• ই-পেপার

ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেট কি বৈধ?

মমতা জানেন হাদির খুনির নাম, জানতে হবে আমাদেরও

মন্‌জুরুল ইসলাম
মমতা জানেন হাদির খুনির নাম, জানতে হবে আমাদেরও

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে অথবা সত্য কখনো চাপা থাকে না, এসব প্রবাদ সব দেশকালের মানুষের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। বলা যায়, এসব প্রবচন চিরন্তন, অভ্রান্ত সত্য। পশ্চিমবঙ্গের সদ্য-সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির একটি বক্তব্য এই অমোঘ সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে এখন এ বক্তব্য নিয়ে চলছে তুমুল বিশ্লেষণ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে উদ্দেশ করে মমতা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে হাদিকে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, সবটাই জানি।’ তাঁর এ বক্তব্যের পর আর কিছু বলার নেই। কিছু বলতে বাকিও নেই। এখন শুধু পরবর্তী কাজটা করতে হবে। অন্যদিকে মমতার স্থলাভিষিক্ত গেরুয়া নেতা শুভেন্দু অধিকারী ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট ফর্মুলা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনীতি শুরু করেছেন। আমাদের সরকারেরও উচিত গেরুয়া সরকারের সঙ্গে যথোপযুক্ত দৃঢ়তার রাজনীতি করা। প্রথম রাতেই বিড়াল মারতে না পারলে আখেরে পস্তাতে হবে।

২ জুন মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম  জনসভায়  পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা ব্যানার্জি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের (শরিফ ওসমান হাদি) হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর পুলিশের বিশেষ বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘দেশের স্বার্থে’ এ বিষয়ে মমতার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মুখ খুলতে নিষেধ করেন। জনসভায় মমতা বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? সবটাই জানি। এনআইএর (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি) ভয় দেখাচ্ছেন, ইডির (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) ভয় দেখাচ্ছেন, সিবিআইয়ের (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) ভয় দেখাচ্ছেন? এই সিআইডি (ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট, যা রাজ্য সরকারের অধীন) আমার আমলেও ছিল। এই সিআইডি তো তখন এভাবে ইফেক্টিভলি (সক্রিয়ভাবে) অন্যায় কাজ করত না, এসটিএফও (স্পেশাল টাস্কফোর্স, রাজ্য সরকারের অধীন) করত না। বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল জেনে রাখুন, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল। মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। তারপর হোম মিনিস্টার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নিজে আমাকে ফোন করে বলেছেন। এত দিন তো কই আমি বলিনি, মুখ খুলিনি- আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি। এ সময় মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য-সমর্থকরা চিৎকার করতে শুরু করেন। তাঁরা বলেন, ‘নামটা বলে দিন।’ তখন মমতা বলেন, ‘না, বলব না দেশের স্বার্থে। (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কী বললেন? আপ থোড়া আপকে বেঙ্গল পুলিশকো বোল দো, ইয়ে বাত বাহার নেহি কেহনে কে লিয়ে। ইয়ে দেশ কে লিয়ে হ্যায় (আপনি একটু আপনার পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে বলে দিন, যাতে এই কথা তারা বাইরে না বলে। এটা দেশের জন্য করা হয়েছে)। কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট পরিবর্তন হলেও মনে রাখবেন, আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথাভান্ডার, তথ্যভান্ডার, সত্যভান্ডার। আমি তো সম্পদের ভয়ে কর্মীদের জলে ভাসিয়ে দিয়ে দল ছেড়ে চলে যাব না।’ মমতা ব্যানার্জির এ বক্তব্যের পর আমাদের সরকারকে এখন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলি করার পর পুলিশি তদন্তে নাম আসে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিমের। যে মোটরসাইকেলে চড়ে হাদিকে গুলি করা হয়েছিল, তাতে ফয়সাল ও আলমগীর ছিল বলে ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

৮ মার্চ ফয়সাল ও আলমগীরকে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বনগাঁ এলাকা থেকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স বা এসটিএফ। অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিনের জন্য রিমান্ডে নিয়েছিল। রিমান্ড শেষে তাদের আদালতে আনা হলে ২২ মার্চ আদালত দুজনকে ১২ দিনের জন্য কারা হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। যদিও হাদি হত্যা মামলায় এই দুই আসামিকে পালিয়ে আসতে সাহায্য করার অপরাধে গ্রেপ্তার ফিলিপ সাংমাকে আদালতের নির্দেশে রাখা হয়েছে বিচার বিভাগীয় কারাগারে। হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ওই দিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আদালতে তোলা হয়। পরে তাদের ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) হাতে তুলে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিধাননগরের আদালত। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিধাননগর মহকুমা বিচার বিভাগীয় আদালতে এনআইএ ফয়সাল ও আলমগীরকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। আদালতে বলা হয়, দিল্লি এনআইএর বিশেষ আদালতে তাদের তোলা হবে। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে এনআইএর গোয়েন্দারা তদন্তের স্বার্থে এ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। পরে শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার দুই আসামিকে ২২ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা দিল্লিতে নিয়ে যায়।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে উপড়ে ফেলে মোদির গেরুয়ারা এখন দখলে নিয়েছে। বিজেপির গেরুয়া নেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে এক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দুই স্থানেই ছিল সেই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। সে সময় অনেকেই তাঁর ওই বক্তব্যকে ভোটের রাজনীতির স্টান্টবাজি মনে করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর ৯ মে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই সীমান্তে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছেন। নব্য মুখ্যমন্ত্রীর নতুন ফর্মুলা হলো ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট। এটি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পুশইন করার জন্য সীমান্ত এলাকায় বিপুলসংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী মানুষ জড়ো করা হয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতে চায়। কিন্তু লাগোয়া রাজ্যের গেরুয়া নয়া নেতৃত্ব যদি উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ককেই স্বাগত জানায়, অথবা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নেয়- তাহলে আমাদেরও নতুন করে ভাবতে হবে। প্রতিবেশীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে। আর সে কথা হবে দিল্লির সঙ্গে। তাদের মনে করিয়ে দিতে হবে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সেক্টর কমান্ডার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। পিতা-মাতার মতো তাঁরও এক নম্বর এজেন্ডা হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সে কারণে তারেক রহমানের ফর্মুলা হওয়া উচিত, ‘ডাইরেক্ট ডিপোর্ট’। সীমান্ত এলাকার জনগণ ও সীমান্তরক্ষীদের হওয়া উচিত শতভাগ নির্ভীক ও দেশপ্রেমিক। আমাদের দেশ ছোট হতে পারে; কিন্তু আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ছোট একটি ভূখণ্ডে লোকসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। দারিদ্র্যসীমা, বেকারত্ব, শিক্ষার হার, নারীর ক্ষমতায়ন, স্যানিটেশনসহ অনেক ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে আমাদের অবস্থান অনেক ওপরে। আমাদের বিশাল বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার না থাকলে অথবা প্রবেশে বিঘ্ন ঘটলে ভারতের অর্থনীতিতে কেমন বিরূপ প্রভাব পড়ে, তা এত দিনে হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। আমাদের বেশরম স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে তারা যেভাবে চিকিৎসা বাণিজ্য করে, সেটাও গত ২৫ মাসে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুতরাং আমাদেরও নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু প্রথমবারের মতো এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। কিন্তু সেখানে কী ধরনের নিয়ম কার্যকর হতে পারে? কোন আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে? অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিতদের শনাক্তকরণ, আটক, হোল্ডিং সেন্টারে রাখা এবং পরবর্তী প্রত্যাবাসনসহ সবকিছু কীভাবে সম্পন্ন করা হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। ‘ডিটেক্ট’ বা শনাক্তকরণ হলো কথিত অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা। বিশেষত মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল এ বিষয়টি। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার কী পদ্ধতিতে এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে এবং এর প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো কী হবে? একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ‘কথিত বাংলাদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দগুলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে দাবি করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তিকে আইনগতভাবে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ঘোষণা করার জন্য নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণের অবশ্যই প্রয়োজন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা ভাষাভাষী রাজ্য। এখানে  সিংহভাগ মানুষ বাংলাভাষী। ফলে এখানে অভিযানটা কিসের ভিত্তিতে চলবে- এ প্রশ্নটা সংগত কারণেই সেখানকার সাধারণ নাগরিকের মধ্যে উঠছে। নির্বাচনের আগে সেখানকার অনেকেই মনে করেছিলেন, এসআইআর অর্থাৎ নির্বাচনের আগে যে নিবিড় সংশোধন হয়েছে ভোটার তালিকা এবং যাতে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, এসআইআরে যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা হয়তো এর নিশানা হতে পারে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচিত হওয়ার পর এসআইআর অনুযায়ী শনাক্তকরণের কাজটি করছেন না। তিনি এখন ভারতে বিতর্কিত নাগরিত্ব আইন অনুযায়ী বাংলাভাষী ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলমানদের ‘ভারতছাড়া’ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে আমাদের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মুসলমানদের জড়ো করা শুরু করেছেন। ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার জয়ন্তীপুর সীমান্ত এলাকা থেকে কাঁটাতারের গেট খুলে ১৩ নারী-শিশুকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করে। এদের গত রবিবার থেকে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়েছিল। বিজিবির যশোরের অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল আলম খান জানিয়েছেন, ওই ১৩ জন নারী-শিশুকে কিছুতেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য অনুযায়ী আমরা ভালোই আভাস পেলাম যে কে বা কারা শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে। কে কার স্বার্থে এটা করিয়েছে। এখন আমাদের সরকারের দায়িত্ব হলো সেটি খুঁজে বের করা। মমতার বক্তব্যকে ভিত্তি করেই দিল্লিকে চাপ দেওয়া। সেই সঙ্গে আরও অনুসন্ধান করতে হবে নির্বাচনের ঠিক দুই মাস আগে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একজন প্রার্থীকে হত্যা করার নেপথ্য কারণ। অন্যদিকে গেরুয়া শুভেন্দু সরকারের ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট পলিসিও শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে। ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী।  তাই বলে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, পুশইনের মতো অন্যায়, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টে প্রতিবেশীর অশুভ উসকানি আমরা সহ্য করব- এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রতিবেশী যেহেতু পরিবর্তন করা যাবে না, সে কারণে যত শক্তিশালী ও বৃহৎ প্রতিবেশীই হোক না কেন, আমাদের ন্যায্য হিস্সা শতভাগ আদায় করতে হবে। নতজানু নয়, মাথা উঁচু করে, চোখে চোখ রেখে দৃঢ়তার যুক্তিতে কথা বলতে হবে। কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নয়। এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]

ইসলামী ব্যাংক ইস্যু : বিশৃঙ্খলায় জড়িত কারা?

সিরাজুল ইসলাম
ইসলামী ব্যাংক ইস্যু : বিশৃঙ্খলায় জড়িত কারা?
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে খেলাপি ঋণ, অন্যদিকে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য একটি বড় দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি ব্যাংকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; বরং এর পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় না। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধানের আলোকে ব্যাংকিং খাত তদারকির সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতা রাখে। কোনো ব্যাংকে পরিচালনাগত সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা বা আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করতে পারে। সেই আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নিয়োগের পরপরই ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সমিতি বা অনুরূপ কিছু ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়েছে। তাদের বক্তব্য, এই নিয়োগের মাধ্যমে নাকি ব্যাংকটিকে আবারও এস আলম গোষ্ঠীর প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন হলো, এই অভিযোগের ভিত্তি কোথায়? কোনো প্রমাণ কি উপস্থাপন করা হয়েছে? নাকি এটি কেবল জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য একটি রাজনৈতিক প্রচারণা?

বাস্তবতা হচ্ছে, অভিযোগ তোলা সহজ; কিন্তু তার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ হাজির করা কঠিন। এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, যা থেকে বলা যায় যে খুরশিদ আলমের নিয়োগের মাধ্যমে কোনো বিশেষ ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে শুরু থেকেই সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে, বিষয়টি প্রশাসনিকের চেয়ে রাজনৈতিক বেশি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক পক্ষের আগ্রহ রয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক শক্তি, গ্রাহকভিত্তি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে এটি অনেকের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের আগ্রহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই আগ্রহ যদি ব্যাংকিং শৃঙ্খলার চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে সেটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বর্তমান আন্দোলনের মধ্যে সেই রাজনৈতিক মাত্রাই বেশি দৃশ্যমান। তারা মনে করেন, একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যেভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাতে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ এটিকে ‘মববাজি’ বলেও অভিহিত করছেন। কারণ কোনো বিষয় নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জন্য আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং সরকারবিরোধী আবহ তৈরির চেষ্টা কখনোই গঠনমূলক সমাধান হতে পারে না। 

এখানে বিএনপির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং গেছে। তবে বিএনপির শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ধস বা রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিপর্যয়ের নজির নেই। বিএনপি সব সময় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার নীতি গ্রহণ করেছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। এই দাবির সঙ্গে সবাই একমত হবেন কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন; তবে রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবে এটি একটি বহুল আলোচিত বিষয়।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংকের ওপর প্রভাব ধরে রাখার স্বার্থে দলটির ঘনিষ্ঠ কিছু মহল বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও জামায়াত এই অভিযোগ অস্বীকার করতে পারে, তবে বাস্তবতা হলো—ব্যাংকিং খাতের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে মাত্রার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা। কোনো ব্যাংক নিয়ে অযাচিত গুজব, আতঙ্ক বা রাজনৈতিক প্রচারণা শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা কেবল তার পরিচালনা পর্ষদের ওপর নির্ভর করে না; বরং গ্রাহকদের আস্থা, বাজারের বিশ্বাস এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির ওপরও নির্ভর করে।

সুতরাং খুরশিদ আলমের নিয়োগ নিয়ে কারও আপত্তি থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আপত্তি তথ্য, যুক্তি এবং আইনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। ভিত্তিহীন অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বা মবচাপ সৃষ্টি করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানকে দেখার মানসিকতা।

আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ও আস্থা। সেই আস্থাকে দুর্বল করে, এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে সব পক্ষের বিরত থাকা উচিত। কারণ ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা

মো. জাকির হোসেন
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও স্মরণীয় নাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ছিলেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সেক্টর কমান্ডার, রাষ্ট্রনায়ক এবং আধুনিক বাংলাদেশের উন্নয়নের পথিকৃৎ।  তার কর্মময় জীবন, দেশপ্রেম, নেতৃত্বগুণ এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন এবং একজন দক্ষ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৬ মার্চের প্রাক্কালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধ চলাকালে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং পরে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে অসামান্য বীরত্ব ও নেতৃত্বের পরিচয় দেন। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। জাতীয় সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত। অর্থাৎ তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে শাসনামল ছিল প্রায় ৪ বছর ১ মাস ৯ দিন। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে, তিনি ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে ধীরে ধীরে দেশের কার্যকর শাসনক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন এবং ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। সে হিসেবে তার প্রভাবশালী শাসনকালকে অনেক গবেষক প্রায় সাড়ে ৫ বছর (১৯৭৫-১৯৮১) ধরে বিবেচনা করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীলতার পথে অগ্রসর হতে শুরু করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশেও সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয় চেতনাকে রক্ষা করার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। তার রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় তিনি যে নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, তা বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, লোকজ ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক রীতি-নীতি ও জীবনদর্শনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি জাতির সংস্কৃতি। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী দুর্বল জাতিগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছে। এই প্রক্রিয়াকে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলা হয়। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে একটি জাতি তার নিজস্ব ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও স্বকীয়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে দুর্বল করে বিদেশি সংস্কৃতি বা চিন্তাধারাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। গণমাধ্যম, শিক্ষা, সাহিত্য, বিনোদন, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিচালিত হতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নানা রূপে দেখা যায়। বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, দেশীয় শিল্প-সাহিত্যের অবমূল্যায়ন, লোকজ সংস্কৃতির প্রতি অনীহা এবং জাতীয় ইতিহাস সম্পর্কে উদাসীনতা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ অবস্থায় জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রিক দায়িত্বে পরিণত হয়। সেই রাষ্ট্রিক দায়িত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করেছিলেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবনবোধ রয়েছে, যা জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে। তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে তিনি দেশের জনগণকে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব, ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জনগণের সম্মিলিত পরিচয়কে শক্তিশালী করা। তিনি মনে করতেন যে, জাতীয় ঐক্য ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম অবদান ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা। তিনি জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। এই দর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এর ফলে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে নতুন আলোচনা সৃষ্টি হয় এবং দেশের মানুষ নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা দেশের জনগণকে বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাবের অন্ধ অনুসরণ থেকে বিরত থেকে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি আস্থা রাখতে উৎসাহিত করে। ফলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি মানসিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একটি জাতির সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হলে তার শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। তার শাসনামলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে উৎসাহ প্রদান করা হয় এবং জাতীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক চর্চা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ চালু করেছিলেন এবং কিছু বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। যেমন ১৯৭৬ সালে শিশুদের সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি জিয়াউর রহমানের আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার। তিনি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাঙামাটিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট এবং নেত্রকোনার বিরিশিরিতে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তার আমলে নেওয়া হয়। এছাড়াও তার সময়েই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য ঢাকার অদূরে গাজীপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চলচ্চিত্র নগরী’ (ফিল্ম সিটি), ‘ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ফিল্ম আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কারের প্রবর্তন তিনিই করেন। সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে একুশে পদক (১৯৭৬), স্বাধীনতা পদক (১৯৭৭), বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (প্রথম প্রদান ১৯৭৯) চালু বা প্রবর্তনের কৃতিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের। তার সময়েই ‘বাংলা একাডেমি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮’ জারি করে প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করা হয়। জিয়াউর রহমানের সময়েই পল্লীগীতি, লোকজ সংগীত, দেশাত্মবোধক গান ইত্যাদি গ্রামবাংলার সংস্কৃতিকে জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ফলে সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়।

বাংলা ভাষা বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রশাসন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে উৎসাহিত করেন। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে জাতীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে আরো সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। ভাষার মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষিত হয়। তাই বাংলা ভাষার চর্চা ও প্রসার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি ও নৈতিক মূল্যবোধকে সম্মান করতেন। তিনি মনে করতেন যে, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক জীবনধারা। তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করেন। ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাতীয় জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তিনি সমাজে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে যখন ভোগবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়, তখন নিজস্ব ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ সমাজকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।

গণমাধ্যম একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জিয়াউর রহমান গণমাধ্যমকে জাতীয় সংস্কৃতি প্রচারের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তার সময়ে রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতি, সংগীত, সাহিত্য ও ঐতিহ্যভিত্তিক অনুষ্ঠান সম্প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে জনগণের মধ্যে জাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। বিটিভিতে জাতীয় পর্যায়ের শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা হিসেবে ‘নতুন কুঁড়ি' অনুষ্ঠানটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ব্যাপক বিস্তার ও প্রচার হয়। দেশীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিককর্মীরা তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করেন। গণমাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাবের একচেটিয়া আধিপত্য কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির মূল শিকড় গ্রামে প্রোথিত। জিয়াউর রহমান গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বও উপলব্ধি করেছিলেন। তার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে। গ্রামীণ মেলা, লোকসংগীত, পালাগান, যাত্রা, বাউলগান, জারি গান, পল্লীগীতি ও অন্যান্য লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেশীয় সংস্কৃতির ভিত্তি আরো মজবুত হয় এবং বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিপরীতে একটি স্বকীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে।

জিয়াউর রহমান শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি বিশ্বের কাছে দেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। একটি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় যত বেশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তত শক্তিশালী হয়। জিয়াউর রহমান কখনোই বিশ্বের অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে ছিলেন না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে তা যেন জাতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অর্থাৎ তিনি সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাউথ এশিয়ান এসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন (SAARC) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সার্ক গঠনের ধারণাটি প্রথম উত্থাপন করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি আঞ্চলিক সংস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সার্কের লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়; সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বায়নের যুগে অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব—এই ধারণার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতিতে।

উপসংহারে স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেমকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা, দেশীয় সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা, বাংলা ভাষার বিকাশ, গ্রামীণ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, গণমাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতির প্রসার এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তার অবদানের উল্লেখযোগ্য দিক। তার এসব উদ্যোগ জাতীয় সংস্কৃতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নতুন নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সংরক্ষণের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক : ফেলো, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক, জাসাস

বিদায় তোফায়েল ও শেখ হাসিনার ঘোষণা

সুমন পালিত
বিদায় তোফায়েল ও শেখ হাসিনার ঘোষণা

বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক তোফায়েল আহমেদ চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সোমবার বেলা সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উনসত্তরের আইউববিরোধী গণ অভ্যুত্থানের এই মহানায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি হিসেবে ছিলেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রধান নেতা। উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে পাকিস্তানের সেনাপতি শাসক ফিল্ড মার্শাল আইউব খানের পতন ঘটে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, শেখ মুজিবসহ ওই মামলার সব আসামির মুক্তি দাবিতে মূলত ছাত্রদের নেতৃত্বেই গণ অভ্যুত্থান হয়। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের প্রায় সবাই ছিলেন সে সময় হয় জেলে নতুবা পলাতক। ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীই ছিলেন একমাত্র রাজনৈতিক নেতা, যাঁর বজ্রকণ্ঠ সে সময় দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। হুজুর ভাসানী ছাড়া পুরো গণ অভ্যুত্থানের মূল চরিত্র ছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। যার নেতৃত্বে ছিলেন ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ। তাঁর অনবদ্য ভূমিকার কারণেই গণ অভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগ সবচেয়ে শক্তিশালী ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়। তবে সে সময়ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ছিল দেশজুড়ে দাপুটে সংগঠন। গণ অভ্যুত্থানে তারাও ছিল সামনের কাতারে। 

উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের একপর্যায়ে শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামি মুক্তি লাভ করেন। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারে যাঁরা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বলে জল্পনাকল্পনা চলছিল, তাঁরা জাতীয় বীরে পরিণত হন। ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তোফায়েল আহমেদ মাত্র ২৭ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন মুজিব বাহিনীর চার নেতার অন্যতম। স্বাধীনতার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব পদে নিয়োগ পান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবার নিহত হলে গ্রেপ্তার ও কারা নির্যাতনের শিকার হন তোফায়েল আহমেদ। রাজনীতির এই জীবন্ত কিংবদন্তি ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দাপুটে সংসদবেত্তা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। দীর্ঘকাল তিনি ছিলেন জীবস্মৃত অবস্থায়। কাউকে চিনতে পারতেন না। গত বছরের ৫ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর খবর রটে যায় সারা দেশে। মাত্র কদিন আগে তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। একজন জাতীয় বীরকে না-ফেরার দেশে যেতে হলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সঙ্গে করে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা

বাংলাদেশে পৌনে চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরে গেছেন ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। ভারতের নতুন হাইকমিশনার পদে নিয়োগ পেয়েছেন ঝানু রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদী। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রণয় ভার্মা ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় আসেন। তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দাপুটে শাসন। প্রণয় ভার্মা বাংলাদেশে তাঁর কর্মজীবনে দুটি অন্তর্ভুক্তিহীন নির্বাচন দেখার সুযোগ পেয়েছেন। যার একটি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। আরেকটি চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। দেখেছেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতার সে অভ্যুত্থানে ভারতে আশ্রয় নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাবেক মন্ত্রী ও বিজেপির নীতিনির্ধারকদের একজন দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার করার পাশাপাশি কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে আরও দুটি ঘটনা। প্রথমত ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে চলতি বছর দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারকে উদ্দেশ করে বলেছেন, জেলখানা আর ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত রাখুন আমি দেশে ফিরবই। তিনি তাঁর পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেওয়া এবং  তাঁকে নিতে বিমান পাঠানোর পরামর্শও দিয়েছেন। প্রশ্ন করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারপরও কোন সাহসে দেশে ফিরতে চান তিনি। শেখ হাসিনা নিজেকে নির্দোষ ঘোষণার পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি দেশে ফিরে এ ব্যাপারে আইনি লড়াইয়েরও কথা বলেছেন। দ্বিতীয়ত আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক  চুক্তি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আর প্রধানমন্ত্রী মোদি ছিলেন হরিহর আত্মা। কিন্তু নানা কারণে তাঁদের  দূরত্ব সৃষ্টি হয়। চীনের বিরুদ্ধে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ‘কোয়াড’ নামের অলিখিত সামরিক জোট গঠন করে আমেরিকা। যার প্রকাশ্য উদ্দেশ্য ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবাধ নৌপরিবহন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আসল উদ্দেশ্য চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ঠেকিয়ে দেওয়া। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ২০০৭ সালে চীনের বিরুদ্ধে এমন এক জোটের ধারণা সামনে আনেন। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর ২০১৭ সালে এটি আবার সক্রিয় হয়। বাংলাদেশকে এ জোটের সদস্য হওয়ার জন্য আমেরিকা  চাপ দেয়।  ভারত ও জাপানের পক্ষ থেকেও  আসে অনুরোধ। কিন্তু শেখ হাসিনা সে অনুরোধের ঢেঁকি গেলেননি। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে কালো মেঘ জমে ওঠে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে আমেরিকার ডিপ স্টেট।

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানে আমেরিকা ৩২৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এজন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে দায়ী করেছেন। আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে ভারতকে ব্যাপক শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সামরিক সহযোগিতায়ও আবদ্ধ হয়েছে দুই দেশ। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন জানিয়েছে আমেরিকা। দিল্লি চায় বাংলাদেশে পাকিস্তান যাতে কোনোভাবেই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না পায়। উগ্রবাদী শক্তির উত্থান নিয়েও আপত্তি দিল্লির। দৃশ্যত  ট্রাম্প এ ইস্যুতে ভারতকে ছাড় দিয়েছেন। দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের টানাপোড়েনে কোয়াড নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। নতুন সমঝোতায় চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে রাখা সম্ভব হবে। উভয় দেশই দিল্লি ওয়াশিংটন সমঝোতাকে নিজেদের জয় হিসেবে দেখছে।  

স্বাধীনতার পর সুবিমল দত্ত থেকে প্রণয় ভার্মা পর্যন্ত ১৮ জন ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। যাঁদের সবাই পেশাদার কূটনীতিক। ব্যতিক্রম নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। যাঁর জন্ম পাকিস্তানের করাচিতে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তাঁদের পরিবার ভারতে চলে আসে। তাঁরা ঠাঁই নেন কলকাতায়। দিনেশ ত্রিবেদী বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। ইচ্ছা ছিল বিমানবাহিনীতে যোগ দেবেন। সে ইচ্ছা পূরণ না হলেও লাইসেন্সধারী পাইলট তিনি। পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অভিনয় শেখার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ইচ্ছা ছিল সিনেমার নায়ক হবেন। হাত পাকিয়েছেন সেতার বাদক হিসেবে। ত্রিবেদী উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজ্য টেক্সাসে। চাকরি করেছেন বহুজাতিক কোম্পানিতে। তবে মন বসেনি তাতে। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি নিয়েছেন। কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ১০ বছর ছিলেন ওই দলের সঙ্গে। তবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। ভিপি সিং যখন প্রধানমন্ত্রী তখন যোগ দেন তাঁর জনতা দলে। লোকসভার উচ্চ পরিষদ রাজ্যসভার সদস্যও হন। তাতেও সন্তুষ্ট না থেকে মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে গঠন করেন তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা হন দলের সভাপতি, ত্রিবেদী সাধারণ সম্পাদক। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন তিনি। তাঁর দলের প্রধান মমতা ব্যানার্জি হন রেলমন্ত্রী। মমতা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলে তাঁর দলের সেকেন্ডম্যান ত্রিবেদী রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মন্ত্রী থাকাকালে রেলের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাতে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন মমতা ব্যানার্জি। তিনি ত্রিবেদীকে রেলমন্ত্রী থেকে বাদ দিতে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে চিঠি লেখেন। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে ত্রিবেদী যোগ দেন বিজেপিতে।

