বাংলাদেশ ও নেপালের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ইকোসকের বৈঠকে সদস্যরাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এ সুপারিশ অনুমোদন করে। আজ বুধবার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন।
বৈঠকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বাংলাদেশ ও নেপালের পক্ষে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) দুই দেশের আবেদন পর্যালোচনা করে মত দেয়, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা উচিত। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ইকোসক বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এর আগে সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেদিনই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণ হওয়ার কথা।
সিদ্ধান্তের পর রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বাংলাদেশের টেকসই উত্তরণের প্রতি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, সাধারণ পরিষদ প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে তা একদিকে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ ও সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করবে, অন্যদিকে এলডিসি-উত্তর সময়ের জন্য দেশের প্রস্তুতিও আরো ভালো হবে।
কেন পেছানোর আবেদন
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে। সরকারের যুক্তি, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কার সংহত করা ও স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময় একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে।
বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে কভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। দেশি সংকটের মধ্যে আছে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া।
বাংলাদেশের অবস্থান কী
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি।
তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়, কোনো দেশ উত্তরণের যোগ্য কিনা। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়, অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব মানদণ্ড অবশ্য পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। সেগুলো হলো মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। কোভিডের কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়েছে, তা না হলে আরো দুই বছর আগেই উত্তরণ হয়ে যেত।
জানা গেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদন করে সফল হয়েছে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ। ২০২৩ সালে দেশটির সরকার গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়ে বাড়তি সময় চেয়ে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আবেদন করে। তা মূল্যায়ন করে দেশটিকে তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেয় সিডিপি। এছাড়া সুনামির কারণে মালদ্বীপ ও ভূমিকম্পের কারণে নেপালের এলডিসি উত্তরণও নির্ধারিত সময়ে হয়নি।