রুমি (ছদ্মনাম) দেশের স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। মাদক সেবনের কারণে উচ্চশিক্ষিত এই মেধাবী নারী এখন পরিবার, স্বামী, সংসার—এমনকি আদরের সন্তান থেকেও বিচ্ছিন্ন। শুরুতে ধূমপান করতেন, ধীরে ধীরে ইয়াবা, পরবর্তী সময়ে হেরোইনে আসক্ত হয়ে পড়েন। এখন তার জীবন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। টাকার জন্য গেছেন বিপথে।
তার মতো অন্তত ৪৯ নারীর সঙ্গে কথা বলে অনেকটা একই চিত্র পাওয়া গেছে। বর্তমানে ঢাকা আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা প্রত্যেকে দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত। মাদকসেবী এসব নারীর বেশির ভাগ ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। তাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিও রয়েছেন।
চিকিৎসাধীন এসব নারীর ভাষ্য, শুরুতে মাদকের ক্রেতা ছিলেন তারা। এরপর ধীরে ধীরে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই মূলত তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তাদের অনেকে বিপথে।
চিকিৎসাধীন এক নারীর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার বিয়ে হয়। স্বামীর মাধ্যমে তিনি মাদকের সঙ্গে পরিচিত হন। একপর্যায়ে আসক্ত হয়ে পড়েন। সন্তান জন্মের পর তার আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ধরা পড়ে পরিবারে। তিনি প্রায়ই অতিউত্তেজিত ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেন। এসব কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে গুরুতর অবনতি এবং বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেও সমস্যা থেকেই যায়। এ সময় তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিলেও মাদকের কারণে তা হারান এবং একই সঙ্গে সংসারও ভেঙে যায়। দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তিতে তার স্বাস্থ্যের বেশ অবনতি ঘটে। এখন তিনি আহছানিয়া মিশনের ওই চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।
আহছানিয়া মিশনের গবেষণা
ঢাকা আহছানিয়া মিশন পরিচালিত গবেষণা বলছে, নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নারী মাদকসেবীদের বড় একটি অংশ ইয়াবা সেবন করেন।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) ৬২ জন ঢাকা আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৩ জন দীর্ঘদিন ধরে মাদকে আসক্ত। ছয়জন মাদকের কারণে চরমভাবে মানসিক বিকারগ্রস্ত। তাদের মধ্যে ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২৪ জন, ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২১ জন, ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১৫ জন ও ৪৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী দুজন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা জেলায় ৪৮ জন।
ঢাকা আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্ত কেন্দ্রের ‘হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ’ বিভাগের প্রধান ইকবাল মাসুদ বলেন, ‘এখন উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরা বেশি মাদকে আসক্ত হচ্ছেন। বাবা-মা সন্তানদের যথাযথ সময় না দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের অবহেলার কারণে অল্প বয়সে তারা মাদকে আসক্ত হচ্ছেন।’
মাদকের কারণে অপরাধেও জড়াচ্ছেন নারীরা
নারীরা মাদক সেবনের পাশাপাশি মাদক কারবারেও জড়িয়ে পড়ছেন। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘আগের চেয়ে দেশে নারী মাদকাসক্তদের সংখ্যা বাড়ছে।’
সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের গোয়েন্দা বিভাগ) মেহেদী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে ৮২ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে।’ মাদক নিয়ন্ত্রণে তারা নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রেখেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে মানস বলছে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা রয়েছে প্রায় সোয়া কোটি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি নারী মাদকে সম্পৃক্ত। তবে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের মধ্যে মাদক বিক্রেতা, ক্রেতা ও মাদকসেবী রয়েছেন। এসব নারীর মধ্যে অনেক তরুণী ও শিশুও রয়েছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী।’
পুলিশ সদর দপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, দেশে নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তি ও মাদক কারবারে জড়িত থাকা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মাদক গডফাদাররা এসব নারীকে ব্যবহার করে সারা দেশে মাদক কারবারে জড়িয়ে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন।
জীবনসঙ্গীর কারণে বেশির ভাগ নারী মাদকে জড়িয়েছেন জানিয়ে সংস্থাটি বলছে, দেশে ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী এক লাখ ৫০ হাজার মাদক কারবারির মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন নারী মাদক কারবারি, যা মোট মাদক কারবারির ১৭ শতাংশ।
তালিকাভুক্ত তিন হাজার ২০০-এর বেশি মাদক কারবারি নিয়ে মানসের অনুসন্ধান বলছে, প্রতি ১০ জন নারীর ৩ জনই নেশাগ্রস্ত। মাদকাসক্ত নারীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশই ইয়াবাসেবী।
সংঘবদ্ধ মাদক চক্র সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে মাদক
রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পকেন্দ্রিক অন্তত ৪৫ জন নারী ভাসমান মাদক কারবারে জড়িত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী মাদক বিক্রেতা কালের কণ্ঠকে জানান, মাদক বিক্রি করে তিনি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পান। ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারিরা তাকে এ পথে এনেছে।
রাজধানীর প্রতিটি থানা-এলাকাসহ সারা দেশে ভাসমান মাদক বিক্রেতাদের মধ্যে বেশির ভাগ নারী। সংঘবদ্ধ মাদক চক্র সমাজে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের মাধ্যমে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন।