• ই-পেপার

উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় : স্বাস্থ্যসেবায় নতুন উদ্যোগ

মাটি বাঁচান, গাছ লাগান : পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ রক্ষার সময় এখনই

অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাসেম
মাটি বাঁচান, গাছ লাগান : পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ রক্ষার সময় এখনই
অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাসেম

আমাদের আবাসস্থল পৃথিবীর বয়স​ প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন। আমরা তার পৃষ্ঠে বসবাস করি, যেখানে ৭১ শতাংশ পানি এবং বাকি ২৯ শতাংশ ভূমি রয়েছে।

আমাদের এই ধরণীটা খুব শান্ত, কোন তর্কে জড়ায় না কিন্তু এটি আপোস করেন না, সময়মতো সতর্ক সংকেত পাঠায় যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভয়াবহ দাবানল, তাপপ্রবাহ, হিমবাহ গলে  যাওয়া ইত্যাদি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, ক্রমাবনতিশীল বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা প্রবাহের ক্রমবর্ধমান পুনরাবৃত্তির প্রেক্ষাপটে, বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে প্রতি বছর ৫ই জুন বিশ্ববাসী বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করছে।

এটি জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং দূষণের মতো ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলার জন্য একটি জরুরি আহ্বান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই প্রেক্ষাপটে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয় ১৯৭৩ সালে, “Only One Earth” থিমে। এরপর থেকে প্রতি বছর ৫ই জুন দিবসটি সারা বিশ্বে একটি নির্দিষ্ট সিম (প্রতিপাদ্য) নিয়ে পালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘের মতে, বর্তমান পৃথিবী এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যার জন্য অবিলম্বে সমন্বিত জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।  এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.” — অর্থ হলো: “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।”

আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র ‘বাকুতে’ মহামান্য রাজকুমারী ক্যামিলা অফ বুর্বন টু সিসিলিস-এর পৃষ্ঠপোষকতায় মূল বিশ্ব পরিবেশ দিবস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক উদযাপনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শত শত সহায়ক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসাকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন জনসভা, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনা করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশেরমতো বাংলাদেশেও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর (DOE) বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করছে। এর মধ্যে রয়েছে র‍্যালি, সেমিনার, বৃক্ষরোপণ ও সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান। 

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপ। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে পদক্ষেপসমূহ:

স্বাস্থ্যকর মাটি

বৃক্ষ জন্মানোর প্রধান ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যকর মাটি। স্বাস্থ্যকর মাটি ছোট জীব থেকে শুরু করে মানবগোষ্ঠী পর্যন্ত সকলকে প্রয়োজনীয় উপাদানের যোগান দিয়ে থাকে। ইহা উদ্ভিদকে পুষ্টি সরবরাহ করে, যা আমাদেরকে খাওয়ায়, পানিকে ফিল্টার করে আমাদের পানের যোগ্য করে দেয়, বন্যা থেকে রক্ষা করে, লক্ষ কোটি জীবের বাসস্থান হিসেবে কাজ করে এবং আমাদেরকে এন্টিবায়োটিক সরবরাহ করে। 

স্বাস্থ্যকর মাটির মূল উপাদান হলো জৈব পদার্থ পরিমাণ ৩ থেকে ৬ শতাংশ থাকা দরকার কিন্তু বাংলাদেশের অনেক জমিতে তার পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। বর্তমানে আমাদের প্রায় ৭৫% আবাদি জমি তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, শুধুমাত্র অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার ও জৈব পদার্থ ঘাটতির কারণে। দেশে প্রায় ৮০% আবাদি জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে। মাটিকে সুস্থ বা জীবিত রাখার একমাত্র উপায় হলো বেশি পরিমাণে জৈব পদার্থ যোগ করা এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে আনা। জৈব পদার্থের প্রধান উৎস হলো শহর-বন্দর ও গ্রামের সব রকমের পচনশীল আবর্জনা এবং পশুর গোবর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের খামার শাখার তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ২ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার পশু রয়েছে। দৈনিক ১০ কেজি হিসেবে উক্ত পশু সমূহ থেকে বছরে গোবর আসে প্রায় ৯ কোটি ১২.৫ লাখ টন। অন্যদিকে, আমাদের নগরগুলোতে দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তার মধ্যে রয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন পচনশীল বর্জ্য (Ahmed, 2019)।  দৈনিক উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ পচনশীল বর্জ্য ও গরুর গোবর একটি অত্যাধুনিক স্মার্ট, টেকসই পরিবেশবান্ধব "ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (Black Soldier Fly- BSF)" এর মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব উন্নত মানের জৈব সার ও বিকল্প প্রাণিখাদ্য (যেমন- মাছ ও পোল্ট্রির খাবার)। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এই উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা থেকে যেমন জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধ মুক্ত শহর।

