kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

জনসচেতনার বিকল্প নেই

মযহারুল ইসলাম বাবলা   

২০ জুন, ২০২০ ১৬:৪৫ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



জনসচেতনার বিকল্প নেই

প্রত্যেক মানুষের অমূল্য সম্পদ হচ্ছে তাঁর জীবন। জীবনের তাগিদেই মানুষ বাজি রেখে সমস্ত অসাধ্য কাজ করে থাকে। জীবনচালিকার প্রধান অবলম্বনই হচ্ছে জীবিকা। জীবিকাবিহীন মানুষের জীবনকে সচল, গতিময় ও স্বাভাবিক রাখা সম্ভব নয়। জীবন এবং জীবিকা একটি অপরটির পরিপূরক। জীবিকাহীন মানুষ নিজেকে এবং তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের অন্যদের জীবনকে বাঁচাতে পারে না। জীবন ও জীবিকা মনুষ্য জীবনের অপরিহার্য অংশ। জীবিকার ওপর নির্ভর করেই মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। যাদের জীবন জীবিকানির্ভর, তারাই আমাদের দেশ ও সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। আর যারা অর্থাত্ মোট জনসমষ্টির ক্ষুদ্র অংশ, তারা নানা উসিলায় অর্থবিত্ত লাভে সমাজের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী শ্রেণি। তাদের বিত্ত-সম্পদই তাদের জীবনকে প্রত্যক্ষ জীবিকাবিহীনভাবেও অতিবাহিত করার ক্ষমতা রাখে। তাদের যে জীবিকা নেই, তা নয়। তবে তাদের জীবিকা অনিরাপদ নয়, নিরাপদ এবং নিষ্কণ্টকই বটে। 

বিশ্ব আজ এক অমানবিক মারণব্যাধিতে আক্রান্ত। লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ঘাতক করোনাভাইরাস নামক ব্যাধিটি। বিশ্বের সর্বক্ষেত্রে সবল ও উন্নত দেশের মানুষেরা পর্যন্ত এই ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত এবং ওই সব উন্নত দেশেই মৃত্যুর হার এ যাবত্ সর্বাধিক। চিকিত্সা, স্বাস্থ্যসেবা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পন্ন দেশগুলো রোগ নিরাময়ে কার্যকর ভূমিকা নিয়ে মানুষের মৃত্যু রোধ করতে পারেনি। সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরও আমাদের ন্যায় দরিদ্র দেশের তুলনায় ওই সব উন্নত দেশে মানুষের মৃত্যুহার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বলে আমরা যে ভালো আছি তা কিন্তু নয়। আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলা হচ্ছে। ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো আমাদের সামগ্রিক অবস্থা। তাহলে যুদ্ধটা হবে কী দিয়ে, কিসের ওপর ভরসা করে! আমাদের স্বাস্থ্যসেবা যে পর্যায়ে হাবুডুবু খাচ্ছে তাতে তো আশার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের যাঁরা চিকিত্সা সেবা দেবেন অর্থাত্ চিকিত্সক, নার্সসহ অন্যরা তাঁরাই তো তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাঁরাও তো আক্রান্ত হয়ে কিংবা হওয়ার ভয়ে রণেভঙ্গ দেওয়ার দশায়। এর পরও আক্রান্তদের বাঁচাতে আমাদের চিকিত্সকরা মৃত্যুঝুঁকি উপেক্ষা করে অবিরাম চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। 

রোগ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে আক্রান্ত কিংবা সন্দেহভাজন আক্রান্তদের যে বেহাল দশায় পড়তে হচ্ছে, চিকিত্সাসেবা প্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রে সুদূরপরাহত এখন। মানুষের প্রতি মানুষের মানবিকতা এখন শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। করোনাভাইরাস অত্যন্ত অমানবিক এক ব্যাধি, যা আমাদের মানবিকতাকে প্রায় ধ্বংসের অভিমুখে ঠেলে দিয়েছে। পরিবারের মধ্যে একজন আক্রান্ত রোগীর পাশে স্বজনেরা পর্যন্ত ঘেঁষে না। কোনোক্রমে আপদ রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েই মাথার বোঝা হালকা করার মতো স্বস্তির শ্বাস ফেলে। পাশাপাশি এটুকু দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করতে পারার পর নিজেদের নিরাপদ ও সুরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আপদ বিদায়ে। ওদিকে হাসপাতালের কী অবস্থা, রোগীর যথাযথ চিকিত্সা হচ্ছে কি না সে সংবাদ জানার যেমন উপায় নেই, তেমনি ইচ্ছাও থাকে না স্বজনদের। আক্রান্ত রোগীকে কোনোভাবে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রাখা হয় দিনের পর দিন। ডাক্তার-নার্সরা নিজেদের নিরাপত্তায় আক্রান্ত রোগীর যথাযথ চিকিত্সাসেবা দেওয়ার বিপরীতে দূরত্ব বজায় রেখে কর্তব্য পালন করছেন। রোগটির প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। গৃহে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকাটাকে রোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক প্রতিষেধক পদ্ধতি বলা হচ্ছে। প্রায় দুই মাস সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সাধারণ ছুটির পর এখন সরকারি প্রজ্ঞাপনে ছুটি বাতিল করে মানুষকে জীবিকার অভিমুখে নামিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞরা সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন বটে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে শুরুর কথায় ফিরে যাওয়া। আমাদের সমষ্টিগত মানুষ জীবিকানির্ভর। জীবিকাবিহীন তাদের অনাহারে মরা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই। সরকার দুই মাস মানুষকে ঘরে আবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পর জীবিকাহীন মানুষের আর্থিক দুরবস্থা এতটাই প্রকট হয়ে পড়েছে যে সেটা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। রাষ্ট্র বা সরকার সমষ্টিগত জীবিকানির্ভর মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা দিতে পারেনি। সরকারি ত্রাণ, অর্থ সাহায্য সরকারি দলের ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং নেতা-পাতিনেতাদের পকেট পূর্ণ করেছে। সর্বসাধারণের কাছে সরকারি সহায়তা সিকি ভাগও পৌঁছেনি। তাহলে সরকার কোন নৈতিক অধিকারে মানুষদের দুই মাস গৃহবন্দি থাকতে বাধ্য করল!

বাংলায় প্রচলন আছে, ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’, আমাদের সরকারের অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে সে রকমই। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসের ১৭ তারিখ পর্যন্ত সরকার ছিল নির্বিকার এবং নির্লিপ্ত। রোগটি আমাদের দেশে আকাশে-বাতাসে ভেসে আসেনি। বহনযোগ্য রোগটি এসেছে দেশে আগত অগণিত প্রবাসীদের কল্যাণে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া থেকে লাখ লাখ মানুষ কোনোরূপ বাধাবিঘ্ন ছাড়া নির্বিঘ্নে বিমানবন্দর পেরিয়ে নিজ নিজ পরিবারে চলে গেল। তাদের ক্ষেত্রে যদি সরকার ওই সময়ে যথাযথ ভূমিকা বা ব্যবস্থা গ্রহণ করত, তাহলে দেশজুড়ে ব্যাধিটির বিস্তার ঘটতে পারত না। বিদেশফেরত প্রবাসীদের বিমানবন্দর থেকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গিয়ে রোগ নিরূপণের পর আক্রান্ত কিংবা আক্রান্ত নয়, সে অনুযায়ী তাদের পরিবারে ফিরে যাওয়ার এবং চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হলে আমাদের এখন জীবন-মৃত্যুর শঙ্কার মুখে পড়তে হতো না। 

আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা যে নাজুক সেটা নতুন করে বলার নেই। যদি ভালোই হতো, তাহলে আমাদের বিত্তবান শ্রেণি, শাসক শ্রেণি, এমনকি মধ্যবিত্তরা পর্যন্ত বিদেশে ছুটে যেত না চিকিত্সাসেবা নিতে। দেশেই চিকিত্সা করত, যদি দেশের চিকিৎসাসেবার ওপর আস্থা থাকত। আমাদের সরকারের নেতা, মন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, আমলারা অতীতে দেশে চিকিত্সা নিয়েছেন? কিংবা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন? তেমন নজির কিন্তু নেই। তাহলে দেশে চিকিত্সা কারা নিয়েছে? সরকারি হাসপাতালে শুধু চিকিত্সা নিয়েছে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত সামষ্টিক সাধারণ মানুষ। বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে অত্যধিক অর্থ ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা ক্রয়ে ব্যর্থ তারা। দেশে অত্যাধুনিক উন্নত বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে শ্রেফ বিত্তবানদের জন্য। যাতে তারা বিদেশের সমমানের চিকিত্সা দেশেই নিতে পারে, মাত্রাতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে। পুরো চিকিত্সাব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে বেনিয়া-ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার কারণে চিকিত্সাসেবা এখন পুরোপুরি মুনাফানির্ভর হয়ে পড়েছে। সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে ওষুধ নেই, নেই রোগ নিরূপণের কোনো ব্যবস্থাও। শুধু ডাক্তারদের চিকিৎসাপত্র নিয়ে রোগীদের ছুটতে হয় বেসরকারি ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো, রোগ শনাক্তে গাঁটের টাকা খরচ করে কিনতে হয় ওষুধও। সরকারি হাসপাতালে শুধু স্বল্পমূল্যে টিকিট কেটে চিকিত্সকের চিকিৎসাপত্রই পাওয়া যায়। অন্য কিছু নয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিট পাওয়া অনেকটা সরকারি চাকরি পাওয়ার ন্যায়। হাসপাতালে এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে সিটের ব্যবস্থা করে দেয়। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে সংঘবদ্ধ এই চক্রটির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত আমরা দেখিনি। কেননা এর অংশীদার ওপর-নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত। যাদের টাকার বিনিময়ে সিট নেওয়া সম্ভব হয় না তাদের দুর্দশার অন্ত নেই। এক প্রকার বিনা চিকিত্সায় তাদের ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া উপায় থাকে না। অথচ সরকার চিকিত্সা খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করলেও বিদ্যমান ব্যবস্থাধীনে তার সুফল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। 

করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের ক্ষেত্রেও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অভিনব পন্থায় বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ করে দিয়েছে। অপরদিকে একটি বেসরকারি সংস্থা কিটস্ উৎপাদন করে নামমাত্র মূল্যে সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে গত দুই মাস ধরে ধরনা দিয়েও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কারসাজিতে সেই কিট্স যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষার নামে সময় ক্ষেপণ করে দেশের বেসরকারি চিকিত্সাকেন্দ্রকে অবাধে মুনাফা লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছে। মধ্যবিত্তদের পর্যন্ত এতে চরম মাসুল দিতে হচ্ছে। নিম্নমধ্যবিত্ত বা দরিদ্র মানুষেরা তো করোনা পরীক্ষার ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারছে না, পারবেও না, তাদের আর্থিক দুরবস্থার কারণে। দেশের এই ক্রান্তিকালে মানবিকতাকে বিসর্জন দিয়ে মুনাফাবাজ বেনিয়া-ব্যবসায়ীরা মানুষের পকেট কেটে চলেছে ওই ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অবাধ সহায়তায়। 

সাধারণ ছুটি ৩১ মে প্রত্যাহারের পর দেশে আক্রান্ত ও মৃতের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলেছে। সরকার মনে হয় হাল ছেড়ে দিয়েছে। নয়তো সরকার কঠোরভাবে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে না কেন! করোনায় আক্রান্তের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। অতীতের ঢিলে-ঢালা লকডাউনে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। নয়তো অবস্থা দাঁড়াবে তথৈবচ। আমরা এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছি যে সচেতনতার কোনো বিকল্প আমাদের সামনে নেই। আমাদের দেশে আইন অমান্যের এক অদ্ভুত সংস্কৃতি বিরাজ করে আছে। আইন অমান্যকে বীরত্ব বলেই মনে করা হয়। ট্রাফিক আইনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি দেখা যায়, এতে সড়কে-মহাসড়কে দুর্ঘটনা নিত্য ঘটে অথচ বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকার যেন অসহায়। তাদের শাস্তির ক্ষেত্রে আইন অত্যন্ত শিথিল বলেই চালকেরা তাদের মর্জিমাফিক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে থাকে। জননিরাপত্তার কোনো তোয়াক্কাই করে না। 

শেষ এবং একমাত্র কথাটি হচ্ছে, করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক উদ্ভাবনের ওপরই নির্ভর করছে পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকা, না থাকা। আমরা সবাই মৃত্যুঝুঁকি মুক্ত নই। কে যে বাঁচব আর কে যে ওই রোগে আক্রান্ত হয়ে মরবে, তার কোনোই নিশ্চয়তা নেই। নিজেকে নিরাপদ রেখে জীবন ও জীবিকা সচল রাখা নিশ্চয় কঠিন কিন্তু অসম্ভব তো নয়। এ জন্য জনসংখ্যাধিক্য আমাদের দেশে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর কিন্তু মানবিকভাবে মানুষের সুরক্ষা যাতে নিশ্চিত করা যায়, সেদিকে যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে। এরই মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। তাদের শিক্ষাটা গ্রহণ করা যেমন সরকারের কর্তব্য, তেমনি দেশের জনগণেরও দায়িত্ব। 

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা