সন্তানদের বিরুদ্ধে ভরণপোষণ না দেয়ার অভিযোগ তোলা হলো, অথচ ওই নারীর মৃতদেহ পাওয়া গেল তার মেয়ের বাসাতেই। এই যে একটা সোশ্যাল জাস্টিসের ক্ষেত্রে মিডিয়া যে ভূমিকা নিচ্ছে তার প্রভাব ভয়াবহ। যাচাই-বাছাই ছাড়াই, অর্থাৎ সিঙ্গেল সোর্স থেকে আপনি যা পাচ্ছেন সেটাই প্রকাশ করছেন। ধরা যাক ঘটনাটি সত্যি, তারপরেও এটা একটা প্রাইভেট ইস্যু। প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তুলে ব্যক্তিদের পরিচয় ডিসক্লোজ করা সাংবাদিকতার কোনো এথিকসেই পড়ে না, আনটিল অর আনলেস আপনি তাদের সঙ্গে কথা না বলা পর্যন্ত।’







