• ই-পেপার

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড : মমতার তীর মোদি সরকারে

বিচার যখন ভাইরালের ওপর নির্ভরশীল

শতরূপা দে
বিচার যখন ভাইরালের ওপর নির্ভরশীল

রাজধানীর মিরপুরে সাত বছর বয়সী রামিশাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঈদের ছুটির মধ্যেও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যার ঘটনায় দ্রুত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। আবার কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর নেত্রকোনার আব্দুল মজিদ সরকারি ভাতার নথিতে ‘মৃত’ তালিকা থেকে জীবিত হয়ে নিজের অধিকার ফিরে পেয়েছেন।

এসব খবর পড়লে প্রথমে মনে হয় দেশে আইন আছে, প্রশাসন কাজ করছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র তৎপর। মনে হয়, সমস্যা যত বড়ই হোক, শেষ পর্যন্ত আইন তার কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা আরো নির্মম এবং অস্বস্তিকর। কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেক নাগরিকের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি করছে যে, বিচার ও প্রশাসনিক প্রতিকার অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে কোনো ঘটনা কতটা আলোচনায় এসেছে, কতটা মানুষের নজর কেড়েছে, কিংবা কতটা ভাইরাল হয়েছে তার ওপর।

সামগ্রিক ঘটনাগুলোর দিকে খেয়াল করে আমরা দেখতে পাই, রামিশার প্রতি সংঘটিত নির্মমতার বিচার চেয়ে দেশজুড়ে মানুষ সোচ্চার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমনকি ঈদের ছুটির মধ্যেও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা গেছে। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরো শিশু ও নারী ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের কান্না জাতীয় আলোচনায় জায়গা পায়নি, তাদের ছবি মানুষের টাইমলাইনে ঘোরেনি, তাদের নামও অধিকাংশ মানুষ জানে না। ফলে তাদের মামলার অগ্রগতি কী, বিচার কোন পর্যায়ে আছে, কিংবা তারা আদৌ ন্যায়বিচার পাবেন কি না—সেসব প্রশ্নও জনআলোচনার বাইরে থেকে গেছে।

বুলেট বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডও একই বাস্তবতার আরেকটি প্রতিচ্ছবি। একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিনতাইকারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হলেন, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হলো, দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারও করা হলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিদিন যেসব সাধারণ মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন বা সড়কে প্রাণ হারাচ্ছেন, তাদের সবার ক্ষেত্রেই কি একই দ্রুততা দেখা যায়? প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছিনতাই, সন্ত্রাসী হামলা কিংবা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। কেউ ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। কিন্তু তাদের সবার গল্প কি রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায়?

এই দেশে এমন হাজারো মানুষ আছেন, যারা প্রশাসনিক গাফিলতি, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতাবানদের অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অথচ তাদের গল্প কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। তারা ভাইরাল হন না। ফলে তাদের জন্য রাষ্ট্রও ততটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে আব্দুল মজিদ ভাগ্যবান। কারণ তার কষ্টের গল্পটি সংবাদ হয়েছিল। রাষ্ট্র তাকে দেখেছিল। প্রশাসন নড়ে-চড়ে বসেছিল। এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার কিংবা নাগরিক সেবা কখনো দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভর করতে পারে না।

