টানা বর্ষণ ও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে পাবনা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক, অলিগলি ও বাসাবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।
জানা গেছে, জলাবদ্ধতার কারণে শহরের বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। অনেক শিক্ষার্থীকে পানি মাড়িয়ে স্কুল-কলেজে যেতে দেখা গেছে। এছাড়া স্থির পানি জমে থাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সোমবার (১৩জুলাই) সকালে সরেজমিনে পৌরসভার শালগাড়িয়া, রাধানগর, দিলালপুর, নারায়ণপুর, আরিফপুর, মুজাহিদ ক্লাব আতাইকুলা রোড, গোবিন্দা, কালাচাঁদপাড়া, নূরপুর, মনসুরাবাদ আবাসিক এলাকা, ছাতিয়ানী, বাজিতপুর রোড বাইলেন বাবলাতলা, নয়নামতি, যুগিপাড়া পাড়া, হাসপাতাল রোড, মহিষের ডিপো, অনন্ত পাড়ার কলোনি, রুপকথা সিনেমা হল রোড, বিনা বানী সিনেমা হল রোড, খাদিজাতুল কোবরা মহিলা মাদরাসা রোড, অনন্ত এলাকার আবুল কাশেম মহিলা মাদরাসা পাড়াসহ বেশ কিছু সড়ক বর্ষা মৌসুমজুড়েই পানির নিচে ডুবে আছে। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি জমে রয়েছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় সেই পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে প্রতিবার বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। পৌরবাসীর অভিযোগ ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে বসবাস করলেও ন্যুনতম নাগরিক সেবা পাওয়া যায় না।

শালগাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই আমাদের এলাকায় পানি জমে যায়। এবার টানা বৃষ্টিতে ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে চরম কষ্টে আছি।’ রাধানগরের এক ব্যবসায়ী সবুজ হোসেন বলেন, ‘দোকানের সামনে পানি জমে থাকায় ক্রেতা আসছে না। ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।’
আরিফপুর এলাকার বাসিন্দা খোকন হোসেন বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু পরিমাণ পানি জমে। বাড়ির মধ্যে পানি ডুকে গেছে। জরুরি কাজের জন্য বাহিরে বের হতে পারছি না। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও নেই ড্যানেজ ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন পৌরসভার মেয়র না থাকায় ভোগান্তি দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে।
কালাচাঁদপাড়া মহল্লার বাসিন্দা কল্পনা আক্তার বলেন, আজ ৫ দিন হলে ঘরের খাটের নিচে পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি৷ রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বাড়ির কাজ পর্যন্ত করতে পারছি না। ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা চলছে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। পানিতে চরম ময়লা আবর্জনা হওয়াতে ব্যাপক দুর্ঘন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বিকেল হতে হতেই মশার উপদ্রব বাড়ছে। পানি বাহিত রোগ ও ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার আতঙ্কে দিন যাচ্ছে।
মুজাহিদ ক্লাব এলাকার বাসিন্দা মো: রমজান আলী বলেন, ‘মুজাহিদ ক্লাব এলাকা থেকে বুলবুল কলেজ পর্যন্ত সড়কে বর্তমানে নৌকা ছাড়া যাওয়ার উপায় নাই। অর্ধ মানুষ পরিমাণ পানি জমা হয়েছে। অটোরিকশা ও অটোভ্যানের যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ছোট বেলা থেকেই দেখতেছি এই রোডের এমন বেহালদশা।’
মুজাহিদ ক্লাব এলাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ী রাসেল হোসেন বলেন, ‘পানি নিয়ে আমার সবই সমস্যা। পাবনাতে বৃষ্টি হলে কোথাও পানি না উঠলে এই মুজাহিদ ক্লাব আতাইকুলার সড়কে পানি উঠবেই। পানির মধ্যে কাস্টমার আসেনা তবুও দোকানে আসি দোকানে জমে থাকা পানি ফেলে দিতে। তবে আশা করছি চলমান ড্রেনের কাজ সম্পন্ন হলে এ থেকে রেহাই পাব।’
পাবনার লতিফ গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার অচিন্ত কুমার ঘোষ বলেন, ‘পাবনা পৌর এলাকার সব পানি নিষ্কাশন হয় মূলত দোহারপাড়া ও আরিফপুর সংলগ্ন বুড়িদাহ কালভার্টের নিচের খাল দিয়ে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের ওই খালটি দখল দূষণে সরু হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত গতিতে বের হতে পারছে না। তাই দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল দখলমুক্ত ও খনন করে প্রসার করতে হবে। এ জন্য পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক নাজমুল হক জানান, গত ৪ জুলাই থেকে ১২ জুলাই (রবিবার) পর্যন্ত পাবনা জেলায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৬৬ মিলিমিটার। সামনের দিনগুলোতে বৃষ্টিপাত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে পাবনা পৌর প্রশাসক খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জলাবদ্ধ এলাকাগুলো সরেজমিনে গিয়ে দেখছি। কোথায় কি ব্যবস্থা নিতে হবে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা চেষ্টা করি সব সময় পরিষ্কার রাখার। তারপরও কিছু ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার ও কিছু ড্রেন নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। আশা করছি দ্রুত সমাধান হবে।’
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, ‘সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ইছামতি নদী ও সংযোগ খাল খনন প্রকল্পের কাজ চলমান। নদী ও সংযোগ খাল গুলো খনন হলে পাবনা পৌরসভা সহ জেলায় আর জলাবদ্ধতা থাকবে না।’