ত্রিবেদী একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নীতিনির্ধারকদের একজন। একজন পেশাদার কূটনীতিকের বদলে একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিককে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার নিয়োগকে কাকতালীয় ভাবার জো নেই। সবারই জানা, ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে ছন্দপতন ঘটে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি মন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তাদের  ঘন ঘন সফর ভারত সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে পেশাদার কূটনীতিকের বদলে একজন ঝানু রাজনীতিককে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য পছন্দের শীর্ষে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী বর্ষীয়ান রাজনীতিক আরিফ মোহাম্মদ খান। যিনি ৪০ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। রাজীবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরামর্শক ভাবা হতো তাঁকে।

রাজীব গান্ধীর মৌলবাদ তোষণের প্রতিবাদে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। কংগ্রেসও ছাড়েন তিনি। যোগ দেন বিজেপিতে। হয়েছেন কেরালা ও বিহারের রাজ্যপাল। রাষ্ট্রপতি পদেও তাঁর নাম আলোচিত হয়েছে।

আরিফ মোহাম্মদ খানের বদলে দিনেশ ত্রিবেদীকে শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কানেকশন এ ক্ষেত্রে মূল যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে। কারণটি স্পষ্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের নাম। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতের হাজার হাজার সৈন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি স্পর্শকাতরতাও জড়িত।

বাংলাদেশের প্রায় তিন দিকে ভারত। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের কাছে রয়েছে সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেক। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও চীন সীমান্তবর্তী মাত্র ২০ বা ২২ কিলোমিটার প্রস্থের এ ভূখণ্ডটি ভারতের সেভেন সিস্টার্স নামের সাত রাজ্যকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার  প্রাক্কালে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে অসহিষ্ণু বক্তব্য রেখে দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি সৃষ্টি করেন। ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। তা কাটিয়ে উঠতে দুই দেশই এখন আগ্রহী। সে উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার করা হয়েছে দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন ‘হেভিওয়েট’কে। তাঁর নিয়োগকে ঢাকার জন্য দিল্লির ‘কৌশলগত বার্তা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে আসার আগে ত্রিবেদী ভারতের সশস্ত্র বাহিনী প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যে বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে চলছে নানামুখী জল্পনাকল্পনা। একই সময়ে শেখ হাসিনার মুখে দেশে ফেরার প্রত্যয় ও ভারতের সঙ্গে আমেরিকার বহুমুখী চুক্তির বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে। এর একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক থাকলে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

দিনেশ ত্রিবেদীর জন্ম পাকিস্তানের করাচিতে হলেও কলকাতায় থাকার সুবাদে বাংলায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল এবং  নেতাদের  সম্পর্কে তাঁর মতো ওয়াকিবহাল ভারতে আর কেউ আছেন কি না, সন্দেহ। কারণ কংগ্রেসে থাকার সময় তিনি বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসে থাকতে পালন করেছেন একই ভূমিকা। বাংলাদেশের শীর্ষ তিন দলের অনেক দুর্বলতাও তার জানা। যে কারণে ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকরা দিনেশ ত্রিবেদীর ওপর আস্থা রেখেছেন। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনে তিনি ধনন্তরী ভূমিকা পালনে সক্ষম হবেন বলে তাদের বিশ্বাস। শাসক দল বিজেপির প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই ত্রিবেদী ঢাকার বার্তা দিল্লির কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাবেন। যা দুই দেশের রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরিতে সহায়ক হবে।

ভারতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব সৃষ্টি হয় ২০০১ সালের জোট সরকারের আমলে। ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার নিয়োগ করে ভারত স্পষ্ট করেছে তারা বিএনপি সরকারের সঙ্গে টেকসই সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। এ বিষয়ে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। ভারত যেহেতু আয়তনে জনসংখ্যায় বড় দেশ, সেহেতু তাদের উদারও হতে হবে বেশি।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

 ই-মেইল : [email protected]