আবাদি জমি

বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ১% হারে বাড়ছে অন্যদিকে আবাদযোগ্য জমি ১% হারে কমছে। তাছাড়া যেখানে সেখানে নতুন বাড়িঘর তৈরি করে আশেপাশে জমিগুলো ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলছে। তার জন্য ভূমি সেটলমেন্ট অ্যাক্ট বাস্তবায়ন করা দরকার। 

সিসি ক্যামেরার ব্যবহার

উন্নত দেশগুলোর মতো আসবাবপত্র, খাট, সোফা, বালিশ, তোশক নিজ খরচে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে রাখার নির্দেশ থাকতে হবে। ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে সব রকমের ময়লা-আবর্জনা ফেলব আর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন সব সরিয়ে নেবে এ মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। আমাদের কারণেই সামান্য বৃষ্টিতে শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ ও সতর্কতার জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার

বাংলাদেশে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটা আছে, বছরে তৈরি হয় প্রায় ৩,৫০০ কোটি ইট, তাতে ১৩ কোটি টন মাটি ব্যবহৃত হয়, যা ৬৫ হাজার হেক্টর জমির ওপরের স্তরের মাটির সমান।  ইটভাটার কারণে পার্বত্য এলাকার পাহাড়গুলো এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। ইটভাটার মালিক ও ব্যবহারকারীদের কাছে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের সুবিধাসমূহ তুলে ধরতে হবে এবং তার উৎপাদন এবং ব্যবহারেও আকৃষ্ট করতে হবে।

প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিতকরণে করণীয়

প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিতে ক্ষয় হতে ৪০০ থেকে ৫০০০ বছর লাগে। প্লাস্টিক উদ্ভিদের পুষ্টি, পানি গ্রহণ ও চলাচলে বাধা প্রদান করে। ফলে উদ্ভিদের শেকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি অফিসের আয়োজনে এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় প্লাস্টিক ব্যানারের পরিবর্তে প্রিন্টেড মেটেরিয়াল, মাল্টিমিডিয়া ও অন্যান্য দেশের মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। কোন অনুষ্ঠানে পরিবেশ দিবসে কোন প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার করে দিবস থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না, এদিকে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।

বৃক্ষের চারা ও রোপনের স্থান নির্বাচন

বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ শীর্ষক একটি বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে চলমান এই কর্মসূচিতে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ অভিযান চলমান আছে। বিভাগীয় শহরগুলোতে বৃক্ষের চারা ও স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে বনবিভাগের সহায়তা নিলে উক্ত পদক্ষেপের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যথায় বিনামূল্যে চারা বিতরণ বা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে চারা সরবরাহ করলে বৃক্ষরোপণের সুফল বয়ে আনবে না, কারণ বৃক্ষ রোপনের জন্য উপযুক্ত জায়গা শহরগুলোতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে অন্তবর্তী কালীন সরকার গত ১৫ই মে ২০২৫ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন–১ অধিশাখা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ দুটির চারা তৈরি, রোপণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছেন। তাদের নিষিদ্ধ করার পিছনে বিজ্ঞানসম্মত কোন ব্যাখ্যা ছিল না। বর্তমান সরকারের কাছে বিষয়টি পূণ:বিবেচনা করে গাছ দুইটির চাষাবাদ বন্ধ না করে  উপকূলীয় অঞ্চল, অবক্ষয়িত বন, পতিত জমি, রাস্তা–ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি অফিস প্রাঙ্গণ ও জলাভূমির আশেপাশে রোপণের উদ্যোগ নিলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের কাঠের চাহিদা লাঘবে গাছ দুটো ভূমিকা রাখবে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, গাছ লাগানো একটি 'সাদাকায়ে জারিয়া' বা চলমান দান। যতদিন ওই গাছ থেকে মানুষ, পশুপাখি বা কীটপতঙ্গ উপকৃত হবে (ফল খাবে, ছায়া নেবে), ততদিন গাছ রোপণকারী ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও এর সওয়াব বা পুণ্য পেতে থাকবেন। আমাদের স্লোগান হোক 'মাটি বাঁচান গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান'। সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় মাটি হলো প্রধান ভিত্তি। এটি পৃথিবীর সকলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বেঁচে থাকা এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে বহুমুখী ভূমিকা পালন করে। আমাদের উচিত প্রকৃতির প্রেরণার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব আবাসভূমি রেখে যাওয়া।