এই বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশের সামগ্রিক অপরাধচিত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১ হাজার ৯৩০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১১ জন মানুষ খুন হয়েছেন। ছিনতাই ও দস্যুতার মামলার সংখ্যাও দুই হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কেবল ছিনতাইকারীদের হামলায়ই কয়েক মাসে অন্তত ১৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে সন্ত্রাসী হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মাদক-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ড এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের নামে অসংখ্য রক্তপাত। কিন্তু এসব ঘটনার খুব অল্প অংশই জাতীয় আলোচনায় আসে। অধিকাংশ মানুষ নীরবে হারিয়ে যায় পরিসংখ্যানের ভিড়ে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল, মানুষ ধীরে ধীরে আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে বিচার পেতে হলে আগে আলোচনায় আসতে হবে, সংবাদ হতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে হবে। এই মানসিকতা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যখন মানুষ বিশ্বাস হারায় রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করবে, তখন কেউ নীরবে অন্যায় মেনে নেয়, আবার কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্যত হয়।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মব জাস্টিস বা গণপিটুনির ভয়াবহ বৃদ্ধি সেই আস্থাহীনতারই একটি প্রকাশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল ৫১ জন। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ জনে। ২০২৫ সালে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২০০-এর কাছাকাছি পৌঁছায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই ২৭৬টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত এবং ২৪২ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; এগুলো রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের কমে যাওয়া আস্থার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

কারণ মানুষ যখন মনে করে আইনের মাধ্যমে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠতে চায়। কেউ চোর সন্দেহে ধরা পড়লেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার বদলে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। গুজব ছড়ালেই জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে সহিংস করে তুলছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উপস্থিত থেকেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার চার বছরের শিশু ধর্ষণকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ নাগরিকের বিচারের প্রতি আস্থাহীনতারই একটি বহিঃপ্রকাশ।

এই বাস্তবতার পেছনে আমাদের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখনো অনেকাংশে প্রতিক্রিয়াশীল। অর্থাৎ অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করার চেয়ে, ঘটনা ঘটার পর জনমত বা আলোচনার চাপ তৈরি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। ভুল সিদ্ধান্ত, গাফিলতি কিংবা দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়। তৃতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষকে হতাশ করে তোলে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, ফলে মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশে বিচার অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া থেকেও পুরোপুরি মুক্ত নয়। প্রভাবশালীরা তুলনামূলক দ্রুত সুরক্ষা পান, অথচ সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। ফলে আইনের সমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। আইন তখন সবার জন্য সমান নয়—এমন ধারণা সমাজে শক্তিশালী হতে থাকে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশও অপরাধ ও সহিংসতার সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তবে তারা কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। যুক্তরাজ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন সংস্থা কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি স্বচ্ছতা বাড়াতে বডি ক্যামেরা চালু করা হয়েছে। এস্তোনিয়ার মতো দেশ ডিজিটাল গভর্নেন্সের মাধ্যমে প্রশাসনিক সেবাগুলোকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে ভুল তথ্য দিয়ে একজন জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে ফেলার সুযোগ খুব কম। এসব উদাহরণ দেখায়—চাইলেই পরিবর্তন সম্ভব।

বাংলাদেশেও সেই পরিবর্তন জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে। কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে, যাতে মানুষ বছরের পর বছর আদালতের পেছনে না ঘোরে। প্রশাসনিক ভুলের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি আড়ালে না থাকে। একই সঙ্গে গুজব ও উসকানি প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও কার্যকর ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে নাগরিককে ‘ভাইরাল কনটেন্ট’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। একজন সাধারণ মানুষের জীবন কোনো ট্রেন্ডিং পোস্টের সঙ্গে তুলনাযোগ্য হতে পারে না। বিচার কোনো সৌভাগ্যের বিষয় হতে পারে না; এটি একটি মৌলিক অধিকার।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কেবল অপরাধ নয়; বরং মানুষের মনে জন্ম নেওয়া সেই ভয়ংকর বিশ্বাস—‘ভাইরাল না হলে বিচার নেই।’ এই বিশ্বাস যদি আরো গভীর হয়, তাহলে সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। তখন আইন থাকবে, আদালত থাকবে, প্রতিষ্ঠান থাকবে; কিন্তু মানুষের আস্থা থাকবে না। আর যে রাষ্ট্রে মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে, সেখানে শেষ পর্যন্ত আইনের শাসন নয়, জনতার রায়ই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

লেখক : পিআর প্রফেশনাল

ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেট কি বৈধ?

অদিতি করিম
ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেট কি বৈধ?

