নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা স্টেশনে ছিনতাইকারীদের হামলায় নিহত বৃদ্ধা পরিচ্ছন্নতাকর্মী ববি বেগমের পরিচয় পাওয়া গেছে। ২৫ বছর ধরে যাকে স্থানীয় মানুষ ঘরবাড়ি ও স্বজনহীন বলে জানত, তার আসল নাম ওয়াহিদা বেগম (৭০)। ওয়াহিদা বেগম বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নাড়ুয়ামালা ইউনিয়নের শাখাটিয়া এলাকার মৃত রহিম উদ্দিনের মেয়ে। তারা আট ভাইবোন সবাই ছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী। তার দুই ভাই মারা গেছেন। বর্তমানে দুই ভাই ও তিন বোন জীবিত আছেন।
২৫ বছর আগে তার স্বামী ও একমাত্র কন্যাসন্তানের মৃত্যু হয়। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এরপর তিন বছর ধরে স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও পরিবারের কাছে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষে পরিণত হন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৫ বছর আগে এক বিকেলে ট্রেনে করে তিনি রায়পুরার মেথিকান্দা স্টেশনে এসে পৌঁছান। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজের পরিচয় দিতে পারেননি। স্থানীয়রা তার নাম দেন ‘ববি বেগম’। এরপর থেকেই তিনি ওই নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। স্টেশনের শৌচাগার ও প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করতেন তিনি। যাত্রীদের দেওয়া পাঁচ-দশ টাকা আর সামান্য সহায়তায় চলত তার জীবন। অতি কষ্টে তিলে তিলে তিনি প্রায় ২০ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। কিন্তু সেই সঞ্চিত টাকার লোভেই গত ৪ জুলাই স্টেশনের একটি কক্ষে ঢুকে ছিনতাইকারীরা তাকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং তার সব টাকা লুট করে নেয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে আবার স্টেশনেই ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর ৭ জুলাই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে ববির মৃত্যুর এবং তার ওপর নির্মম হামলার খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ফেসবুকে প্রকাশিত তার ছবি দেখেই ওয়াহিদাকে চিনতে পারেন স্বজনরা।
মৃত ওয়াহিদা বেগমের ছোট বোনের জামাতা সৈকত জানান, ফেসবুকে এক বৃদ্ধা বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে পিটিয়ে হত্যা ও তার সঞ্চিত টাকা লুটের একটি পোস্ট দেখেন তিনি। পরে সেটি তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুনকে দেখালে তিনি ছবিটি দেখে নিজের খালাকে শনাক্ত করেন। এরপর পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিশ্চিত হন যে নিহত নারীই তাদের দীর্ঘদিনের নিখোঁজ স্বজন ওয়াহিদা বেগম।
শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে সৈকত রায়পুরার নুরপুর কবরস্থানে এসে ওয়াহিদা বেগমের কবর জিয়ারত করেন। এ সময় তার সঙ্গে ওয়াহিদার একটি পুরনো ছবি ছিল।
ববি বেগম হত্যাকাণ্ডের দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে সরব হয়ে ওঠে রায়পুরাসহ সারা দেশের মানুষ। এ ঘটনায় ভৈরব রেলওয়ে থানা একটি মামলা করা হয়। শুক্রবার র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে রায়পুরা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর এলাকা থেকে এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।