লেখক : অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাসেম। 

মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিচার যখন ভাইরালের ওপর নির্ভরশীল

শতরূপা দে
বিচার যখন ভাইরালের ওপর নির্ভরশীল

রাজধানীর মিরপুরে সাত বছর বয়সী রামিশাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঈদের ছুটির মধ্যেও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যার ঘটনায় দ্রুত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। আবার কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর নেত্রকোনার আব্দুল মজিদ সরকারি ভাতার নথিতে ‘মৃত’ তালিকা থেকে জীবিত হয়ে নিজের অধিকার ফিরে পেয়েছেন।

এসব খবর পড়লে প্রথমে মনে হয় দেশে আইন আছে, প্রশাসন কাজ করছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র তৎপর। মনে হয়, সমস্যা যত বড়ই হোক, শেষ পর্যন্ত আইন তার কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা আরো নির্মম এবং অস্বস্তিকর। কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেক নাগরিকের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি করছে যে, বিচার ও প্রশাসনিক প্রতিকার অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে কোনো ঘটনা কতটা আলোচনায় এসেছে, কতটা মানুষের নজর কেড়েছে, কিংবা কতটা ভাইরাল হয়েছে তার ওপর।

সামগ্রিক ঘটনাগুলোর দিকে খেয়াল করে আমরা দেখতে পাই, রামিশার প্রতি সংঘটিত নির্মমতার বিচার চেয়ে দেশজুড়ে মানুষ সোচ্চার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমনকি ঈদের ছুটির মধ্যেও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা গেছে। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরো শিশু ও নারী ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের কান্না জাতীয় আলোচনায় জায়গা পায়নি, তাদের ছবি মানুষের টাইমলাইনে ঘোরেনি, তাদের নামও অধিকাংশ মানুষ জানে না। ফলে তাদের মামলার অগ্রগতি কী, বিচার কোন পর্যায়ে আছে, কিংবা তারা আদৌ ন্যায়বিচার পাবেন কি না—সেসব প্রশ্নও জনআলোচনার বাইরে থেকে গেছে।

বুলেট বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডও একই বাস্তবতার আরেকটি প্রতিচ্ছবি। একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিনতাইকারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হলেন, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হলো, দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারও করা হলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিদিন যেসব সাধারণ মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন বা সড়কে প্রাণ হারাচ্ছেন, তাদের সবার ক্ষেত্রেই কি একই দ্রুততা দেখা যায়? প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছিনতাই, সন্ত্রাসী হামলা কিংবা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। কেউ ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। কিন্তু তাদের সবার গল্প কি রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায়?

এই দেশে এমন হাজারো মানুষ আছেন, যারা প্রশাসনিক গাফিলতি, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতাবানদের অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অথচ তাদের গল্প কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। তারা ভাইরাল হন না। ফলে তাদের জন্য রাষ্ট্রও ততটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে আব্দুল মজিদ ভাগ্যবান। কারণ তার কষ্টের গল্পটি সংবাদ হয়েছিল। রাষ্ট্র তাকে দেখেছিল। প্রশাসন নড়ে-চড়ে বসেছিল। এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার কিংবা নাগরিক সেবা কখনো দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভর করতে পারে না।

