দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সংবাদ সংস্থা ও অনলাইন গণমাধ্যমের চিফ রিপোর্টারদের সঙ্গে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-এর মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের চিফ রিপোর্টাররা অংশগ্রহণ করেন। তারা সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়ন, কল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-কে আরো শক্তিশালী, আধুনিক ও স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা বলেন, সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ডিআরইউকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিকতায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
রবিবার (১৯ জুলাই) দুপুরে ডিআরইউর শফিকুল কবির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময়সভায় তারা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে আমার দেশ-এর এম আবদুল্লাহ সাংবাদিকদের সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, পরীক্ষাভিত্তিক নিবন্ধন, এন্ট্রি-লেভেলে ৩৫ হাজার টাকা বেতন এবং সাংবাদিকদের জন্য শক্তিশালী কল্যাণব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিআরইউকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সিদ্দিক ইসলাম আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিক গড়ে তুলতে এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সংবাদ-এর প্রধান প্রতিবেদক সালাম জুবায়ের বলেন, ডিআরইউ তার ঐতিহ্য ধরে রেখে আরো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ইত্তেফাক-এর শামসুদ্দিন আহমেদ নতুন সাংবাদিক তৈরিতে সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক ও সমকাল-এর মসিউর রহমান খান বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে ডিআরইউকে পরিচালনা করার আহ্বান জানান।
ডেইলি স্টারের পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের ওপর হামলা-মামলার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার পাশাপাশি এআইভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। সংগ্রাম-এর নাসির উদ্দিন শোয়েব বলেন, জাতীয় প্রেস ক্লাব যদি সাংবাদিকদের সেকেন্ড হোম হয়, তাহলে ডিআরইউ আমাদের ফার্স্ট হোম। তিনি ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ দুই বছর করার প্রস্তাব দেন।
বাসস-এর দিদারুল আলম বলেন, তরুণ সাংবাদিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের আহ্বান জানান। বাসস (ইংরেজি)-এর রাজিব হোসেন ডিআরইউর অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
মানবজমিন-এর লুৎফর রহমান বলেন, সংবাদের গুণগত মান উন্নয়নে ধারাবাহিক ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। কালের কণ্ঠের শরিফুল আলম সুমন প্রতি বছর এ ধরনের মতবিনিময়সভা আয়োজনের প্রস্তাব দেন। আজকের পত্রিকার শহীদুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জন্য সপ্তাহে দুই দিন ছুটি কার্যকরে ভূমিকা রাখার দাবি জানান।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-এর আবুল কাশেম সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষায় ডিআরইউকে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তিনি সরকার থেকে অনুদান আনার ব্যাপারে জোর দেন।
সময়ের আলোর মামুন হোসেন সদস্যদের মধ্যে ফেলোশিপ চালু করাসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। রাইজিংবিডির নইমুদ্দিন প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য অভিন্ন ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
এ ছাড়া বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এর ইসমাইল হোসেন ডিআরইউর কার্যক্রমের মাল্টিমিডিয়া প্রচার বাড়ানোর, আমাদের সময়ের সাজ্জাদ মাহমুদ খান ভুয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের, দেশ রূপান্তরের উৎপল রায় ডিআরইউ প্রাঙ্গণে ব্যাংকের বুথ স্থাপনের এবং টাইমস অব বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে ভুয়া সাংবাদিকদের প্রবেশ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে আবু সালেহ আকন বলেন, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সংগঠনের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ডিআরইউ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পেশাগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, নিম্ন বেতন, হামলা-মামলা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব সাংবাদিকদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে ডিআরইউ নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে।
সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, বর্তমান কমিটি শুধুমাত্র সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তিনি জানান, ডিআরইউ প্রাঙ্গণে আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স, সদস্যদের জন্য হেলথ কর্নার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং সংগঠনের স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সদস্যদের সন্তানদের জন্যও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তাই এআই, ডেটা জার্নালিজম, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টিং ও ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ সময়োপযোগী বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সভায় ডিআরইউর তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক জানান, শিগগিরই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট চালু করা হবে। সেখানে সদস্যদের পাশাপাশি তাদের সন্তানদের জন্যও ইংরেজি ভাষা, অ্যাবাকাস, চীনা ভাষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
মতবিনিময়সভায় ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটির সহসভাপতি মেহ্দী আজাদ মাসুম, যুগ্ম সম্পাদক মো. জাফর ইকবাল, অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম জসিম, দপ্তর সম্পাদক রাশিম মোল্লা, নারীবিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না, ক্রীড়া সম্পাদক ওমর ফারুক রুবেল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. মনোয়ার হোসেন, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, কল্যাণ সম্পাদক রফিক মৃধা, কার্যনির্বাহী সদস্য মাহফুজ সাদি, আল-আমিন আজাদ, মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন, সুমন চৌধুরীসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।