কক্সবাজারের ভয়াবহ বন্যা ও ভারি বর্ষণের ফলে পাহাড় ধ্বস ও পানিতে ডুবে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৭ শিশুসহ ৮ জনের। তাদের মধ্যে ২ শিশুকন্যা, ৫ জন ছেলে ও অপরজন ২০ বছরের যুবক। এছাড়াও বানের পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ থাকা সজিব জলদাস নামে ১২ বছরের শিশুর লাশ ২৩ ঘন্টা পর আজ রবিবার বিকেল ৩ টায় উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল।
এছাড়া এক সপ্তাহের লাগাতার ভারি বর্ষণ ও পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদীতে প্রবল বেগে নেমে আসা উজানের ঢলের পানিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা। এই ৩ উপজেলার এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে কোমর থেকে গলা পর্যন্ত পানি উঠেনি। যেসব এলাকা থেকে পানি নেমে যাচ্ছে সেখানে ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন।
গতকাল শনিবার থেকে বৃষ্টিপাত কমে আসায় পানিও কমতে থাকে মাতামুহুরী নদীতে। এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে পানিও নেমে যেতে দেখা যায়। কিন্তু আজ রবিবার ভোররাত থেকে দুপুর পর্যন্ত ফের অতি ভারি বর্ষণ শুরু হলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে। অবশ্য বিকেলের পর থেকে তেমন বৃষ্টিপাত হয়নি চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায়। একদিকে বানের পানির সাথে যুদ্ধ এবং অপরদিকে এই পরিস্থিতিতে স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
সবশেষ আজ রবিবার বিকেলে চকরিয়ার বরইতলীতে বাড়ির উঠানে মায়ের সামনেই বানের স্রোতের পানিতে তলিয়ে গিয়ে মারা যান মোহাম্মদ আতাউল্লাহ (২০) নামের এক যুবক। তিনি বরইতলী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিবাজারস্থ পূর্ব ছড়াকূলের ফতেহ আলী সিকদার পাড়ার নেসার আহমদের পুত্র। বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. ছালেকুজ্জামান এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোররাতে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের মোহছেনিয়া কাটা পাহাড়ি গ্রামে ঘুমন্ত অবস্থায় আস্ত পাহাড়ের মাটি ধ্বসে পড়ে বসতবাড়ির ওপর। এ সময় মাটি চাপা পড়ে মারা যায় ২ শিশু।
তারা হলো, মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে ও বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমি আক্তার (১৫) এবং আবদুল মজিদের ছেলে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। তারা সম্পর্কে আপন চাচাতো-জেঠাতো ভাই-বোন।
এর আগে গত ৬ জুলাই সোমবার সন্ধ্যার দিকে পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খলিফা মুড়ার আলিম্যার ঝিরি এলাকায় ভারি বর্ষণের সময় বসতবাড়ির ওপর পাহাড় ধ্বসে মারা যায় ওই এলাকার কলিম উল্লাহর ৭ বছরের শিশুসন্তান মো. মিনহাজ উদ্দিন। এ সময় আহত হন ওই শিশুর নানীও।
বসতবাড়ির ভেতর ঢুকে পড়া বানের পানিতে ডুবে গত ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের মাইজ কাকারা গ্রামে মারা যান সুলতান আহমদের আড়াই বছরের ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিম।
এদিকে বাড়ির চালা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গত ১০ জুলাই (শুক্রবার) সকাল আটটার দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান খুঁজতে নৌকায় চেপে অন্যত্র যাচ্ছিল চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেক ও তার পরিবার সদস্যরা। কিন্তু ঝড়ো বাতাসের কবলে পড়ে সেই নৌকা ডুবে গেলে তিন কন্যা শিশু হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২), জেরিন মনি (৮) আর শাওরিন মনি (৬) পানিতে বানের পানিতে তলিয়ে যান। এ সময় ছোট দুই শিশুকন্যাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও প্রায় ৬ ঘন্টা পর চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এসে নিখোঁজ হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণার লাশ উদ্ধার করে।
গত শনিবার রাতে পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলির পাড়ার প্রবাসী নাছির উদ্দিনের বাড়িতে পানিতে ডুবে মারা যায় ১৯ মাসের শিশুপুত্র মুশফিকুর রহিম। পরিবারটি জানিয়েছে-বন্যায় প্রবাসী নাছিরের বাড়ির ভেতরও পানি ঢুকে পড়ে। আর উঠানেও ছিল কোমর সমান পানি। একমাত্র শিশুসন্তান মুশফিককে বাড়ির ভেতর রেখে কাজ করছিলেন নাছিরের স্ত্রী। কিন্তু সবার অগোচরে ওই শিশু পানিতে পড়ে স্রোতে ভেসে যায় এবং ১২০ ফুট দূরে লাশ ভাসতে থাকে।
এদিকে গতকাল শনিবার বিকেল তিনটার দিকে চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খোঁজাখালী জলদাস পাড়ায় বাড়ির সামনে বানের পানির স্রোতে ভেসে যায় তিন শিশু। তন্মধ্যে দুই শিশু জীবিত ফিরতে পারলেও তখন থেকেই নিখোঁজ ছিল কুতুবদিয়া উপজেলার কুমিরা ছড়া জলদাস পাড়ার তুফান জলদাসের ১২ বছরের ছেলে সজিব জলদাস। সে ছোটকাল থেকেই মামার বাড়ি চকরিয়ার কৈয়ারবিল জলদাস পাড়ায় বড় হচ্ছিল।
চকরিয়া সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা সেলিম উদ্দিন কালের কন্ঠকে বলেন, ‘শিশু সজিব জলদাস নিখোঁজ থাকার খবর পেয়ে তাত্ক্ষণিক ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অকুস্থলে যায়। কিন্তু ছড়াখালে বানের পানির স্রোত তীব্র থাকায় ফেরত আসে। তবে চট্টগ্রাম থেকে আসা ডুবুরি দল রবিবার দুপুর থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ব্যাপক তল্লাশী চালিয়ে ২৩ ঘন্টা পর মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।’
চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গত একসপ্তাহের ব্যবধানে একে একে সাতজন শিশু ও একজন যুবকসহ আটজন পাহাড় ধ্বস, পানিতে ডুবে ও তলিয়ে গিয়ে মারা যাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কালের কণ্ঠকে।