এই বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশের সামগ্রিক অপরাধচিত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১ হাজার ৯৩০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১১ জন মানুষ খুন হয়েছেন। ছিনতাই ও দস্যুতার মামলার সংখ্যাও দুই হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কেবল ছিনতাইকারীদের হামলায়ই কয়েক মাসে অন্তত ১৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে সন্ত্রাসী হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মাদক-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ড এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের নামে অসংখ্য রক্তপাত। কিন্তু এসব ঘটনার খুব অল্প অংশই জাতীয় আলোচনায় আসে। অধিকাংশ মানুষ নীরবে হারিয়ে যায় পরিসংখ্যানের ভিড়ে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল, মানুষ ধীরে ধীরে আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে বিচার পেতে হলে আগে আলোচনায় আসতে হবে, সংবাদ হতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে হবে। এই মানসিকতা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যখন মানুষ বিশ্বাস হারায় রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করবে, তখন কেউ নীরবে অন্যায় মেনে নেয়, আবার কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্যত হয়।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মব জাস্টিস বা গণপিটুনির ভয়াবহ বৃদ্ধি সেই আস্থাহীনতারই একটি প্রকাশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল ৫১ জন। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ জনে। ২০২৫ সালে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২০০-এর কাছাকাছি পৌঁছায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই ২৭৬টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত এবং ২৪২ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; এগুলো রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের কমে যাওয়া আস্থার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

কারণ মানুষ যখন মনে করে আইনের মাধ্যমে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠতে চায়। কেউ চোর সন্দেহে ধরা পড়লেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার বদলে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। গুজব ছড়ালেই জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে সহিংস করে তুলছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উপস্থিত থেকেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার চার বছরের শিশু ধর্ষণকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ নাগরিকের বিচারের প্রতি আস্থাহীনতারই একটি বহিঃপ্রকাশ।

এই বাস্তবতার পেছনে আমাদের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখনো অনেকাংশে প্রতিক্রিয়াশীল। অর্থাৎ অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করার চেয়ে, ঘটনা ঘটার পর জনমত বা আলোচনার চাপ তৈরি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। ভুল সিদ্ধান্ত, গাফিলতি কিংবা দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়। তৃতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষকে হতাশ করে তোলে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, ফলে মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশে বিচার অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া থেকেও পুরোপুরি মুক্ত নয়। প্রভাবশালীরা তুলনামূলক দ্রুত সুরক্ষা পান, অথচ সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। ফলে আইনের সমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। আইন তখন সবার জন্য সমান নয়—এমন ধারণা সমাজে শক্তিশালী হতে থাকে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশও অপরাধ ও সহিংসতার সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তবে তারা কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। যুক্তরাজ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন সংস্থা কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি স্বচ্ছতা বাড়াতে বডি ক্যামেরা চালু করা হয়েছে। এস্তোনিয়ার মতো দেশ ডিজিটাল গভর্নেন্সের মাধ্যমে প্রশাসনিক সেবাগুলোকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে ভুল তথ্য দিয়ে একজন জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে ফেলার সুযোগ খুব কম। এসব উদাহরণ দেখায়—চাইলেই পরিবর্তন সম্ভব।

বাংলাদেশেও সেই পরিবর্তন জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে। কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে, যাতে মানুষ বছরের পর বছর আদালতের পেছনে না ঘোরে। প্রশাসনিক ভুলের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি আড়ালে না থাকে। একই সঙ্গে গুজব ও উসকানি প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও কার্যকর ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে নাগরিককে ‘ভাইরাল কনটেন্ট’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। একজন সাধারণ মানুষের জীবন কোনো ট্রেন্ডিং পোস্টের সঙ্গে তুলনাযোগ্য হতে পারে না। বিচার কোনো সৌভাগ্যের বিষয় হতে পারে না; এটি একটি মৌলিক অধিকার।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কেবল অপরাধ নয়; বরং মানুষের মনে জন্ম নেওয়া সেই ভয়ংকর বিশ্বাস—‘ভাইরাল না হলে বিচার নেই।’ এই বিশ্বাস যদি আরো গভীর হয়, তাহলে সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। তখন আইন থাকবে, আদালত থাকবে, প্রতিষ্ঠান থাকবে; কিন্তু মানুষের আস্থা থাকবে না। আর যে রাষ্ট্রে মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে, সেখানে শেষ পর্যন্ত আইনের শাসন নয়, জনতার রায়ই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

