উন্নয়ন প্রকল্পের অভাব নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ নগর পরিকল্পনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধারাবাহিক ব্যর্থতা, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে বারবার আপস, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় রাজধানী ঢাকা দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
সংস্থাটির মতে, হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয়ের পরও পরিকল্পনার ব্যর্থতার কারণেই ঢাকার জীবনমানের উন্নতি হয়নি।
শুক্রবার (১০ জুলাই) আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনায় বারবার সংশোধন, হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট এবং একের পর এক দৃশ্যমান অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে রাজধানীর অবস্থান আরও নিচের দিকে নেমে গেছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’-এ ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। দেশের জিডিপি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও রাজধানীর বাসযোগ্যতার ধারাবাহিক অবনতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একইসঙ্গে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের উদাসীনতাও ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে নগর পরিকল্পনায় ধারাবাহিক আপোষ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা, আইন প্রয়োগে অনীহা এবং জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে বিপুল বিনিয়োগের পরও রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। অবকাঠামো নির্মাণকে উন্নয়নের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা এবং পরিকল্পনার মৌলিক নীতিমালা থেকে ধারাবাহিক বিচ্যুতিই রাজধানীর বাসযোগ্যতা সংকটকে আরও গভীর করেছে।
আইপিডি বলছে, গত কয়েক বছরে রাজধানীর যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের নামে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, সড়ক সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও এসব বিনিয়োগের অধিকাংশই ছিল কংক্রিটনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধ। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল, পরিবেশগত ভারসাম্য, সামাজিক বৈষম্য কমানো কিংবা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রত্যাশিত দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে যানজট, বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সবুজ এলাকা সংকুচিত হওয়া এবং নাগরিক দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
সংস্থাটি মনে করে, উন্নয়ন নয়, বরং পরিকল্পনার ব্যর্থতাই ঢাকার বর্তমান সংকটের মূল কারণ। রাজধানীকে রক্ষার জন্য প্রণীত স্ট্রাকচার প্ল্যান এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পরিবর্তে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপে একাধিকবার আপস করা হয়েছে। ২০২২ সালে ড্যাপ প্রণয়নের মাত্র তিন বছরের মধ্যেই আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে দুই দফা সংশোধন করা হয়েছে।
বর্তমানে আবারও ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়ানোর জন্য ড্যাপ সংশোধনের চাপ দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাবিদদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে জলাশয়, জলাধার, জলাভূমি ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক পরিকল্পনাগুলো ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিবর্তন করায় ঢাকার বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
আইপিডি জানিয়েছে, রাজধানীর উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল উন্নয়ন দর্শন অনুসরণ করা হয়েছে। টেকসই নগরায়ণের পরিবর্তে কেবল কংক্রিটনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ মানসম্মত আবাসন, নাগরিক সুবিধার সমান সুযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ, প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো এবং উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত থেকেছে। বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ ও পরিবেশ দূষণ আরও বাড়িয়েছে।
উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছে আইপিডি। সংস্থাটি বলছে, জলাভূমি ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণ, অনুমোদিত নকশা অমান্য এবং অবৈধ ভূমি ব্যবহার অব্যাহত থাকলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। ফলে আইন লঙ্ঘনের সংস্কৃতি দিন দিন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, ওয়ার্ডভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনার অভাবও রাজধানীর অন্যতম বড় সংকট। প্রতিটি ওয়ার্ডের জনঘনত্ব, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সড়ক ব্যবস্থা, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ, পার্ক, ফুটপাত এবং নাগরিক সমস্যার ধরন আলাদা হলেও পরিকল্পনা এখনও কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে পৃথক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ না করায় নাগরিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে আইপিডি। সংস্থাটির মতে, ঢাকার ধারণক্ষমতা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে নাগরিক সেবা, অবকাঠামো, পরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তাই শুধু মেগা প্রকল্প দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জাতীয় নগর উন্নয়ন নীতির আলোকে ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিল্পায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঢাকামুখী জনস্রোত কমাতে হবে।
আবাসন খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইপিডি। সংস্থাটি বলছে, ড্যাপ এবং জাতীয় নগর উন্নয়ন নীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসনের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে পুরো আবাসন খাত উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ পোশাক শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক, গৃহকর্মীসহ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে তারা অস্বাস্থ্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ ও মানবেতর পরিবেশে বস্তি কিংবা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে তুলনামূলক বেশি ভাড়া দিয়ে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিনিয়োগের সামাজিক ও পরিবেশগত সুফল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইপিডি। সংস্থাটির মতে, হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণ হলেও পার্ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ ফুটপাত, শিশু ও প্রবীণবান্ধব নগর পরিবেশ এবং সাশ্রয়ী আবাসনের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারের আমলেও অবৈধ দখল থেকে খেলার মাঠ উদ্ধার, খাল ও জলাশয় রক্ষা কিংবা পানি, গ্যাস ও অন্যান্য মৌলিক সেবা সমানভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
পরিকল্পনাহীন খোঁড়াখুঁড়িকেও রাজধানীর অন্যতম বড় দুর্ভোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে আইপিডি। সংস্থাটি জানায়, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, তিতাস, ডেসকো ও ডিপিডিসির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় একটি সংস্থা রাস্তা সংস্কারের পর আরেকটি সংস্থা একই রাস্তা আবার কেটে ফেলছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নাগরিক দুর্ভোগ, যানজট এবং পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।
আইনের শাসনের অভাব এবং পক্ষপাতমূলক প্রয়োগ নিয়েও সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হলেও প্রভাবশালী আবাসন ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু কিংবা বড় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জলাশয় ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল, অবৈধ প্লট বিক্রি কিংবা নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের মতো ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রায়ই নীরব বা আপোষমূলক অবস্থান নেয়। ফলে আইনের সমতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
দুর্নীতি ও জবাবদিহির ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করে আইপিডি বলেছে, নগর সংস্থাগুলোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে আইন অমান্যের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। মাঠপর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং, নিয়মিত তদারকি এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির অভাবে আইন অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে তা ভেঙে পড়ছে।
এসব বাস্তবতায় কেবল বাজেট বৃদ্ধি, ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ কিংবা নতুন মেগা প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে মনে করে আইপিডি। সংস্থাটি বলেছে, উন্নয়নের ধারণায় মৌলিক পরিবর্তন এনে পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রভাবমুক্ত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
এ লক্ষ্যে আইপিডি ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনায় রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক আপস বন্ধ করা, ড্যাপ ও ইমারত আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বৈজ্ঞানিকভাবে জনঘনত্ব নির্ধারণ, রাজউক ও সিটি কর্পোরেশনের মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, খাল-নদী-জলাভূমি সংরক্ষণ, পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষা, গণপরিবহনভিত্তিক নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত নিশ্চিত করা, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, ওয়ার্ডভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনা গ্রহণ, ঢাকার বাইরে শিল্প ও সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরে নীতিগত প্রণোদনা দেওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার ও ভবন নির্মাণের তদারকি, নকশা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিকল্পনাগত, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা।
আইপিডির মতে, রাজধানীর বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে কেবল দৃশ্যমান উন্নয়ন নয়, সুশাসন, কার্যকর পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং নাগরিককেন্দ্রিক নগর ব্যবস্থাপনাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান।