কিচেন ক্যাবিনেট শব্দটির উৎপত্তি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৩০ সালের দিকে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসন তাঁর অফিশিয়াল মন্ত্রিসভার চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুদের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেহেতু তাঁরা হোয়াইট হাউসের পেছনের দরজা বা ‘রান্নাঘর’ দিয়ে যাতায়াত করতেন এবং ঘরোয়া পরিবেশে আলোচনা করতেন, তাই সমালোচকরা বিদ্রুপ করে একে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলা শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জ্যাকসনের এই কিচেন ক্যাবিনেট ধারণা পশ্চিমা গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তা পায়। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকুক আর না-ই থাকুক আধুনিক বিশ্বে সব দেশে, সব ধরনের সরকার পদ্ধতিতেই কিচেন ক্যাবিনেট আছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেমন নিজস্ব একটি কোর টিম আছে, যারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সিদ্ধান্তের মূল কারিগর। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে চালায় পাঁচজনের একটি বিশেষ দল। যে দলে তাঁর পরিবারের একজন সদস্যও রয়েছেন। নতুন শুল্কনীতি থেকে শুরু করে ইরানের সঙ্গে চুক্তি, সব বিষয়ে ট্রাম্পের মূল পরামর্শক হলো এই পাঁচ সদস্যের কোর কমিটি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারেরও রয়েছে বিশ্বস্ত একটি ছোট্ট গ্রুপ। যাদের সঙ্গে স্টারমার প্রতিনিয়ত পরামর্শ করেন।

গত মাসে যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবিকে কেন্দ্র করে চাপে পড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। নিজ দল লেবার পার্টির কয়েকজন সদস্যই তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও পদত্যাগের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা তাঁকে পদত্যাগ না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

উন্নত গণতন্ত্রে যেমন ক্ষমতা কেন্দ্রে যেমন একটি নিউক্লিয়াস থাকে, ঠিক তেমনই উত্তর কোরিয়ার মতো চরম একনায়কতন্ত্রেও রয়েছে গুটি কয়েক নীতিনির্ধারক। যাঁরা আসলে রাষ্ট্র চালান। চীনের মতো একদলীয় শাসনের দেশেও কিচেন ক্যাবিনেটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

কিচেন ক্যাবিনেট বলতে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের (যেমন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি) অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ঠ একদল অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টাকে বোঝায়। এটি সরকারের কোনো সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক অংশ নয়, বরং নেতার ব্যক্তিগত পছন্দের কিছু মানুষের একটি ছোট বৃত্ত, যাঁরা পর্দার আড়ালে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেন। মূলত তাঁদের সিদ্ধান্তেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এটি এমন একটি ছায়া মন্ত্রিসভা, যাঁরা ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করেন, কিন্তু জনগণের কাছে বা সংসদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকেন না। এমনকি জনগণ এ ব্যাপারে অবগতই থাকে না যে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসছে এই কিচেন ক্যাবিনেট থেকে।

প্রকৃত মন্ত্রিসভা যেখানে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়, কিচেন ক্যাবিনেট সেখানে একেবারেই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এখানে কোনো পদমর্যাদার বাধ্যবাধকতা নেই। এই বৃত্তে নেতার পারিবারিক সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহায়ক বা নেতার অত্যন্ত অনুগত কোনো বুদ্ধিজীবী থাকতে পারেন।

বাংলাদেশেও সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের একটি নিজস্ব পরামর্শকবলয় ছিল। তবে তা নিয়ে কখনো বিতর্ক হয়নি। সবাই জানতেন, কারা সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী। কিন্তু অতীতে এই প্রভাবশালীরা যে সিদ্ধান্তই নিতেন, তা পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় বা সংসদে আলোচিত হতো। তবে বাংলাদেশে কিচেন ক্যাবিনেট আলোচনায় আসে ইউনূস সরকারের আমলে। ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের দুই মাস পর, কিচেন ক্যাবিনেটের রহস্য উন্মোচন করতে থাকেন ওই সরকারের একাধিক উপদেষ্টা। এই বিতর্কের সূচনা করেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