লেখক : পিআর প্রফেশনাল

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড : মমতার তীর মোদি সরকারে

আহসান হাবিব বরুন
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড : মমতার তীর মোদি সরকারে
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের মানুষ বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেখেছে। দেখেছে রক্তে ভেজা রাজপথ, দেখেছে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া পরিবার, দেখেছে ক্ষমতার অন্ধকার করিডোরে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য সত্য। কিন্তু কিছু হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির ভেতরে জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ ও সন্দেহের প্রতীক। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ঠিক তেমনই এক ঘটনা, যা আজও বহু মানুষের মনে অজানা প্রশ্নের দগদগে ক্ষত হয়ে আছে।

সেই ক্ষতই যেন হঠাৎ নতুন করে রক্তাক্ত হয়ে উঠল, যখন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন, যা শুধু ভারতের রাজনীতিকেই নাড়িয়ে দেয়নি; বরং বাংলাদেশের মানুষকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তিনি এমন এক ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা শুনে মনে হয়েছে—ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড হয়তো কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না; এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে আরও ভয়ংকর কোনো রাজনৈতিক অন্ধকার। আর সেই ইঙ্গিতের তীর এখন সরাসরি গিয়ে বিদ্ধ করেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে।

কলকাতার ধর্মতলার জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছিল না । বরং সেটি ছিল ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দেওয়া এক অগ্নিবাণ। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের আলোচিত ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে ফোন করে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন। এখানেই থেমে থাকেননি মমতা। তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—“কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল?”

এই প্রশ্ন নিছক রাজনৈতিক বাক্য নয়; এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে এক ভয়ংকর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

একজন আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতা যখন প্রকাশ্যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে এমন ইঙ্গিত করেন, তখন সেটি আর দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মমতা এমন একটি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলেছেন, যা বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছেন—ঘটনার পেছনে এমন কিছু শক্তির সংশ্লিষ্টতা ছিল, যা প্রকাশ্যে এলে শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ভূমিকম্প তৈরি হতে পারে। আর এখানেই মোদি সরকারের অস্বস্তি সবচেয়ে বেশি।

বিগত এক দশকে ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার “দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—এসব ইস্যুতে মোদি সরকার বারবার নিজেদের নৈতিক উচ্চতায় দাঁড় করাতে চেয়েছে। কিন্তু মমতার বক্তব্য যদি সামান্য অংশেও সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—ভারত কি সত্যিই আঞ্চলিক নিরাপত্তার রক্ষক, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে গোপন খেলা পরিচালনা করা এক শক্তিধর রাষ্ট্র? এই প্রশ্নই আজ দিল্লির জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর।

কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো ইউটিউবভিত্তিক ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচারক নন। তিনি ভারতের দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী, ক্ষমতার অন্দরমহলের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন রাজনীতিক। প্রশাসন, গোয়েন্দা কাঠামো ও নিরাপত্তা বাস্তবতা সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তার বক্তব্যকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

আর মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয় হলো—এখন পর্যন্ত দিল্লি এই অভিযোগের শক্ত, স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো জবাব দিতে পারেনি। কারণ অভিযোগটি এতটাই বিস্ফোরক যে সরাসরি অস্বীকার করলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, আর নীরব থাকলেও সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। রাজনৈতিকভাবে এটিই মমতার সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য। তিনি এমন একটি ইস্যু ছুড়ে দিয়েছেন, যার প্রতিক্রিয়ায় মোদি সরকার যেদিকেই যায়, অস্বস্তি এড়ানো কঠিন।

ভারতের বর্তমান রাজনীতিতে বিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র ভাবমূর্তি। কাশ্মীর, পাকিস্তান, সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, গোয়েন্দা অভিযান—সব ক্ষেত্রেই বিজেপি নিজেদের কঠোর রাষ্ট্রশক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু মমতার বক্তব্য সেই ইমেজের বুকেই ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। কারণ এখানে অভিযোগ উঠছে—একটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তথ্য জনগণের কাছ থেকে গোপন করা হয়েছে। আর যদি সত্যিই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ঘটনাটি চেপে রাখতে চেয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—কেন? রাষ্ট্রের স্বার্থে? নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আজ সবচেয়ে ভয়ংকর। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বরাবরই সীমান্ত, গোয়েন্দা সংস্থা ও অদৃশ্য যোগাযোগের জটিল খেলায় আবদ্ধ। কিন্তু সাধারণ মানুষ সবসময় বিশ্বাস করতে চেয়েছে, অন্তত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো প্রকাশ্যে আইনের শাসনের কথা বলবে। অথচ মমতার বক্তব্য যেন সেই মুখোশ সরিয়ে দিয়ে বলছে—ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেক সত্য ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা রাখা হয়।

বাংলাদেশের জন্যও এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ আছে, দিল্লি কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছে। যদিও ভারত সরকার সবসময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও জনমনে সন্দেহ পুরোপুরি কখনো দূর হয়নি।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন সেই সন্দেহের আগুনেই নতুন করে পেট্রল ঢেলে দিয়েছেন।

বিশেষ করে যখন তিনি বলেন, “আমি নাম বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে”—তখন বোঝা যায়, তিনি শুধু একটি তথ্য প্রকাশ করেননি; বরং ইচ্ছাকৃতভাবে এক অসম্পূর্ণ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। আর রাজনীতিতে অসম্পূর্ণ রহস্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র। কারণ মানুষ তখন নিজেরাই গল্পের বাকি অংশ কল্পনা করতে শুরু করে।

এই ঘটনার মাধ্যমে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল দিল্লির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সেটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। মমতা মূলত বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক মঞ্চে টেনে এনেছেন। অর্থাৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংবেদনশীল ঘটনাও এখন ভারতের দলীয় রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।

তবু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—যে বিষয়টি এতদিন রাজনৈতিক অন্ধকারে চাপা ছিল, সেটি অন্তত প্রকাশ্য আলোচনায় নিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্য আংশিক হোক বা পূর্ণাঙ্গ, প্রশ্ন তোলার সাহস গণতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আমি মমতা ব্যানার্জিকে সাধুবাদ জানাতে চাই।

এবং আমি এও বিশ্বাস করি যে, অদূর ভবিষ্যতে হাদি হত্যার মূল রহস্য খোলাসা হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খসে পড়বে। এখানে আরেকটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি শক্তিশালী অংশ এবং ভারত সরকার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি ভন্ডুল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারেক রহমানের দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে সব ষড়যন্ত্রই শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়।

মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই। কারণ বিজেপি এতদিন বিরোধীদের “রাষ্ট্রবিরোধী”, “অবিশ্বস্ত” কিংবা “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি” হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এবার সেই বিরোধী শিবির থেকেই এমন অভিযোগ এসেছে, যা উল্টো কেন্দ্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আর জনগণ যখন রাষ্ট্রের ওপর সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র।

আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে গোপন তথ্য, অর্ধসত্য, সীমান্ত রাজনীতি ও গোয়েন্দা ইঙ্গিতই হয়ে উঠছে নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র। এই বাস্তবতায় ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মমতার বিস্ফোরক মন্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ক্ষমতার অন্দরমহলের অস্বস্তিকর বাস্তবতার জানালা খুলে দিয়েছে।

মোদি সরকার হয়তো সাময়িকভাবে এই বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যাবে। কেন একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে এত গোপনীয়তা? কেন একজন মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করে চুপ থাকতে বলা হয়েছিল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ক্ষমতার রাজনীতির আড়ালে আসলে কত সত্য চাপা পড়ে আছে, যা জনগণ কখনো জানতে পারে না?
সুতরাং মমতার বিষাক্ত তীর শুধু বিজেপিকে আঘাত করেনি; বরং সেটি ভারতের রাজনৈতিক নৈতিকতার বুককেও রক্তাক্ত করেছে। এখন দেখার বিষয়—এই ক্ষত সারিয়ে তুলতে মোদি সরকার স্বচ্ছতার পথ বেছে নেয়, নাকি নীরবতার দেয়াল আরো উঁচু করে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেট কি বৈধ?

অদিতি করিম
ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেট কি বৈধ?

