‘স্বামী-স্ত্রী মিলে শ্রমিকের কাজ করে অনেক কষ্টে ১২ লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ আর একটি ঘর নির্মাণের স্বপ্ন ছিল। ১০ শতাংশ লাভের আশায় সেই টাকা আমানত রাখছিলাম সমিতিতে। এখন জানতে পারলাম সমিতির পরিচালক উধাও। মনে হচ্ছে জীবনের সব পরিশ্রম মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।’
কথাগুলো বলছিলেন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের হরিণা গ্রামের বাসিন্দা রিনা বিশ্বাস। তার মতো ইউনিয়নের প্রায় ৪০০ গ্রাহক আমানত রেখেছিলেন হরিণা গ্রামে অবস্থিত প্রত্যয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতিতে। সম্প্রতি সমিতির পরিচালক প্রভাসিন্ধু বিশ্বাস সেন্টু চার শতাধিক গ্রাহকের প্রায় দুই কোটি টাকা নিয়ে আত্মগোপন করেছেন বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা সমিতির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গ্রাহকদের চাপের মুখে সমিতির পরিচালকের পরিবারের সদস্য ও কর্মচারীরা কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ১০ থেকে ১২ শতাংশ লাভের আশ্বাসে এলাকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আমানত ও সঞ্চয় সংগ্রহ করে আসছিল সমিতিটি। গত ৪ জুলাই তারা জানতে পারেন, পরিচালক প্রভাসিন্ধু বিশ্বাস সেন্টু সমিতির বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এর পর থেকেই কার্যালয়ে তালা ঝুলছে এবং পরিচালক কিংবা দায়িত্বশীল কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
গত শুক্রবার (১০ জুলাই) সরেজমিন সমিতির কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায় কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। এ সময় কথা হয় সেখানে গ্রাহক দাবি করা কয়েকজনের সঙ্গে। এ সময় প্রভাতী বিশ্বাস নামের একজনের দাবি, তিনি ১০ শতাংশ লাভের আশায় এককালীন আট লাখ ২০ হাজার টাকা জমা রেখেছিলেন। কয়েক মাস ধরে টাকা ফেরত চাইলেও নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। পরে জানতে পারেন, পরিচালক উধাও হয়ে গেছেন।
সাবিত্রী বিশ্বাস নামের একজন বলেন, ‘মেয়ের বিয়ের জন্য দুই লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। এখন সেই টাকাই নেই। মেয়ের বিয়ে কীভাবে দেব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
সমিতির হিসাবরক্ষক মধুসূদন মণ্ডল বলেন, ‘পরিচালক সেন্টু শার্শায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলে বের হন। এর পর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হয়ে আমার কাছেই জবাব চাইছেন, কিন্তু আমিও তার (সেন্টু) অবস্থান জানি না।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য দীপক কুমার রায় বলেন, ‘আমি অনেককেই ওই সমিতিতে টাকা জমা রাখতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু বেশি লাভের আশায় অনেকেই আমার কথা শোনেনি। এখন তারা সর্বস্ব হারিয়ে দিশাহারা। এ ধরনের ঘটনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার শিক্ষা নিতে হবে।’
এ ব্যাপারে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রশাসক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হবে।’
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার বলেন, ‘গ্রাহকরা আমাদের কাছে এসেছেন। তবে সমিতির সবশেষ অডিট প্রতিবেদনে অভিযোগকারী অনেক গ্রাহকের নাম পাওয়া যায়নি। যেহেতু সমিতিটির লাইসেন্স জেলা সমবায় কার্যালয় থেকে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি ইতোমধ্যে জেলা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্বে) ও সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) মাহির দায়ান আমিন বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’





