ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়; এটি বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। তাই শুধু ফগিং বা কীটনাশক ছিটিয়ে নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে মত দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রতিনিধিরা।
শনিবার (৪ জুলাই) ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরেন।
এগুলো হলো- এক. শুধু ফগিং নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। দুই. সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সমন্বয় ও বছরজুড়ে নজরদারি জোরদার করা। তিন. উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো। চার. জনসচেতনতাকে আচরণগত পরিবর্তনে রূপ দিয়ে নিয়মিত পানি জমার স্থান পরিষ্কার করা। পাঁচ. আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত র্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েন ও সহজলভ্য এনএস-১ পরীক্ষা নিশ্চিত করা। ছয়. হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে রাখা। সাত. সরকার, স্থানীয় সরকার ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা; এবং ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করে জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারো মৃত্যু হয়নি। তবে একই সময়ে নতুন করে ১৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ছয় হাজার ১৩০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৪৪৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ৬ হাজার ৫৯৭ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে জুনে, এই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৯০৭ জন। চলতি মাসে আক্রান্ত ৪৯৩ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেজ্ঞরা যা বলছেন
গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ ছিল। সেখানে আইইডিসিআর-এর ফেলো হিসেবে গবেষণাকাজ করেছেন রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন। তিনি বলেন, ফগিংয়ের পরও ৭০ শতাংশের বেশি এডিস মশা বেঁচে থাকে। তাই ড্রাম, টব, প্লাস্টিক বর্জ্য ও পানি জমে থাকা পাত্রসহ সব ধরনের প্রজননস্থল ধ্বংসই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সমন্বয়, বছরজুড়ে অ্যান্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইলেন্স এবং উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনে নিয়মিত নজরদারিতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে ওয়াসার পানির মিটার হোলে (৩৭ শতাংশ), এরপর বালতিতে (২২ শতাংশ), বেজমেন্টের পার্কিং এলাকায় জমে থাকা পানিতে (১২ শতাংশ) এবং ড্রামে (৮ শতাংশ)। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ প্রজনন কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে হচ্ছে। তাই এসব স্থান লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিলে অল্প খরচেই কার্যকরভাবে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন জানান, চলতি বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি শাখার সহায়তায় ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ১২ দিনের প্রাক-বর্ষা লার্ভা জরিপ পরিচালনা করেছে। জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ৩৬টি ওয়ার্ডকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১২টি ওয়ার্ডকে সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে বহুতল ভবনে (৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ)। এরপর রয়েছে স্বতন্ত্র বাড়ি (২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ) এবং নির্মাণাধীন ভবন (১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ)।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ডেঙ্গুকে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত র্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েন, সহজলভ্য এনএস-১ পরীক্ষা এবং তৃণমূলভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা, ডেঙ্গু কর্নার, প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রতিটি পরিবারকে নিজ নিজ বাড়ির প্রজননস্থল ধ্বংসে দায়িত্ব নিতে হবে।
২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক আয়েশা শিল্পী বলেন, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু মূলত ঢাকা-কেন্দ্রিক ছিল। তবে ২০১৮-১৯ সালের পর এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় মূলত ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু কর্নার রয়েছে এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক রয়েছে। আমরা যদি প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারি ঢাকায় রোগীর চাপ কমানো যাবে, একই সঙ্গে মৃত্যু কম হবে।
বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, গত ২৬ বছর ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞরা একের পর এক সুপারিশ দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়ায় আজ ডেঙ্গু রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু নাগরিকদের অসচেতনতাকে দায়ী করলে হবে না; স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়হীনতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের অভাবই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বেশি দায়ী। এই সংকট দূর না হলে প্রতিবছর গোলটেবিল বৈঠক হবে, কিন্তু মানুষ ডেঙ্গুতে মৃত্যুবরণ করতেই থাকবে।
গোলটেবিলের সমাপনী বক্তব্যে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক বা শুধু প্লাটিলেট কমলেই প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজন নেই। জ্বর হলে দ্রুত এনএস-১ পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আতঙ্ক নয়- সারা বছর সচেতনতা, মশার উত্স ধ্বংস এবং সমন্বিত উদ্যোগই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।