একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তি এখন শুধু উন্নয়নের একটি সহায়ক উপাদান নয়; বরং অর্থনৈতিক শক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যে দেশ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সেই দেশ ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই বাস্তবতায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। দেশে সেমিকন্ডাক্টরবিষয়ক একটি জাতীয় সেমিনার প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে। প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী ও উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা প্রমাণ করে, দেশে ইতোমধ্যে এমন একটি প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের সরকারপ্রধান সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, তেমনি সুপরিকল্পিত নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সমন্বয়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও দেশের অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে এটি শুধু একটি কারখানা স্থাপনের বিষয় নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি প্রতিবেশ গড়ে তোলার বিষয়। এর সঙ্গে জড়িত দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি। তাই বাংলাদেশের সামনে যেমন বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করাই এ আলোচনার উদ্দেশ্য।
সেমিকন্ডাক্টর এমন একটি উপাদান, যার বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং যার ভিত্তিতে আধুনিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির মূল কাঠামো গড়ে ওঠে। সহজ ভাষায়, এটি সেই প্রযুক্তি যার মাধ্যমে মাইক্রোচিপ বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট তৈরি হয়। এই ক্ষুদ্র চিপই আজকের বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, মহাকাশ প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম, রোবোটিকস এবং ইন্টারনেট অব থিংস—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার অপরিহার্য। একটি আধুনিক গাড়িতে শত শত, এমনকি হাজার হাজার চিপ ব্যবহৃত হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসরের ভিত্তিও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি।
এ কারণেই সেমিকন্ডাক্টরকে অনেকেই ‘ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন তেল’ বলে অভিহিত করেন। বিংশ শতাব্দীর শিল্প অর্থনীতি যেমন জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তেমনি একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি নির্ভর করছে চিপের ওপর। এর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও এটি নিবিড়ভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা দেখিয়েছে, সেমিকন্ডাক্টর এখন একটি কৌশলগত সম্পদ। কোনো দেশের শিল্পোন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহের ওপর।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প অন্যতম দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি খাত। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বিক্রয় প্রায় ৬২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্মার্ট প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে আগামী দশকে এ বাজার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারে উন্নত প্রসেসর ও গ্রাফিক্স চিপের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। একইভাবে বৈদ্যুতিক যানবাহনের সম্প্রসারণও সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, কারণ একটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে প্রচলিত গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি চিপ ব্যবহৃত হয়।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল। একটি উন্নতমানের চিপের নকশা যুক্তরাষ্ট্রে, উৎপাদন তাইওয়ানে, যন্ত্রপাতি নেদারল্যান্ডসে, বিশেষ উপকরণ জাপানে এবং সংযোজন ও পরীক্ষা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, একটি চিপ তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক দেশ অংশগ্রহণ করে। করোনা মহামারির সময় সৃষ্ট বৈশ্বিক চিপ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপানসহ অনেক দেশ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থা বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো উন্নত চিপ উৎপাদনে সক্ষম নয়, তবু চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা এবং শিল্পভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে যুক্ত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বের সফল সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ শিল্পে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। তাইওয়ানের টিএসএমসি বিশ্বের শীর্ষ চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম; দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স মেমোরি চিপ উৎপাদনে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র চিপ নকশা ও গবেষণায় অগ্রণী, আর নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল উন্নত লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে প্রায় একচ্ছত্র অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হলো মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা। তারা শুরুতেই অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনের পরিবর্তে সংযোজন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি সেবায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বৈশ্বিক শিল্পব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। বাংলাদেশেরও উচিত একই বাস্তবধর্মী কৌশল অনুসরণ করা—প্রথমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নির্ভরযোগ্য অবস্থান তৈরি করা। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভবিষ্যতে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর মতো উন্নত চিপ বা ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি; তবে তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং প্রকৌশল শিক্ষায় গত দুই দশকের অগ্রগতি ভবিষ্যতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এ শিল্পের পুরো মূল্যশৃঙ্খলে একযোগে প্রবেশ বাস্তবসম্মত নয়। চিপ ডিজাইন, সংযোজন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, সফটওয়্যার সমন্বয় ও উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ভিন্ন মাত্রার প্রযুক্তি, মূলধন ও দক্ষতার প্রয়োজন। তাই কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগসাপেক্ষ উন্নত চিপ উৎপাদনের পরিবর্তে বাংলাদেশ প্রথম পর্যায়ে চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা এবং প্রকৌশল সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গড়ে তুলতে পারে।
দেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাত ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন এবং বৈশ্বিক আউটসোর্সিং বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে বহু বাংলাদেশি প্রকৌশলী বিশ্বের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, ন্যানোপ্রযুক্তি, ভিএলএসআই ডিজাইন ও চিপ প্রকৌশলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা গেলে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিক্স শিল্পও সেমিকন্ডাক্টর সংযোজন, পরীক্ষা এবং সহায়ক শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি হলো বিপুল তরুণ জনশক্তি। প্রতিবছর হাজার হাজার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি স্নাতক কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এই মানবসম্পদই প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে। তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করেছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ‘চীন প্লাস এক’ কৌশলের ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও দক্ষ শ্রমশক্তি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্পে অর্জিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও গভীর। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্বের অন্যতম মূলধননির্ভর, গবেষণানির্ভর ও প্রযুক্তিঘন খাত। একটি আধুনিক উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহযোগিতা অপরিহার্য। শুধু প্রকৌশলী তৈরি করলেই হবে না; চিপ ডিজাইন, মাইক্রোফ্যাব্রিকেশন, উপাদান বিজ্ঞান, মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, অতিশুদ্ধ পানি, উন্নত লজিস্টিকস, বিশেষায়িত রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ছাড়া এ শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে না। ফলে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই হবে বাংলাদেশের প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ববাজারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের সামনে উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়তা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে উন্নত প্রসেসর উৎপাদনের পরিবর্তে চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, অ্যানালগ ও শিল্পভিত্তিক চিপ এবং প্রকৌশল সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করা। এতে তুলনামূলক কম মূলধন বিনিয়োগে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত উৎপাদনের ভিত্তি গড়ে উঠবে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয় প্রধানত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পের মূল্যসংযোজন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক বাজারের সামান্য অংশীদারিত্ব অর্জন করলেও তা বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ে রূপ নিতে পারে, যার বাস্তব উদাহরণ মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম। একই সঙ্গে এ শিল্প উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বিকাশে সহায়তা করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মোট দেশজ উৎপাদনে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের অংশ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শ্রমনির্ভরতা থেকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল প্রণয়ন, যেখানে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর প্রণোদনা, রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারত্বকে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, চিপ নকশা কেন্দ্র, দক্ষতা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন উদ্যোগের সহায়তা কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প-সরকারের সমন্বয়ে একটি ‘বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করা গেলে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
উপসংহারে বলা যায়, সেমিকন্ডাক্টর শুধু একটি নতুন শিল্প নয়; এটি বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামোর রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উচ্চ মূল্যসংযোজন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের একটি কৌশলগত সুযোগ। তৈরি পোশাক শিল্প যেমন বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন মানচিত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নীতিসহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও দেশকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘বাংলাদেশে তৈরি’ নয়, বরং ‘বাংলাদেশে নকশাকৃত, উদ্ভাবিত ও প্রকৌশলায়িত’ প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করা—যেখানে বাংলাদেশ কেবল উৎপাদনকারী নয়, উদ্ভাবন, নকশা ও প্রযুক্তি সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবেও বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]




