বর্ষায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশ। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি দেড় লাখের বেশি মানুষ। দেশের অন্যান্য জেলায়ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দ্রুত গোটা দেশ বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে বাংলাদেশকে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করতে হবে। এই বন্যা বাংলাদেশকে নতুন করে আরেকটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র পাঁচ মাস হলো। সাধারণত যেকোনো দেশে একটি নতুন সরকার গঠিত হলে প্রথম ছয় মাস স্বস্তির সময় পায়। এই সময়কে বলে হানিমুন পিরিয়ড। এই সময়ে দেশের মানুষ অপেক্ষা করে। নতুন সরকার কীভাবে দেশ পরিচালনা করছে তা পর্যবেক্ষণ করে। বিরোধী দল সরকারকে কিছু সময় দিতে চায়। বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে অপেক্ষায় থাকা প্রেসার গ্রুপও ধৈর্য ধরে। নতুন সরকার চাপমুক্ত পরিবেশে দেশ পরিচালনার কাজ শুরু করে। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য সেই স্বস্তির সূচনা হয়নি। এই সরকারের জন্য কোনো মধু চন্দ্রিমা আসেনি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় এক ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে। বিগত ইউনূস সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নামে অর্থনীতি ধ্বংসের আয়োজন করেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা হত্যা মামলা দায়ের করেন। মব বাহিনী শিল্পকারখানায় নির্বিচারে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে। সরকার দূর থেকে তামাশা দেখতে থাকে। শিল্পকারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ইউনূস শাসনামলে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা হতাশায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাই নিরাপদ মনে করেন। বন্ধ হয়ে যায় বহু কারখানা, নতুন করে বেকার হন দেড় কোটি মানুষ। দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় আরও দুই কোটি মানুষ। ১৮ মাসে ড. ইউনূস দেশের অর্থনীতি ফোকলা করে ফেলেছেন। দেড় কোটি বেকার আর দুই কোটি চরম দরিদ্র মানুষ সৃষ্টি করেছেন। বিনিয়োগ বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ, অর্থনীতি অচল।
এরকম পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার প্রথম মনোযোগ দেয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের দিকে। কিন্তু বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই শুরু হয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল যুদ্ধ। সারা বিশ্ব এই যুদ্ধে টালমাটাল হয়ে পড়ে। হু হু করে বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করে। অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। তবে সরকার দ্রুত এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয় দুই দফায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করে অনিবার্যভাবে। ফলে বাড়ে মুদ্রাস্ফীতি। এমনিতেই ইউনূস সরকারের নিপীড়ন এবং নির্যাতনে বেসরকারি খাত মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল, তার ওপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকট বেসরকারি খাতকে নতুন বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কেবল জ্বালানি খাতেই সংকট সৃষ্টি করেনি, বাংলাদেশের রপ্তানিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যায়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এই ধাক্কা সামলাতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় সামগ্রিক ভোগব্যয় কমেছে। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবির ভাব দেখা দিয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। চলতি মূলধন সংকটে উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। উৎপাদন, বিক্রি, বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রপ্তানি খাত বর্তমানে চাপে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় দেড় শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এর মধ্যে প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের আয় প্রায় ২ শতাংশ কমে ৩২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে আমদানি ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৫৪ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা কমেছে। এর প্রভাব উৎপাদন খাতেও পড়েছে; শিল্প উৎপাদন সূচক আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে এবং সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে।
দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি এখনো নাজুক। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে শিল্প খাতে নতুন অর্থায়ন আসছে না। তাছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বর্তমানে খুব বেশি নতুন বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে না। বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটে আয় ও মুনাফা কমে যাওয়ায় চাপে পড়েছে অনেক কোম্পানি।
ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে সার্বিক কর্মসংস্থানেও। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশ কিছু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এসব কারখানার বেশির ভাগই এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। কারখানাগুলোয় শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত রয়েছে। একদিকে শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কম। এ বছরে মার্চে বাংলাদেশ সফর শেষে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট এক বিবৃতিতে জানান, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছে; কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ কর্মক্ষম তরুণদের প্রায় অর্ধেকই চাকরি পায়নি। স্থানীয় প্রভাবকের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিভিন্ন পরিস্থিতিও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ধাক্কা অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বৈশ্বিক এ অনিশ্চয়তার প্রভাবের জের অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার প্রথম বাজেট পাস করেছে। নতুন বাজেটে সংকট থেকে উত্তরণের একটি পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থ পাচার রোধ, অপচয় বন্ধের নীতি এবারের বাজেটের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই দেশজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি সরকারের জন্য নতুন করে সংকট সৃষ্টি করেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। বন্যার কারণে খেতের ফসল, ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, গাছপালা, মাছের খামার, শিল্প-কারখানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দেশের নারী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী। এমনিতেই বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই, তার ওপর চলতি বন্যার কারণে খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো মজুত খাদ্যশস্য, খেতের ফসল, গৃহপালিত হাঁস-মুরগি, মাছের খামার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এই বন্যা বাংলাদেশের সংকটাপন্ন অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখন তাই সরকারকে ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলা করতে হবে। অতীতের অর্থনৈতিক দায়, ইরান যুদ্ধের চাপ, আর বর্তমান বন্যা। সরকারের একার পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন দেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগ।
সরকার, বিরোধীদলসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দল, বিত্তবানদের দাঁড়াতে হবে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে। অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কাজ করতে হবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এখন কে কোন পক্ষ তা বিবেচনার বিষয় নয়। প্রতিহিংসা, অতীতের ভূমিকা নিয়ে সময় নষ্ট করা চলবে না। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের কাজ হবে, দেশে একটি শান্তি ও সহনশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। যেন ভেদাভেদ ভুলে আমরা আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে পারি। বন্যা-পরবর্তী খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য এখন থেকেই সবাইকে নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেন বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করা যায়। বাংলাদেশ বীরের জাতি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় উদাহরণ। এরকম অনেক সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের জনগণ তাদের অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সহমর্মিতা আর ত্যাগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। এবারও আমাদের পারতে হবে। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ অপরাজেয়।