কিচেন ক্যাবিনেট শব্দটির উৎপত্তি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৩০ সালের দিকে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসন তাঁর অফিশিয়াল মন্ত্রিসভার চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুদের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেহেতু তাঁরা হোয়াইট হাউসের পেছনের দরজা বা ‘রান্নাঘর’ দিয়ে যাতায়াত করতেন এবং ঘরোয়া পরিবেশে আলোচনা করতেন, তাই সমালোচকরা বিদ্রুপ করে একে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলা শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জ্যাকসনের এই কিচেন ক্যাবিনেট ধারণা পশ্চিমা গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তা পায়। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকুক আর না-ই থাকুক আধুনিক বিশ্বে সব দেশে, সব ধরনের সরকার পদ্ধতিতেই কিচেন ক্যাবিনেট আছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেমন নিজস্ব একটি কোর টিম আছে, যারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সিদ্ধান্তের মূল কারিগর। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে চালায় পাঁচজনের একটি বিশেষ দল। যে দলে তাঁর পরিবারের একজন সদস্যও রয়েছেন। নতুন শুল্কনীতি থেকে শুরু করে ইরানের সঙ্গে চুক্তি, সব বিষয়ে ট্রাম্পের মূল পরামর্শক হলো এই পাঁচ সদস্যের কোর কমিটি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারেরও রয়েছে বিশ্বস্ত একটি ছোট্ট গ্রুপ। যাদের সঙ্গে স্টারমার প্রতিনিয়ত পরামর্শ করেন।

গত মাসে যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবিকে কেন্দ্র করে চাপে পড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। নিজ দল লেবার পার্টির কয়েকজন সদস্যই তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও পদত্যাগের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা তাঁকে পদত্যাগ না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

উন্নত গণতন্ত্রে যেমন ক্ষমতা কেন্দ্রে যেমন একটি নিউক্লিয়াস থাকে, ঠিক তেমনই উত্তর কোরিয়ার মতো চরম একনায়কতন্ত্রেও রয়েছে গুটি কয়েক নীতিনির্ধারক। যাঁরা আসলে রাষ্ট্র চালান। চীনের মতো একদলীয় শাসনের দেশেও কিচেন ক্যাবিনেটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

কিচেন ক্যাবিনেট বলতে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের (যেমন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি) অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ঠ একদল অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টাকে বোঝায়। এটি সরকারের কোনো সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক অংশ নয়, বরং নেতার ব্যক্তিগত পছন্দের কিছু মানুষের একটি ছোট বৃত্ত, যাঁরা পর্দার আড়ালে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেন। মূলত তাঁদের সিদ্ধান্তেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এটি এমন একটি ছায়া মন্ত্রিসভা, যাঁরা ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করেন, কিন্তু জনগণের কাছে বা সংসদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকেন না। এমনকি জনগণ এ ব্যাপারে অবগতই থাকে না যে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসছে এই কিচেন ক্যাবিনেট থেকে।

প্রকৃত মন্ত্রিসভা যেখানে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়, কিচেন ক্যাবিনেট সেখানে একেবারেই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এখানে কোনো পদমর্যাদার বাধ্যবাধকতা নেই। এই বৃত্তে নেতার পারিবারিক সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহায়ক বা নেতার অত্যন্ত অনুগত কোনো বুদ্ধিজীবী থাকতে পারেন।

বাংলাদেশেও সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের একটি নিজস্ব পরামর্শকবলয় ছিল। তবে তা নিয়ে কখনো বিতর্ক হয়নি। সবাই জানতেন, কারা সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী। কিন্তু অতীতে এই প্রভাবশালীরা যে সিদ্ধান্তই নিতেন, তা পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় বা সংসদে আলোচিত হতো। তবে বাংলাদেশে কিচেন ক্যাবিনেট আলোচনায় আসে ইউনূস সরকারের আমলে। ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের দুই মাস পর, কিচেন ক্যাবিনেটের রহস্য উন্মোচন করতে থাকেন ওই সরকারের একাধিক উপদেষ্টা। এই বিতর্কের সূচনা করেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

গত ২৫ মে সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, একটি গোপন ও অনির্বাচিত সাত সদস্যের কিচেন ক্যাবিনেট বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করত।

মো. তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনানুষ্ঠানিক কিচেন ক্যাবিনেট প্রতি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বৈঠকে বসত এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় তাঁকেও কিচেন ক্যাবিনেটের একটি বৈঠকে অংশ নিতে হয়েছিল।

তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে পর একে একে কয়েকজন উপদেষ্টা মুখ খোলেন। সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া স্বীকার করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন ক্যাবিনেট ছিল। তবে তিনি তার সদস্য ছিলেন না।

