বাংলাদেশের মানুষ বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেখেছে। দেখেছে রক্তে ভেজা রাজপথ, দেখেছে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া পরিবার, দেখেছে ক্ষমতার অন্ধকার করিডোরে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য সত্য। কিন্তু কিছু হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির ভেতরে জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ ও সন্দেহের প্রতীক। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ঠিক তেমনই এক ঘটনা, যা আজও বহু মানুষের মনে অজানা প্রশ্নের দগদগে ক্ষত হয়ে আছে।
সেই ক্ষতই যেন হঠাৎ নতুন করে রক্তাক্ত হয়ে উঠল, যখন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন, যা শুধু ভারতের রাজনীতিকেই নাড়িয়ে দেয়নি; বরং বাংলাদেশের মানুষকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তিনি এমন এক ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা শুনে মনে হয়েছে—ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড হয়তো কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না; এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে আরও ভয়ংকর কোনো রাজনৈতিক অন্ধকার। আর সেই ইঙ্গিতের তীর এখন সরাসরি গিয়ে বিদ্ধ করেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে।
কলকাতার ধর্মতলার জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছিল না । বরং সেটি ছিল ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দেওয়া এক অগ্নিবাণ। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের আলোচিত ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে ফোন করে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন। এখানেই থেমে থাকেননি মমতা। তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—“কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল?”
এই প্রশ্ন নিছক রাজনৈতিক বাক্য নয়; এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে এক ভয়ংকর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
একজন আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতা যখন প্রকাশ্যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে এমন ইঙ্গিত করেন, তখন সেটি আর দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মমতা এমন একটি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলেছেন, যা বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছেন—ঘটনার পেছনে এমন কিছু শক্তির সংশ্লিষ্টতা ছিল, যা প্রকাশ্যে এলে শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ভূমিকম্প তৈরি হতে পারে। আর এখানেই মোদি সরকারের অস্বস্তি সবচেয়ে বেশি।
বিগত এক দশকে ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার “দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—এসব ইস্যুতে মোদি সরকার বারবার নিজেদের নৈতিক উচ্চতায় দাঁড় করাতে চেয়েছে। কিন্তু মমতার বক্তব্য যদি সামান্য অংশেও সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—ভারত কি সত্যিই আঞ্চলিক নিরাপত্তার রক্ষক, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে গোপন খেলা পরিচালনা করা এক শক্তিধর রাষ্ট্র? এই প্রশ্নই আজ দিল্লির জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো ইউটিউবভিত্তিক ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচারক নন। তিনি ভারতের দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী, ক্ষমতার অন্দরমহলের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন রাজনীতিক। প্রশাসন, গোয়েন্দা কাঠামো ও নিরাপত্তা বাস্তবতা সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তার বক্তব্যকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
আর মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয় হলো—এখন পর্যন্ত দিল্লি এই অভিযোগের শক্ত, স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো জবাব দিতে পারেনি। কারণ অভিযোগটি এতটাই বিস্ফোরক যে সরাসরি অস্বীকার করলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, আর নীরব থাকলেও সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। রাজনৈতিকভাবে এটিই মমতার সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য। তিনি এমন একটি ইস্যু ছুড়ে দিয়েছেন, যার প্রতিক্রিয়ায় মোদি সরকার যেদিকেই যায়, অস্বস্তি এড়ানো কঠিন।
ভারতের বর্তমান রাজনীতিতে বিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র ভাবমূর্তি। কাশ্মীর, পাকিস্তান, সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, গোয়েন্দা অভিযান—সব ক্ষেত্রেই বিজেপি নিজেদের কঠোর রাষ্ট্রশক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু মমতার বক্তব্য সেই ইমেজের বুকেই ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। কারণ এখানে অভিযোগ উঠছে—একটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তথ্য জনগণের কাছ থেকে গোপন করা হয়েছে। আর যদি সত্যিই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ঘটনাটি চেপে রাখতে চেয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—কেন? রাষ্ট্রের স্বার্থে? নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আজ সবচেয়ে ভয়ংকর। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বরাবরই সীমান্ত, গোয়েন্দা সংস্থা ও অদৃশ্য যোগাযোগের জটিল খেলায় আবদ্ধ। কিন্তু সাধারণ মানুষ সবসময় বিশ্বাস করতে চেয়েছে, অন্তত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো প্রকাশ্যে আইনের শাসনের কথা বলবে। অথচ মমতার বক্তব্য যেন সেই মুখোশ সরিয়ে দিয়ে বলছে—ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেক সত্য ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা রাখা হয়।
বাংলাদেশের জন্যও এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ আছে, দিল্লি কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছে। যদিও ভারত সরকার সবসময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও জনমনে সন্দেহ পুরোপুরি কখনো দূর হয়নি।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন সেই সন্দেহের আগুনেই নতুন করে পেট্রল ঢেলে দিয়েছেন।
বিশেষ করে যখন তিনি বলেন, “আমি নাম বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে”—তখন বোঝা যায়, তিনি শুধু একটি তথ্য প্রকাশ করেননি; বরং ইচ্ছাকৃতভাবে এক অসম্পূর্ণ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। আর রাজনীতিতে অসম্পূর্ণ রহস্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র। কারণ মানুষ তখন নিজেরাই গল্পের বাকি অংশ কল্পনা করতে শুরু করে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল দিল্লির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সেটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। মমতা মূলত বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক মঞ্চে টেনে এনেছেন। অর্থাৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংবেদনশীল ঘটনাও এখন ভারতের দলীয় রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।
তবু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—যে বিষয়টি এতদিন রাজনৈতিক অন্ধকারে চাপা ছিল, সেটি অন্তত প্রকাশ্য আলোচনায় নিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্য আংশিক হোক বা পূর্ণাঙ্গ, প্রশ্ন তোলার সাহস গণতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আমি মমতা ব্যানার্জিকে সাধুবাদ জানাতে চাই।
এবং আমি এও বিশ্বাস করি যে, অদূর ভবিষ্যতে হাদি হত্যার মূল রহস্য খোলাসা হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খসে পড়বে। এখানে আরেকটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি শক্তিশালী অংশ এবং ভারত সরকার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি ভন্ডুল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারেক রহমানের দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে সব ষড়যন্ত্রই শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়।
মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই। কারণ বিজেপি এতদিন বিরোধীদের “রাষ্ট্রবিরোধী”, “অবিশ্বস্ত” কিংবা “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি” হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এবার সেই বিরোধী শিবির থেকেই এমন অভিযোগ এসেছে, যা উল্টো কেন্দ্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আর জনগণ যখন রাষ্ট্রের ওপর সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র।
আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে গোপন তথ্য, অর্ধসত্য, সীমান্ত রাজনীতি ও গোয়েন্দা ইঙ্গিতই হয়ে উঠছে নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র। এই বাস্তবতায় ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মমতার বিস্ফোরক মন্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ক্ষমতার অন্দরমহলের অস্বস্তিকর বাস্তবতার জানালা খুলে দিয়েছে।
মোদি সরকার হয়তো সাময়িকভাবে এই বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যাবে। কেন একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে এত গোপনীয়তা? কেন একজন মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করে চুপ থাকতে বলা হয়েছিল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ক্ষমতার রাজনীতির আড়ালে আসলে কত সত্য চাপা পড়ে আছে, যা জনগণ কখনো জানতে পারে না?
সুতরাং মমতার বিষাক্ত তীর শুধু বিজেপিকে আঘাত করেনি; বরং সেটি ভারতের রাজনৈতিক নৈতিকতার বুককেও রক্তাক্ত করেছে। এখন দেখার বিষয়—এই ক্ষত সারিয়ে তুলতে মোদি সরকার স্বচ্ছতার পথ বেছে নেয়, নাকি নীরবতার দেয়াল আরো উঁচু করে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]




