পাবনার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা বড়াল নদ এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে। দখল ও দূষণের কবলে পড়ে নদটি এর অস্তিত্ব হারানোর মুখে পড়েছে। দ্রুত খনন করে নদটিকে এর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি নদপারের মানুষের।
সম্প্রতি সরেজমিনে বড়াল নদের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, এর দুই পাশের একটি বড় অংশ প্রভাবশালীদের দখলে। সেখানে গড়ে উঠেছে দোকানঘর ও বসতবাড়ি। যেটুকু টিকে আছে, তাও পানিশূন্য। সেখানে চাষ করা হয়েছে ধান।
জেলার চাটমোহরে নদের অংশে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার বড় অংশই এখন ময়লার ভাগাড়। পৌরসভার বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোঁরা, বেসরকারি ক্লিনিক ও বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলা হয় শুকিয়ে যাওয়া বড়ালে। এখানেও নদের দুই পাড় দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা স্থাপনা। শুকনো নদের বুকে জমেছে কচুরিপানা, যা মশা উৎপাদনের কেন্দ্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর চারঘাটের পদ্মা নদীতে উৎপত্তি বড়াল নদের। ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী মিশেছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যমুনা নদীতে। গত শতাব্দির আশির দশকে চারঘাটে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদের উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এতে অস্তিত্ব হারাতে থাকে প্রমত্তা বড়াল। এরপর বাগাতিপাড়ার আটঘরি ও চাটমোহরের দহপাড়ায় আরো দুটি স্লুইস গেট নির্মাণ করে পাউবো। এ ছাড়া বড়ালের চাটমোহর অংশে তিনটি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ শুরু করে চাটমোহর উপজেলা পরিষদ।
২০০৮ সালে চাটমোহরে শুরু হয় বড়াল রক্ষা আন্দোলন। গঠিত হয় কমিটি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে চাটমোহরের তিনটি ক্রসবাঁধ ও দহপাড়া স্লুইস গেট অপসারণ করে প্রশাসন। কিন্তু বড়াল খনন কিংবা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বড়ালের তলদেশে এখন বিভিন্ন ফসলের যেমন আবাদ হচ্ছে। আবার ময়লা-আবর্জনাসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে বড়ালে।
পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, বড়ালের বর্তমান অবস্থার পেছনে রয়েছে সরকারি নদী শাসনের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও মৃতপ্রায় বড়ালের বুক দখলের উৎসব। নদের পাড়ে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থাপনা যা এক সময়ের খরস্রোতা বড়ালকে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
বাপা পাবনা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাড. তোসলিম হাসান সুমন বলেন, বড়াল নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে যত দ্রুত সম্ভব জলপ্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়ন ও ভারসাম্য রক্ষার দাবি জানাচ্ছি।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা স্থানীয় এনজিও টিএসপির পরিচালক সরকার মোহাম্মদ আলি বলেন, সিএস রেকর্ড অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ ও দ্রুত খনন করে নদকে এর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।
বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্যসচিব এস এম মিজানুর রহমান বলেন, রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদের ওপর স্লুইসগেট ভেঙে বড় করে পরিবেশবান্ধব সেতু নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া এর ৪৬ কিলোমিটার ভাটিতে নাটোরের আটঘরিতে একটি স্লুইস গেট ভেঙে সেখানেও বড় সেতু নির্মাণ করতে হবে। আটঘরি থেকে বনপাড়া পর্যন্ত নদের ১৮ কিলোমিটার অংশ দখলমুক্ত করতে হবে। আইডাব্লিউএমের সুপারিশ অনুযায়ী রাজশাহীর চারঘাট থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি পর্যন্ত ছোট ছোট সেতু ও কালভার্ট ভেঙে ফেলতে হবে এবং নদ দ্রুত পুনখনন করলে ৫০ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি পূরণ হবে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, বড়াল নদ পুনখননের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে। এর আলোকে দ্রুত নদ পুনখনন করা হবে।




