সম্প্রতি সংশোধিত বাংলাদেশ শ্রম আইনে নিশ্চিত করা শ্রমিকদের অধিকার কোনোভাবেই সীমিত বা খর্ব না করে শ্রম বিধিমালার সামঞ্জস্যপূর্ণ সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে সলিডারিটি সেন্টার আয়োজিত ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে সুপারিশ’ শীর্ষক অংশীজন সভায় বক্তারা এ আহ্বান জানান।
তারা বলেন, শ্রম বিধিমালা এমনভাবে সংশোধন করতে হবে, যাতে তা শ্রম আইনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়ন আরো কার্যকর করে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একেএম নাসিম। তিনি বলেন, শ্রম আইনের সর্বশেষ সংশোধনের পর শ্রম বিধিমালা হালনাগাদের উদ্যোগ বিদ্যমান অসামঞ্জস্য দূর করার পাশাপাশি নতুন অধিকার বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তার মতে, শ্রম বিধিমালা শ্রম আইন বাস্তবায়নে সহায়ক হওয়া উচিত, কোনোভাবেই তা সীমিত করার উপায় নয়।
মূল প্রবন্ধে শ্রম বিধিমালার ১৮টি বিষয়ে সংশোধনের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অস্থায়ী শ্রমিকের শ্রেণিবিন্যাস, ছাঁটাইয়ের পর নোটিশের পরিবর্তে অর্থ প্রদান, চাকরি-সংক্রান্ত নিবন্ধনে শ্রমিকদের প্রবেশাধিকার, বিভাগীয় তদন্তের সময়সীমা এবং গ্রীষ্মকালে নিরাপদ ঠান্ডা পানীয় জলের ব্যবস্থা।
এতে আরো বলা হয়, ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত নতুন অধিকারগুলো বাস্তবায়নে বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। এসব অধিকারের মধ্যে রয়েছে অনিরাপদ কাজ প্রত্যাখ্যানের অধিকার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সহিংসতা ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা এবং গৃহকর্মী ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিকদের শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা।
প্রবন্ধে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন ও নির্বাচন, অসৎ শ্রম অনুশীলনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা, সমমূল্যের কাজের জন্য সমান মজুরি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষের কার্যকর বাস্তবায়নে প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা জোরদারের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে শ্রম আইনের ১৮৮(৫) ধারার খসড়াগত অসামঞ্জস্যও তুলে ধরা হয়।
সংযোজনীতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো ‘তাপজনিত আঘাত ও অসুস্থতা প্রতিরোধ’ বিষয়ে একটি খসড়া বিধিমালা উপস্থাপন করা হয়। এতে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ, নির্ধারিত বিরতি, নিরাপদ পানীয় জল, ধাপে ধাপে কর্মপরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সুস্পষ্ট নির্দেশনার সুপারিশ করা হয়।
আলোচনায় বক্তারা শ্রম আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানো, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং শ্রমিকদের অধিকার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, শ্রম বিধিমালার বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে ধৈর্য ও অংশীজনভিত্তিক সংলাপ প্রয়োজন। তৃণমূলের শ্রমিক নেতা, আইনবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও সুস্থ শিল্প সম্পর্ককে রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স ট্যুনিয়ন বলেন, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত আইএলও রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য আরো বেশি সংলাপ এবং ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ কমিটিতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতামতের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না।