গত ২৫ মে সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, একটি গোপন ও অনির্বাচিত সাত সদস্যের কিচেন ক্যাবিনেট বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করত।

মো. তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনানুষ্ঠানিক কিচেন ক্যাবিনেট প্রতি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বৈঠকে বসত এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় তাঁকেও কিচেন ক্যাবিনেটের একটি বৈঠকে অংশ নিতে হয়েছিল।

তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে পর একে একে কয়েকজন উপদেষ্টা মুখ খোলেন। সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া স্বীকার করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন ক্যাবিনেট ছিল। তবে তিনি তার সদস্য ছিলেন না।

একই রকম বক্তব্য দেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন।

এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘প্রতি মঙ্গলবার বসতেন কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্যরা। এখানে ওনারা ইনফরমাল আলোচনা করতেন। তবে কারা করবেন সেটা নির্ধারিত ছিল।’

একাধিক উপদেষ্টার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরে আরেকটি সরকার ছিল। যে সরকারই আসলে দেশ চালাত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তই হতো এই কিচেন ক্যাবিনেটে। অর্থাৎ অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর একটি অংশ ছিল নামমাত্র। তারা উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়ে জনগণের করের টাকায় নানা রকম সুযোগসুবিধা ভোগ করতেন, কিন্তু কোনো কাজ করতেন না। দামি গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন, অকারণে বিদেশ ভ্রমণ করতেন, উপদেষ্টা পরিচয় ব্যবহার করে দেনদরবার এবং বিভিন্ন তদবির করতেন। এটা একধরনের অপরাধ। উপদেষ্টা হিসেবে যদি তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তাহলে তাঁরা পদত্যাগ করেননি কেন? কোন লোভে অপমানিত হয়ে দায়িত্ব আঁকড়ে ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন এবং তৌহিদ হোসেন দাবি করেছেন, তাঁরা পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য দায় এড়ানোর কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। দেড় বছর ঘি মাখন পেট ভরে খাওয়ার পর এখন বলছেন, খেতে চাননি? এসব উপদেষ্টার উচিত যেহেতু তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, তাই দেড় বছর সরকারি তহবিল থেকে যে বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা নিয়েছেন তা ফেরত দেওয়া। কারণ তাঁদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে উপদেষ্টা পরিষদের কোনো কাজ ছিল না, তাঁরা ছিলেন অলংকার। দেশ চালাত সাত সদস্যের কিচেন ক্যাবিনেট।

এবার দেখা যাক, কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন? নিঃসন্দেহে ড. ইউনূস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরাই ছিলেন এই নীতিনির্ধারক গণ্ডিতে। আমরা উপদেষ্টাদের সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি, এই কিচেন ক্যাবিনেট সাত সদস্যের ছিল। কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন, তা অনুমান করতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, রিজওয়ানা হাসান যে এই কোর কমিটিতে ছিলেন তা যে কেউ চোখ বন্ধ করে বলতে পারে। যদিও আসিফ নজরুল দাবি করেছেন, তিনি নাকি এ ধরনের কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলেন না। আসিফ নজরুলের কথা এখন মানুষ মোটেও বিশ্বাস করে না। ২৬ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের না খেলা নিয়ে তাঁর অবিরাম মিথ্যাচার তাঁকে একালের মিথ্যাবাদী রাখাল বালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিচেন ক্যাবিনেটে আর কে কে থাকতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা আর তর্কবিতর্ক হতেই পারে। যাঁরা গত দেড় বছর ইউনূসের সব অপকর্মের প্রশংসা করেছেন, যাঁরা তাঁর সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী ছিলেন তাঁরাই যে এই কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। এই সফেদ সুশীলরা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর ছিলেন আমাদের ভাগ্যবিধাতা। তাঁরা যা খুশি তাই করেছেন। জনগণের মতামত তো দূরের কথা, সাংবিধানিকভাবে গঠিত একটি সরকারকে অন্ধকারে রেখে ইউনূস তাঁর কাছের মানুষদের নিয়ে এভাবে দেশ পরিচালনা করার সাংবিধানিক অধিকার রাখেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে শুরু করে বন্দর ইজারা, এসব সিদ্ধান্তই হয়েছে কিচেন ক্যাবিনেটে। তাই উপদেষ্টা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে এভাবে কয়েকজন সদস্য দেশের মালিক বনে যেতে পারেন না। এভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।

অন্য দেশে কিচেন ক্যাবিনেট পরামর্শ দেয়, প্রস্তাব করে, সেটা মন্ত্রিসভায় কিংবা সাংবিধানিকভাবে বৈধ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্ল্যাটফর্মে চূড়ান্ত হয়। কিন্তু ইউনূস কিচেন ক্যাবিনেটের মাধ্যমে দেশ চালিয়েছেন। এটা অনৈতিক, বেআইনি। তাই অনতিবিলম্বে ইউনূস সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছে তার মূল্যায়ন করা উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে বড় ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে।

মমতা জানেন হাদির খুনির নাম, জানতে হবে আমাদেরও

মন্‌জুরুল ইসলাম
মমতা জানেন হাদির খুনির নাম, জানতে হবে আমাদেরও

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে অথবা সত্য কখনো চাপা থাকে না, এসব প্রবাদ সব দেশকালের মানুষের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। বলা যায়, এসব প্রবচন চিরন্তন, অভ্রান্ত সত্য। পশ্চিমবঙ্গের সদ্য-সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির একটি বক্তব্য এই অমোঘ সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে এখন এ বক্তব্য নিয়ে চলছে তুমুল বিশ্লেষণ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে উদ্দেশ করে মমতা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে হাদিকে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, সবটাই জানি।’ তাঁর এ বক্তব্যের পর আর কিছু বলার নেই। কিছু বলতে বাকিও নেই। এখন শুধু পরবর্তী কাজটা করতে হবে। অন্যদিকে মমতার স্থলাভিষিক্ত গেরুয়া নেতা শুভেন্দু অধিকারী ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট ফর্মুলা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনীতি শুরু করেছেন। আমাদের সরকারেরও উচিত গেরুয়া সরকারের সঙ্গে যথোপযুক্ত দৃঢ়তার রাজনীতি করা। প্রথম রাতেই বিড়াল মারতে না পারলে আখেরে পস্তাতে হবে।

২ জুন মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম  জনসভায়  পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা ব্যানার্জি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের (শরিফ ওসমান হাদি) হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর পুলিশের বিশেষ বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘দেশের স্বার্থে’ এ বিষয়ে মমতার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মুখ খুলতে নিষেধ করেন। জনসভায় মমতা বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? সবটাই জানি। এনআইএর (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি) ভয় দেখাচ্ছেন, ইডির (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) ভয় দেখাচ্ছেন, সিবিআইয়ের (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) ভয় দেখাচ্ছেন? এই সিআইডি (ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট, যা রাজ্য সরকারের অধীন) আমার আমলেও ছিল। এই সিআইডি তো তখন এভাবে ইফেক্টিভলি (সক্রিয়ভাবে) অন্যায় কাজ করত না, এসটিএফও (স্পেশাল টাস্কফোর্স, রাজ্য সরকারের অধীন) করত না। বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল জেনে রাখুন, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল। মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। তারপর হোম মিনিস্টার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নিজে আমাকে ফোন করে বলেছেন। এত দিন তো কই আমি বলিনি, মুখ খুলিনি- আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি। এ সময় মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য-সমর্থকরা চিৎকার করতে শুরু করেন। তাঁরা বলেন, ‘নামটা বলে দিন।’ তখন মমতা বলেন, ‘না, বলব না দেশের স্বার্থে। (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কী বললেন? আপ থোড়া আপকে বেঙ্গল পুলিশকো বোল দো, ইয়ে বাত বাহার নেহি কেহনে কে লিয়ে। ইয়ে দেশ কে লিয়ে হ্যায় (আপনি একটু আপনার পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে বলে দিন, যাতে এই কথা তারা বাইরে না বলে। এটা দেশের জন্য করা হয়েছে)। কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট পরিবর্তন হলেও মনে রাখবেন, আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথাভান্ডার, তথ্যভান্ডার, সত্যভান্ডার। আমি তো সম্পদের ভয়ে কর্মীদের জলে ভাসিয়ে দিয়ে দল ছেড়ে চলে যাব না।’ মমতা ব্যানার্জির এ বক্তব্যের পর আমাদের সরকারকে এখন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলি করার পর পুলিশি তদন্তে নাম আসে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিমের। যে মোটরসাইকেলে চড়ে হাদিকে গুলি করা হয়েছিল, তাতে ফয়সাল ও আলমগীর ছিল বলে ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

৮ মার্চ ফয়সাল ও আলমগীরকে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বনগাঁ এলাকা থেকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স বা এসটিএফ। অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিনের জন্য রিমান্ডে নিয়েছিল। রিমান্ড শেষে তাদের আদালতে আনা হলে ২২ মার্চ আদালত দুজনকে ১২ দিনের জন্য কারা হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। যদিও হাদি হত্যা মামলায় এই দুই আসামিকে পালিয়ে আসতে সাহায্য করার অপরাধে গ্রেপ্তার ফিলিপ সাংমাকে আদালতের নির্দেশে রাখা হয়েছে বিচার বিভাগীয় কারাগারে। হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ওই দিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আদালতে তোলা হয়। পরে তাদের ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) হাতে তুলে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিধাননগরের আদালত। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিধাননগর মহকুমা বিচার বিভাগীয় আদালতে এনআইএ ফয়সাল ও আলমগীরকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। আদালতে বলা হয়, দিল্লি এনআইএর বিশেষ আদালতে তাদের তোলা হবে। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে এনআইএর গোয়েন্দারা তদন্তের স্বার্থে এ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। পরে শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার দুই আসামিকে ২২ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা দিল্লিতে নিয়ে যায়।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে উপড়ে ফেলে মোদির গেরুয়ারা এখন দখলে নিয়েছে। বিজেপির গেরুয়া নেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে এক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দুই স্থানেই ছিল সেই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। সে সময় অনেকেই তাঁর ওই বক্তব্যকে ভোটের রাজনীতির স্টান্টবাজি মনে করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর ৯ মে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই সীমান্তে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছেন। নব্য মুখ্যমন্ত্রীর নতুন ফর্মুলা হলো ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট। এটি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পুশইন করার জন্য সীমান্ত এলাকায় বিপুলসংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী মানুষ জড়ো করা হয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতে চায়। কিন্তু লাগোয়া রাজ্যের গেরুয়া নয়া নেতৃত্ব যদি উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ককেই স্বাগত জানায়, অথবা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নেয়- তাহলে আমাদেরও নতুন করে ভাবতে হবে। প্রতিবেশীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে। আর সে কথা হবে দিল্লির সঙ্গে। তাদের মনে করিয়ে দিতে হবে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সেক্টর কমান্ডার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। পিতা-মাতার মতো তাঁরও এক নম্বর এজেন্ডা হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সে কারণে তারেক রহমানের ফর্মুলা হওয়া উচিত, ‘ডাইরেক্ট ডিপোর্ট’। সীমান্ত এলাকার জনগণ ও সীমান্তরক্ষীদের হওয়া উচিত শতভাগ নির্ভীক ও দেশপ্রেমিক। আমাদের দেশ ছোট হতে পারে; কিন্তু আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ছোট একটি ভূখণ্ডে লোকসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। দারিদ্র্যসীমা, বেকারত্ব, শিক্ষার হার, নারীর ক্ষমতায়ন, স্যানিটেশনসহ অনেক ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে আমাদের অবস্থান অনেক ওপরে। আমাদের বিশাল বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার না থাকলে অথবা প্রবেশে বিঘ্ন ঘটলে ভারতের অর্থনীতিতে কেমন বিরূপ প্রভাব পড়ে, তা এত দিনে হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। আমাদের বেশরম স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে তারা যেভাবে চিকিৎসা বাণিজ্য করে, সেটাও গত ২৫ মাসে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুতরাং আমাদেরও নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু প্রথমবারের মতো এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। কিন্তু সেখানে কী ধরনের নিয়ম কার্যকর হতে পারে? কোন আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে? অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিতদের শনাক্তকরণ, আটক, হোল্ডিং সেন্টারে রাখা এবং পরবর্তী প্রত্যাবাসনসহ সবকিছু কীভাবে সম্পন্ন করা হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। ‘ডিটেক্ট’ বা শনাক্তকরণ হলো কথিত অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা। বিশেষত মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল এ বিষয়টি। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার কী পদ্ধতিতে এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে এবং এর প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো কী হবে? একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ‘কথিত বাংলাদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দগুলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে দাবি করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তিকে আইনগতভাবে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ঘোষণা করার জন্য নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণের অবশ্যই প্রয়োজন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা ভাষাভাষী রাজ্য। এখানে  সিংহভাগ মানুষ বাংলাভাষী। ফলে এখানে অভিযানটা কিসের ভিত্তিতে চলবে- এ প্রশ্নটা সংগত কারণেই সেখানকার সাধারণ নাগরিকের মধ্যে উঠছে। নির্বাচনের আগে সেখানকার অনেকেই মনে করেছিলেন, এসআইআর অর্থাৎ নির্বাচনের আগে যে নিবিড় সংশোধন হয়েছে ভোটার তালিকা এবং যাতে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, এসআইআরে যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা হয়তো এর নিশানা হতে পারে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচিত হওয়ার পর এসআইআর অনুযায়ী শনাক্তকরণের কাজটি করছেন না। তিনি এখন ভারতে বিতর্কিত নাগরিত্ব আইন অনুযায়ী বাংলাভাষী ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলমানদের ‘ভারতছাড়া’ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে আমাদের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মুসলমানদের জড়ো করা শুরু করেছেন। ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার জয়ন্তীপুর সীমান্ত এলাকা থেকে কাঁটাতারের গেট খুলে ১৩ নারী-শিশুকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করে। এদের গত রবিবার থেকে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়েছিল। বিজিবির যশোরের অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল আলম খান জানিয়েছেন, ওই ১৩ জন নারী-শিশুকে কিছুতেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য অনুযায়ী আমরা ভালোই আভাস পেলাম যে কে বা কারা শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে। কে কার স্বার্থে এটা করিয়েছে। এখন আমাদের সরকারের দায়িত্ব হলো সেটি খুঁজে বের করা। মমতার বক্তব্যকে ভিত্তি করেই দিল্লিকে চাপ দেওয়া। সেই সঙ্গে আরও অনুসন্ধান করতে হবে নির্বাচনের ঠিক দুই মাস আগে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একজন প্রার্থীকে হত্যা করার নেপথ্য কারণ। অন্যদিকে গেরুয়া শুভেন্দু সরকারের ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট পলিসিও শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে। ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী।  তাই বলে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, পুশইনের মতো অন্যায়, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টে প্রতিবেশীর অশুভ উসকানি আমরা সহ্য করব- এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রতিবেশী যেহেতু পরিবর্তন করা যাবে না, সে কারণে যত শক্তিশালী ও বৃহৎ প্রতিবেশীই হোক না কেন, আমাদের ন্যায্য হিস্সা শতভাগ আদায় করতে হবে। নতজানু নয়, মাথা উঁচু করে, চোখে চোখ রেখে দৃঢ়তার যুক্তিতে কথা বলতে হবে। কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নয়। এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]

ইসলামী ব্যাংক ইস্যু : বিশৃঙ্খলায় জড়িত কারা?

সিরাজুল ইসলাম
ইসলামী ব্যাংক ইস্যু : বিশৃঙ্খলায় জড়িত কারা?
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে খেলাপি ঋণ, অন্যদিকে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য একটি বড় দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি ব্যাংকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; বরং এর পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় না। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধানের আলোকে ব্যাংকিং খাত তদারকির সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতা রাখে। কোনো ব্যাংকে পরিচালনাগত সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা বা আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করতে পারে। সেই আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নিয়োগের পরপরই ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সমিতি বা অনুরূপ কিছু ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়েছে। তাদের বক্তব্য, এই নিয়োগের মাধ্যমে নাকি ব্যাংকটিকে আবারও এস আলম গোষ্ঠীর প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন হলো, এই অভিযোগের ভিত্তি কোথায়? কোনো প্রমাণ কি উপস্থাপন করা হয়েছে? নাকি এটি কেবল জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য একটি রাজনৈতিক প্রচারণা?

বাস্তবতা হচ্ছে, অভিযোগ তোলা সহজ; কিন্তু তার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ হাজির করা কঠিন। এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, যা থেকে বলা যায় যে খুরশিদ আলমের নিয়োগের মাধ্যমে কোনো বিশেষ ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে শুরু থেকেই সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে, বিষয়টি প্রশাসনিকের চেয়ে রাজনৈতিক বেশি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক পক্ষের আগ্রহ রয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক শক্তি, গ্রাহকভিত্তি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে এটি অনেকের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের আগ্রহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই আগ্রহ যদি ব্যাংকিং শৃঙ্খলার চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে সেটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বর্তমান আন্দোলনের মধ্যে সেই রাজনৈতিক মাত্রাই বেশি দৃশ্যমান। তারা মনে করেন, একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যেভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাতে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ এটিকে ‘মববাজি’ বলেও অভিহিত করছেন। কারণ কোনো বিষয় নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জন্য আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং সরকারবিরোধী আবহ তৈরির চেষ্টা কখনোই গঠনমূলক সমাধান হতে পারে না। 

এখানে বিএনপির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং গেছে। তবে বিএনপির শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ধস বা রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিপর্যয়ের নজির নেই। বিএনপি সব সময় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার নীতি গ্রহণ করেছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। এই দাবির সঙ্গে সবাই একমত হবেন কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন; তবে রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবে এটি একটি বহুল আলোচিত বিষয়।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংকের ওপর প্রভাব ধরে রাখার স্বার্থে দলটির ঘনিষ্ঠ কিছু মহল বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও জামায়াত এই অভিযোগ অস্বীকার করতে পারে, তবে বাস্তবতা হলো—ব্যাংকিং খাতের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে মাত্রার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা। কোনো ব্যাংক নিয়ে অযাচিত গুজব, আতঙ্ক বা রাজনৈতিক প্রচারণা শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা কেবল তার পরিচালনা পর্ষদের ওপর নির্ভর করে না; বরং গ্রাহকদের আস্থা, বাজারের বিশ্বাস এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির ওপরও নির্ভর করে।

সুতরাং খুরশিদ আলমের নিয়োগ নিয়ে কারও আপত্তি থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আপত্তি তথ্য, যুক্তি এবং আইনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। ভিত্তিহীন অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বা মবচাপ সৃষ্টি করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানকে দেখার মানসিকতা।

আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ও আস্থা। সেই আস্থাকে দুর্বল করে, এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে সব পক্ষের বিরত থাকা উচিত। কারণ ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক