নতুন অর্থবছরের শুরুতেই প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির প্রথম সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে অন্তত ১৩টি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নতুন পদ সৃষ্টি, বিদ্যমান পদ পুনর্বিন্যাস, নিয়োগবিধিমালা অনুমোদন এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো নির্ধারণ। সব মিলিয়ে যেসব প্রস্তাবে নির্দিষ্ট সংখ্যক জনবল উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে অন্তত ৪২৭টি নতুন পদ সৃষ্টি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এসব প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে সচিব কমিটির সভায় প্রস্তাব উত্থাপন মানেই তা চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। প্রতিটি প্রস্তাব এখন অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করবে। আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অনেক প্রস্তাবেই পরিবর্তন আসতে পারে কিংবা কিছু প্রস্তাব স্থগিতও হতে পারে। নতুন অর্থবছরের শুরুতেই অনুষ্ঠিত এই সভা সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে গবেষণা, তথ্যব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা ও সামাজিক সেবায় জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক কাঠামোকেও পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
সভায় প্রতিনিধির বদলে সচিবদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক
এবারের সভার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংশ্লিষ্ট সচিবদের সরাসরি উপস্থিতি নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে এই কমিটির সভায় সচিবদের পরিবর্তে অতিরিক্ত সচিব বা অন্য প্রতিনিধিরা অংশ নিতেন। কিন্তু এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রস্তাব উপস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ ছিল। এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশনা দিয়েছে, প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট সচিবদেরই উপস্থিত থাকতে হবে। বিশেষ কারণে প্রতিনিধি পাঠাতে হলে আগেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অনুমতি নিতে হবে এবং তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এই পরিবর্তনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে- এই সম্প্রসারণ কতটা দক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করবে এবং কতটা নতুন আর্থিক বোঝা তৈরি করবে। রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি নতুন পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রয়োজন, ফলপ্রসূতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়- এই তিনটি বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কোন কোন প্রস্তাব টিকে থাকে এবং বাস্তবে কতগুলো পদ সৃষ্টি হয়, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
সবচেয়ে বড় জনবল সমাজসেবা ও নৌবাহিনীতে
সভায় সবচেয়ে বেশি জনবল সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ২৫ শয্যাবিশিষ্ট আটটি ‘শান্তি নিবাস’-এর জন্য ৭২টি রাজস্ব খাতের পদ এবং আটজন খণ্ডকালীন চিকিৎসকসহ মোট ৮০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রবীণ ও অসহায় মানুষের জন্য পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকটের অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণেই এই উদ্যোগ বলে জানা গেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সেন্টার ফর নেভাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিএনআরডি)-এর জন্য ৫২টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-এর সাংগঠনিক কাঠামোর একটি পদের নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সামরিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে জনবল বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকারিকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সরকারিকৃত নয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণের লক্ষ্যে ৬০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারিকরণের পরও অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরির কাঠামোগত অনিশ্চয়তা ছিল। এবার সেই বিষয়টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, আত্তীকরণ সম্পন্ন হলে একদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমও আরও সুসংগঠিত হবে।
রোহিঙ্গা সংকট ও দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন জনবল
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রস্তাব সভায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর একটি কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের গুদাম ও স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন পরিচালনার জন্য ৩৯টি নতুন পদ। অন্যটি স্ট্রেনদেনিং অ্যাবিলিটি অব ফায়ার ইমার্জেন্সি রেসপন্স (সেইফার) প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টার পরিচালনার জন্য আরো ৩০টি পদ সৃষ্টি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নির্মিত এসব অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।
বন্দর, সড়ক ও গণপূর্তেও নতুন নিয়োগের প্রস্তাব
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ও চালুকৃত স্থলবন্দরগুলোর জন্য ১৫টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য চারজন ভারী ও হালকা যানবাহনের চালকের পদ ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ বগুড়া সড়ক জোন এবং নওগাঁ সড়ক সার্কেলের জন্য ৩২টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় স্থাপত্য অধিদপ্তরের আটটি আউটসোর্সিংভিত্তিক অফিস সহায়কের পদ রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আউটসোর্সিংয়ের পরিবর্তে নিয়মিত জনবল কাঠামোয় এসব পদ অন্তর্ভুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বাড়বে।
গবেষণা, তথ্যব্যবস্থাপনা ও ব্লু ইকোনমিতে গুরুত্ব
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির (এনএপিডি) আইসিটি শাখার জন্য দুটি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে। এদিকে, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ তাদের সাংগঠনিক কাঠামোয় ১৭টি নতুন পদ যুক্ত করতে চায়। তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়ন এবং সরকারি পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে আধুনিক করার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীন নতুন গঠিত ব্লু-ইকোনমি সেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগবিধিমালা-২০২৬ অনুমোদনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সভায় উত্থাপিত প্রায় সব প্রস্তাবই রাজস্ব খাতে নতুন পদ সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ এসব পদ অনুমোদিত হলে ভবিষ্যতে বেতন-ভাতা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা, পেনশনসহ বিভিন্ন আর্থিক দায় সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের অংশ হয়ে যাবে। অন্যদিকে প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, নতুন হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, গবেষণা কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বন্দর নির্মাণ করে প্রয়োজনীয় জনবল না দিলে অবকাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই জনবল বৃদ্ধি সব সময় অপচয় নয়; বরং কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করার জন্য এটি অনেক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য।