বর্ষা এলেই যেন একই আতঙ্ক ফিরে আসে ভবদহবাসীর জীবনে। বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার দুঃসহ অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়ানো মানুষ এবার আশায় বুক বেঁধেছিলেন—নদী খনন আর ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্প হয়তো তাদের মুক্তি দেবে। কিন্তু সে আশায় বালি ঢেলে দিয়েছে চলতি জুলাইয়ের টানা বর্ষণ ও নিম্নচাপ।
যশোরের ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ৫০টি গ্রাম আবারও পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে হাজার হাজার মাছের ঘের, পুকুর, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রায় এক লাখ মানুষ।
সরেজমিন দেখা গেছে, অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলমগ্ন। বসতবাড়ির আঙিনা ছাড়িয়ে অনেক ঘরে এখন হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবন।
মনিরামপুরের হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা প্রণব বিশ্বাস বলেন, ‘জুলাইয়ের মাঝারি ও ভারি বৃষ্টির পর থেকেই বিলের পানি দ্রুত বাড়ছে। নদী খননের কাজ চললেও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ভবদহের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের অক্টোবরে। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান সুফল মেলেনি।
প্রকল্পের আওতায় হরিহর, হরি, তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর প্রায় ৮১.৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন করা হচ্ছে। হরি ও তেলিগাতি নদীর ২০ কিলোমিটার এবং টেকা নদীর ৭ কিলোমিটার অংশে খনন শেষ হলেও কাটেনি সংকট।
ভবদহ স্লুইসগেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গেটের কপাটগুলো সচল নয়। সেচ দিতে বর্তমানে চারটি পাওয়ার পাম্প চালু রয়েছে, আরো পাঁচটি স্থাপনের কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, পাম্প দিয়ে এত বিশাল এলাকার পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়।
জলাবদ্ধতায় অভয়নগরের ডহর মশিয়াহাটি, ডুমুরতলা, আন্দা, বলারাবাদ, কপালিয়া; মনিরামপুরের আসানগর, কুশখালী, নেবুগাতি, কুলটিয়া, পাড়িয়ালীসহ অন্তত ৩০টি গ্রাম এবং কেশবপুরের কাঠবাঁধাল, আড়ুয়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থাও। ডুবে গেছে ডুমুরতলা-বেদভিটা, বলারাবাদ ও আন্দা-ডুমুরতলা সড়ক। মশিয়াহাটি-সুন্দলী সড়কের অন্তত ১০টি স্থানে পানি উঠে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
অভয়নগরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সত্যজিৎ বিশ্বাস আফসোস করে বলেন, ‘প্রতিবছর একই দুর্ভোগ, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আজও মিলল না।’
অন্যদিকে মনিরামপুরের হরিদাশকাট গ্রামের রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল জানান, ঘরবাড়ি, রাস্তা ও মাঠ ডুবে যাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
জানা গেছে, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরার ৫৪টি বিলের পানি ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থাপনা) বন্ধ থাকায় নদীগুলোতে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া পানি নিষ্কাশনের অন্যতম পথ ‘আমডাঙ্গা খাল’ সংস্কার না হওয়া এবং খালের ওপর নির্মিত ত্রুটিপূর্ণ সেতুকে পানি প্রবাহের বড় বাধা হিসেবে দুষছেন স্থানীয়রা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের দাবি, ইতিমধ্যে মাছের ঘের ও ফসলের অন্তত ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ জানান, আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, নদীর পলি অপসারণ, টিআরএম চালু এবং পানিবন্দি মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার ৪ দফা দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত দাবি আদায় না হলে কঠোর আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন তিনি।
পরিস্থিতি নিয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক বলেন, ‘পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকল্প যেন দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতত স্থানীয়দের দুর্ভোগ কমাতে বাঁশের সাঁকো তৈরি এবং জরুরি ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’






