মাটির ঘরটি ছিল একমাত্র আশ্রয়। টানা বৃষ্টিতে ঘরটির দেয়ালের বড় অংশই ধসে পড়েছে। চালের ওপর টাঙানো পলিথিন বেয়ে ঘরের ভেতর পড়ছে টপটপ বৃষ্টির পানি। সেই পানি আটকাতে ব্যবহার করতে হচ্ছে হাড়ি-পাতিল।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস আট সদস্যের পরিবারটির। গৃহকর্তা দিল মোহাম্মদ, তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম। দিল মোহাম্মদ শারীরিকভাবে অচলপ্রায়, আর রোকেয়ার এক চোখ নষ্ট। সঙ্গে তাদের ছয় মেয়ে। চার মেয়ে পড়াশোনা করে। তাদের পড়ার টেবিল দূরে থাক, বর্ষা মৌসুমে ঘরের ভেতর দাঁড়ানোর মতো শুকনো জায়গা থাকে না। বইপত্র রাখা হয় পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বস্তার ওপর।
পরিবারটির বসবাস কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম জাউচপাড়া এলাকায়। সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।
স্থানীয়রা জানায়, সম্প্রতি ভারি বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে ঘরটির মাটির দেয়ালের বড় অংশ ধসে পড়েছে। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। যেকোনো সময় পুরো ঘরটি ভেঙে পড়তে পারে। সেই আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দিল মোহাম্মদ আগে দিনমজুরের কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাও করতে পারেন না। অন্যদিকে স্ত্রী রোকেয়া বেগম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। দুই মেয়ে পরিবারের অসম্মতিতে গোপনে বিয়ে করলেও এখন থাকছেন একসঙ্গে। ফলে ছয় মেয়ের খাবার, পোশাক ও লেখাপড়ার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবারটির অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা গর্জনিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদরাসায় পড়াশোনা করে। সে বলে, ‘আমার মা-বাবা দুজনই অচলপ্রায়। আমাদের খাওয়া, পড়াশোনা ও থাকার ঘর ভেঙে গেছে। আমরা এখন অসহায়। আমাদের দেখার কেউ নেই। সবার সহযোগিতা চাই।’
দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘আগে দিনমজুরের কাজ করতাম। পরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর আগের মতো কাজ করতে পারি না। হাঁটাচলাও করতে কষ্ট হয়। ছয় মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আগে মানুষের ক্ষেত-খামারে কাজ করে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা মজুরি পেতাম। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন করেও প্রতি মাসে কিছু আয় হতো। এসব আয়ের টাকা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে একমাত্র ঘরটির মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে। ছয় মেয়েকে নিয়ে এখন কোথায় থাকব, কিভাবে সংসার চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
গর্জনিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মো. শহীদুল্লাহ শহীদ বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে পরিবারটির মাটির দেয়ালের ঘর ভেঙে গেছে। বাবা-মা দুজনই প্রায় অচল। তাদের মেয়েরা পড়াশোনা করতে চায়। সরকারের সহযোগিতা ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
স্থানীয় সমাজকর্মী মুহিবুল্লাহ চৌধুরী জিল্লু বলেন, ‘পরিবারটির জন্য দ্রুত একটি বাসযোগ্য ঘর প্রয়োজন। পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়া দরকার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘কালের কণ্ঠের রামু প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিবারটির বিষয়ে জানতে পেরেছি। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ভাতা, বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং মেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’