একই রকম বক্তব্য দেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন।

এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘প্রতি মঙ্গলবার বসতেন কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্যরা। এখানে ওনারা ইনফরমাল আলোচনা করতেন। তবে কারা করবেন সেটা নির্ধারিত ছিল।’

একাধিক উপদেষ্টার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরে আরেকটি সরকার ছিল। যে সরকারই আসলে দেশ চালাত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তই হতো এই কিচেন ক্যাবিনেটে। অর্থাৎ অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর একটি অংশ ছিল নামমাত্র। তারা উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়ে জনগণের করের টাকায় নানা রকম সুযোগসুবিধা ভোগ করতেন, কিন্তু কোনো কাজ করতেন না। দামি গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন, অকারণে বিদেশ ভ্রমণ করতেন, উপদেষ্টা পরিচয় ব্যবহার করে দেনদরবার এবং বিভিন্ন তদবির করতেন। এটা একধরনের অপরাধ। উপদেষ্টা হিসেবে যদি তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তাহলে তাঁরা পদত্যাগ করেননি কেন? কোন লোভে অপমানিত হয়ে দায়িত্ব আঁকড়ে ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন এবং তৌহিদ হোসেন দাবি করেছেন, তাঁরা পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য দায় এড়ানোর কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। দেড় বছর ঘি মাখন পেট ভরে খাওয়ার পর এখন বলছেন, খেতে চাননি? এসব উপদেষ্টার উচিত যেহেতু তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, তাই দেড় বছর সরকারি তহবিল থেকে যে বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা নিয়েছেন তা ফেরত দেওয়া। কারণ তাঁদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে উপদেষ্টা পরিষদের কোনো কাজ ছিল না, তাঁরা ছিলেন অলংকার। দেশ চালাত সাত সদস্যের কিচেন ক্যাবিনেট।

এবার দেখা যাক, কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন? নিঃসন্দেহে ড. ইউনূস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরাই ছিলেন এই নীতিনির্ধারক গণ্ডিতে। আমরা উপদেষ্টাদের সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি, এই কিচেন ক্যাবিনেট সাত সদস্যের ছিল। কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন, তা অনুমান করতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, রিজওয়ানা হাসান যে এই কোর কমিটিতে ছিলেন তা যে কেউ চোখ বন্ধ করে বলতে পারে। যদিও আসিফ নজরুল দাবি করেছেন, তিনি নাকি এ ধরনের কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলেন না। আসিফ নজরুলের কথা এখন মানুষ মোটেও বিশ্বাস করে না। ২৬ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের না খেলা নিয়ে তাঁর অবিরাম মিথ্যাচার তাঁকে একালের মিথ্যাবাদী রাখাল বালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিচেন ক্যাবিনেটে আর কে কে থাকতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা আর তর্কবিতর্ক হতেই পারে। যাঁরা গত দেড় বছর ইউনূসের সব অপকর্মের প্রশংসা করেছেন, যাঁরা তাঁর সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী ছিলেন তাঁরাই যে এই কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। এই সফেদ সুশীলরা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর ছিলেন আমাদের ভাগ্যবিধাতা। তাঁরা যা খুশি তাই করেছেন। জনগণের মতামত তো দূরের কথা, সাংবিধানিকভাবে গঠিত একটি সরকারকে অন্ধকারে রেখে ইউনূস তাঁর কাছের মানুষদের নিয়ে এভাবে দেশ পরিচালনা করার সাংবিধানিক অধিকার রাখেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে শুরু করে বন্দর ইজারা, এসব সিদ্ধান্তই হয়েছে কিচেন ক্যাবিনেটে। তাই উপদেষ্টা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে এভাবে কয়েকজন সদস্য দেশের মালিক বনে যেতে পারেন না। এভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।

অন্য দেশে কিচেন ক্যাবিনেট পরামর্শ দেয়, প্রস্তাব করে, সেটা মন্ত্রিসভায় কিংবা সাংবিধানিকভাবে বৈধ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্ল্যাটফর্মে চূড়ান্ত হয়। কিন্তু ইউনূস কিচেন ক্যাবিনেটের মাধ্যমে দেশ চালিয়েছেন। এটা অনৈতিক, বেআইনি। তাই অনতিবিলম্বে ইউনূস সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছে তার মূল্যায়ন করা উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে বড় ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে।