কিচেন ক্যাবিনেট শব্দটির উৎপত্তি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৩০ সালের দিকে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসন তাঁর অফিশিয়াল মন্ত্রিসভার চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুদের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেহেতু তাঁরা হোয়াইট হাউসের পেছনের দরজা বা ‘রান্নাঘর’ দিয়ে যাতায়াত করতেন এবং ঘরোয়া পরিবেশে আলোচনা করতেন, তাই সমালোচকরা বিদ্রুপ করে একে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলা শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জ্যাকসনের এই কিচেন ক্যাবিনেট ধারণা পশ্চিমা গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তা পায়। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকুক আর না-ই থাকুক আধুনিক বিশ্বে সব দেশে, সব ধরনের সরকার পদ্ধতিতেই কিচেন ক্যাবিনেট আছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেমন নিজস্ব একটি কোর টিম আছে, যারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সিদ্ধান্তের মূল কারিগর। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে চালায় পাঁচজনের একটি বিশেষ দল। যে দলে তাঁর পরিবারের একজন সদস্যও রয়েছেন। নতুন শুল্কনীতি থেকে শুরু করে ইরানের সঙ্গে চুক্তি, সব বিষয়ে ট্রাম্পের মূল পরামর্শক হলো এই পাঁচ সদস্যের কোর কমিটি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারেরও রয়েছে বিশ্বস্ত একটি ছোট্ট গ্রুপ। যাদের সঙ্গে স্টারমার প্রতিনিয়ত পরামর্শ করেন।
গত মাসে যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবিকে কেন্দ্র করে চাপে পড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। নিজ দল লেবার পার্টির কয়েকজন সদস্যই তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও পদত্যাগের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা তাঁকে পদত্যাগ না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
উন্নত গণতন্ত্রে যেমন ক্ষমতা কেন্দ্রে যেমন একটি নিউক্লিয়াস থাকে, ঠিক তেমনই উত্তর কোরিয়ার মতো চরম একনায়কতন্ত্রেও রয়েছে গুটি কয়েক নীতিনির্ধারক। যাঁরা আসলে রাষ্ট্র চালান। চীনের মতো একদলীয় শাসনের দেশেও কিচেন ক্যাবিনেটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
কিচেন ক্যাবিনেট বলতে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের (যেমন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি) অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ঠ একদল অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টাকে বোঝায়। এটি সরকারের কোনো সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক অংশ নয়, বরং নেতার ব্যক্তিগত পছন্দের কিছু মানুষের একটি ছোট বৃত্ত, যাঁরা পর্দার আড়ালে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেন। মূলত তাঁদের সিদ্ধান্তেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এটি এমন একটি ছায়া মন্ত্রিসভা, যাঁরা ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করেন, কিন্তু জনগণের কাছে বা সংসদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকেন না। এমনকি জনগণ এ ব্যাপারে অবগতই থাকে না যে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসছে এই কিচেন ক্যাবিনেট থেকে।
প্রকৃত মন্ত্রিসভা যেখানে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়, কিচেন ক্যাবিনেট সেখানে একেবারেই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এখানে কোনো পদমর্যাদার বাধ্যবাধকতা নেই। এই বৃত্তে নেতার পারিবারিক সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহায়ক বা নেতার অত্যন্ত অনুগত কোনো বুদ্ধিজীবী থাকতে পারেন।
বাংলাদেশেও সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের একটি নিজস্ব পরামর্শকবলয় ছিল। তবে তা নিয়ে কখনো বিতর্ক হয়নি। সবাই জানতেন, কারা সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী। কিন্তু অতীতে এই প্রভাবশালীরা যে সিদ্ধান্তই নিতেন, তা পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় বা সংসদে আলোচিত হতো। তবে বাংলাদেশে কিচেন ক্যাবিনেট আলোচনায় আসে ইউনূস সরকারের আমলে। ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের দুই মাস পর, কিচেন ক্যাবিনেটের রহস্য উন্মোচন করতে থাকেন ওই সরকারের একাধিক উপদেষ্টা। এই বিতর্কের সূচনা করেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
গত ২৫ মে সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, একটি গোপন ও অনির্বাচিত সাত সদস্যের কিচেন ক্যাবিনেট বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করত।
মো. তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনানুষ্ঠানিক কিচেন ক্যাবিনেট প্রতি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বৈঠকে বসত এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় তাঁকেও কিচেন ক্যাবিনেটের একটি বৈঠকে অংশ নিতে হয়েছিল।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে পর একে একে কয়েকজন উপদেষ্টা মুখ খোলেন। সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া স্বীকার করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন ক্যাবিনেট ছিল। তবে তিনি তার সদস্য ছিলেন না।
একই রকম বক্তব্য দেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘প্রতি মঙ্গলবার বসতেন কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্যরা। এখানে ওনারা ইনফরমাল আলোচনা করতেন। তবে কারা করবেন সেটা নির্ধারিত ছিল।’
একাধিক উপদেষ্টার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরে আরেকটি সরকার ছিল। যে সরকারই আসলে দেশ চালাত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তই হতো এই কিচেন ক্যাবিনেটে। অর্থাৎ অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর একটি অংশ ছিল নামমাত্র। তারা উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়ে জনগণের করের টাকায় নানা রকম সুযোগসুবিধা ভোগ করতেন, কিন্তু কোনো কাজ করতেন না। দামি গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন, অকারণে বিদেশ ভ্রমণ করতেন, উপদেষ্টা পরিচয় ব্যবহার করে দেনদরবার এবং বিভিন্ন তদবির করতেন। এটা একধরনের অপরাধ। উপদেষ্টা হিসেবে যদি তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তাহলে তাঁরা পদত্যাগ করেননি কেন? কোন লোভে অপমানিত হয়ে দায়িত্ব আঁকড়ে ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন এবং তৌহিদ হোসেন দাবি করেছেন, তাঁরা পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য দায় এড়ানোর কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। দেড় বছর ঘি মাখন পেট ভরে খাওয়ার পর এখন বলছেন, খেতে চাননি? এসব উপদেষ্টার উচিত যেহেতু তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, তাই দেড় বছর সরকারি তহবিল থেকে যে বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা নিয়েছেন তা ফেরত দেওয়া। কারণ তাঁদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে উপদেষ্টা পরিষদের কোনো কাজ ছিল না, তাঁরা ছিলেন অলংকার। দেশ চালাত সাত সদস্যের কিচেন ক্যাবিনেট।
এবার দেখা যাক, কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন? নিঃসন্দেহে ড. ইউনূস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরাই ছিলেন এই নীতিনির্ধারক গণ্ডিতে। আমরা উপদেষ্টাদের সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি, এই কিচেন ক্যাবিনেট সাত সদস্যের ছিল। কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন, তা অনুমান করতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, রিজওয়ানা হাসান যে এই কোর কমিটিতে ছিলেন তা যে কেউ চোখ বন্ধ করে বলতে পারে। যদিও আসিফ নজরুল দাবি করেছেন, তিনি নাকি এ ধরনের কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলেন না। আসিফ নজরুলের কথা এখন মানুষ মোটেও বিশ্বাস করে না। ২৬ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের না খেলা নিয়ে তাঁর অবিরাম মিথ্যাচার তাঁকে একালের মিথ্যাবাদী রাখাল বালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিচেন ক্যাবিনেটে আর কে কে থাকতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা আর তর্কবিতর্ক হতেই পারে। যাঁরা গত দেড় বছর ইউনূসের সব অপকর্মের প্রশংসা করেছেন, যাঁরা তাঁর সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী ছিলেন তাঁরাই যে এই কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। এই সফেদ সুশীলরা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর ছিলেন আমাদের ভাগ্যবিধাতা। তাঁরা যা খুশি তাই করেছেন। জনগণের মতামত তো দূরের কথা, সাংবিধানিকভাবে গঠিত একটি সরকারকে অন্ধকারে রেখে ইউনূস তাঁর কাছের মানুষদের নিয়ে এভাবে দেশ পরিচালনা করার সাংবিধানিক অধিকার রাখেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে শুরু করে বন্দর ইজারা, এসব সিদ্ধান্তই হয়েছে কিচেন ক্যাবিনেটে। তাই উপদেষ্টা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে এভাবে কয়েকজন সদস্য দেশের মালিক বনে যেতে পারেন না। এভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।
অন্য দেশে কিচেন ক্যাবিনেট পরামর্শ দেয়, প্রস্তাব করে, সেটা মন্ত্রিসভায় কিংবা সাংবিধানিকভাবে বৈধ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্ল্যাটফর্মে চূড়ান্ত হয়। কিন্তু ইউনূস কিচেন ক্যাবিনেটের মাধ্যমে দেশ চালিয়েছেন। এটা অনৈতিক, বেআইনি। তাই অনতিবিলম্বে ইউনূস সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছে তার মূল্যায়ন করা উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে বড় ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে।




