বন্যার পানি নেমে গেছে। কিন্তু দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ার গ্রামীণ জনপদে রেখে গেছে গভীর ক্ষত। কোথাও সড়কের অর্ধেক অংশ নদীগর্ভে বিলীন, কোথাও ধসে পড়েছে কালভার্ট। আবার কোথাও পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ।
সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় উপজেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর অধীন সড়ক নেটওয়ার্ক।
এলজিইডির সবশেষ প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উপজেলাজুড়ে ৬২টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১ কিলোমিটার। এ ছাড়া ৮টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ টাকার অংকে প্রায় ২৮ কোটি।
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, যেসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত, সেসব সড়ক এখন দুর্ঘটনার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। কোথাও ইট বিছিয়ে মানুষ চলাচল করছে, কোথাও বাঁশের সাঁকোই একমাত্র ভরসা। বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী, কৃষক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী সবাই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
কুসুমপুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আবদুল করিম বলেন, ‘বন্যার সময় সড়ক ভেঙে যাওয়ার পর এখনো কোনো স্থায়ী সংস্কার হয়নি। অ্যাম্বুলেন্স দূরের কথা, সিএনজিও ঢুকতে পারে না। অসুস্থ মানুষকে কাঁধে করে নিতে হয়েছে।’
আশিয়া ইউনিয়নের গৃহবধূ রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে স্কুলে যায়। রাস্তার মাঝখানে বড় বড় গর্ত। প্রতিদিন ভয় নিয়ে ওকে স্কুলে পাঠাই।’
কচুয়াই ইউনিয়নের কৃষক আবদুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারছি না। রাস্তার কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এতে লাভের বদলে লোকসান গুণতে হচ্ছে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাজারে পণ্য আনা-নেওয়া ব্যাহত হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষকেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার করা না হলে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা দ্রুত বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে স্থায়ী সংস্কার কাজ শুরু করার দাবি জানান।
এলজিইডি কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর বিস্তারিত তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে সব ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে বাজারে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহন খরচ বেড়েছে, সময়ও লাগছে দ্বিগুণ। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক।
স্থানীয় প্রকৌশলী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ঘটনা বাড়ছে। অথচ অনেক গ্রামীণ সড়ক এখনো পুরনো নকশায় নির্মিত। ফলে প্রতিবছর একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তারা ভবিষ্যতের জন্য উঁচু বাঁধ, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু-সহনশীল নকশায় সড়ক নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তন্ময় নাথ বলেন, ‘বন্যায় ৬২টি সড়ক ও ৮টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৮ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।’
উপজেলা প্রকৌশলী আরো বলেন, ‘ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। যেসব স্থানে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বরাদ্দ পেলেই স্থায়ী সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে।’