বাংলাদেশ যখন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার নতুন বাস্তবতা নিয়ে ভাবছে, তখন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে। যুক্তরাজ্যে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি উন্নয়ন, শিক্ষা, পুলিশ-জনসম্পর্ক ও নীতিনির্ধারণে কাজ করা ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই মনে করেন, আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থানীয় সরকারই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি। তিনি বিশ্বাস করেন, উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে কালের কণ্ঠের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি নুরুল হক শিপুর সঙ্গে কথা বলেছেন।
কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ঘিরে আপনি কেন এত আশাবাদী?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের ওপর। উন্নত বিশ্বে নাগরিকের অধিকাংশ মৌলিক সেবা স্থানীয় সরকারই নিশ্চিত করে। বাংলাদেশেও যদি কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জনগণের জীবনমান ও প্রশাসনিক দক্ষতা—দুই ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী পরিবর্তন সম্ভব।
কালের কণ্ঠ : যুক্তরাজ্যে আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।
ড. ফয়েজ উদ্দিন : বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে কাজ করার পর ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যে আসি। এরপর বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিলে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এই দীর্ঘ পথচলায় নীতি বাস্তবায়ন, কমিউনিটি নেতৃত্ব, বহুসাংস্কৃতিক সমাজে সম্প্রীতি, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।
কালের কণ্ঠ : স্থানীয় সরকার পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকর হতে পারে?
ফয়েজ উদ্দিন এমবিই : প্রতিটি দেশের বাস্তবতা আলাদা, কিন্তু ভালো নীতির কোনো সীমান্ত নেই। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অনেক কার্যকর দিক বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণ করা সম্ভব। আমি মনে করি, অভিজ্ঞতা অনুকরণ নয়; বরং বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
কালের কণ্ঠ : কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী বলছে?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সময় দেখেছি, জনগণের আস্থা ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা টেকসই হয় না। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল শক্তি হচ্ছে জনগণকে অংশীদার হিসেবে দেখা। বাংলাদেশেও এই সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী করা সম্ভব।
কালের কণ্ঠ : শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে আপনার কাজের ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : নিউ হোপ গ্লোবাল এবং নিউ হোপ এডুকেশন সিআইসি-এর মাধ্যমে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছি। আমি বিশ্বাস করি, উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ।
কালের কণ্ঠ : স্থানীয় সরকার সংস্কার নিয়ে আপনার গবেষণার মূল বক্তব্য কী?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : আমার গবেষণার মূল বিষয় হলো—প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন, নাগরিক অংশগ্রহণ, ডিজিটাল সেবা এবং সুশাসন। আমি মনে করি, স্থানীয় সরকারকে যদি পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করা যায়, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ কমবে এবং জনসেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে নীতিগত আলোচনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলবেন?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় সরকার আধুনিকায়ন, শিক্ষা, পুলিশ সংস্কার এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছে। আমার বিশ্বাস, এসব আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ খোঁজা।

কালের কণ্ঠ : আপনি দাবি করেন বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রাথমিক খসড়া তৈরির কাজেও সম্পৃক্ত ছিলেন।
ড. ফয়েজ উদ্দিন : হ্যাঁ, আমি সে ধরনের একটি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলাম বলে আমার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব বলেই আমি মনে করি।
কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কারে প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : বিশ্বের বহু দেশ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক আধুনিকায়নে সফল হয়েছে। বাংলাদেশও যদি যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে, তাহলে নীতিনির্ধারণ আরো সমৃদ্ধ হবে।
কালের কণ্ঠ : যদি সরকার আপনাকে স্থানীয় সরকার সংস্কার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানায়?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : আমি এটিকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে নয়, দেশের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে দেখব। আমার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং কর্মজীবনের শিক্ষা যদি বাংলাদেশের মানুষের উপকারে আসে, সেটিই হবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

কালের কণ্ঠ : নতুন প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?
ড. ফয়েজ উদ্দিন : পৃথিবীর যেখানেই থাকুন, নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের কল্যাণে কাজে লাগানোর মানসিকতা রাখতে হবে। উন্নত বাংলাদেশ গড়তে শুধু সরকারের নয়, দেশের প্রতিটি মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি, দেশের ভবিষ্যৎ গড়বে দক্ষতা, সততা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব।



