দীর্ঘ ১৯ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও থামছে না বগুড়া অঞ্চলে যমুনা নদীর ভাঙন। ভাঙনরোধে আবারও নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বিগত সরকারের সময়ে এসব প্রকল্প থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি টাকায় শতভাগ কাজ না হওয়ায় যমুনার করালগ্রাসী থাবায় বিলীন হয়েছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। নিঃস্ব হয়েছে হাজারো পরিবার।
বগুড়া অংশে যমুনা নদী ৪৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অতিবাহিত হলেও ডানতীর রক্ষায় কাজ হয়েছে ১৯ কিলোমিটার। বাকি ২৬ কিলোমিটার নদী এখন পর্যন্ত অরক্ষিত থাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। শুধু ডানতীর নয় নদীর দুই পাড়ও ভাঙছে সমানতালে। নদীভাঙনরোধে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ৬টি স্পার, একটি গ্রোঁয়েন বাঁধ ও দুটি হার্ডপয়েন্ট নির্মাণ করেছে। এছাড়া ৬টি ক্রসবার ও একটি ফিসপাস নির্মাণ করা হয়েছে।
এদিকে, বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, ভাঙনরোধে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নতুন করে বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে যমুনা নদীর ডানতীর ভাঙন কমানো সম্ভব হবে।
জানা গেছে, প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার যমুনা চীনের তিব্বতের হিমালয় পর্বতমালায় উৎপন্ন হয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে ভারত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে যমুনা নাম ধারণ করে বাংলাদেশে। এরপর এটি কুড়িগ্রামের নুনখাওয়া থেকে ২২০কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল পার হয়ে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীটি বগুড়া অংশে ৪৫ কিলোমিটার জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর শুরু থেকে ডানতীরে ভাঙন সবচেয়ে বেশি হলেও এখন বাম তীরও ভাঙছে। বগুড়া অংশে ৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১৯ কিলোমিটার নদীর স্থায়ী নদীতীর প্রতিরক্ষার কাজ সম্পন্ন করেছে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৯ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নদীভাঙনরোধে ৬টি স্পার নির্মাণ, একটি গ্রোঁয়েন বাঁধ, দুটি হার্ডপয়েন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পেতে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নে হাসনাপাড়া বাজারের সামনে ৫৫৮ মিটার স্পার নির্মাণ করা হয় ২০০২ সালে। এ ইউনিয়নের নিজবলাইল বাজারের সামনেও একইসাথে একই ধরনের আরো একটি স্পার নির্মাণ করা হয় ওই বছরে।
এছাড়া ধুনট সীমানা হতে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজার পর্যন্ত ২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যমুনা নদীর ডানতীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়। এর মধ্যে ২০০৬ সালে কালিতলা গ্রোয়েনবাঁধ থেকে পারতিত পরল পর্যন্ত ২ হাজার মিটার এবং দেবডাঙা পয়েন্টে ১ হাজার ২০০ মিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়েছে। ২০১৬ সালে রৌহাদহ হতে মথুরাপাড়া পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড উপ-বিভাগ-২ বাপাউবো বগুড়ার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ন কবির জানান, ভাঙনরোধে ইতিমধ্যে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ৬টি ক্রসবার ও একটি ফিসপাস নির্মাণ করেছে। বাকি ২৬ কিলোমিটার নদী এখন পর্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। যেখানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সোনাতলা উপজেলার পাকুল্ল্যা, সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর ও ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ি এবং ভান্ডারবাড়ি এলাকা। বর্তমানে উজান থেকে নেমা আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃর্ষ্টিতে এসব এলাকার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এসব এলাকায় ভাঙনরোধে সাড়ে ৯ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নতুন করে বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ প্রামানিক ঠান্ডু জানান, বিগত সময়ে যমুনা নদীর ডানতীর রক্ষায় যে সকল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগই লুটপাট করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বন্যা শুরু হলেই জরুরি কাজের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এক শ্রেণির ঠিকাদার স্বল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে এখন তারা কোটিপতি বনে গেছেন।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, নতুন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই হতে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির মধ্যে রয়েছে-যমুনা নদীর ডানতীরে বিভিন্ন স্থানে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষার কাজ। ২ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজের মেরামত ও পুনর্বাসন। ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ি ও বানিয়াজান স্পার পুনর্বাসন। সাড়ে ৩ কিলোমিটার যমুনা নদীর ড্রেজিং ও বগুড়া অংশে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পুনর্বাসন ও বাঁধ মেরামত।
প্রকল্পটির বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের সুপারিশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়া কর্তৃক আয়োজিত গণশুনানি এর সুপারিশসমূহ, জেলা পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে পুনঃগঠিত ডিপিপি’র উপর চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বোর্ডে যাচাই সভা অনুষ্ঠিত হয়। যাচাই সভার সিদ্ধান্তে পুনঃগঠিত ডিপিপি ১৪ মে পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নদী ভাঙন প্রতিরোধের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা, জনবসতি এবং কৃষি জমি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, নতুন প্রকল্প অনুমোদন ও যমুনা নদীর ডানতীর রক্ষায় বাঁধ পুনর্বাসন কাজ বাস্তাবায়নের মাধ্যমে বগুড়া জেলার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
তিনি আরো জানান, বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যগ ফেলা হচ্ছে। নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন হলে ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে। নদীরক্ষার কাজের কোনো দুর্নীতির খবর বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের জানা নেই। যদি কেউ দুর্নীতির চেষ্টা করেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





