কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ‘মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের’ প্রধান শিক্ষক মো. মুক্তল হোসেনের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
রবিবার (৫ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টায় বিদ্যালয়ের সামনে ওই মানববন্ধন করেন তারা। পরে মুক্তল মাস্টারের অপসারণসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।
মানববন্ধনে স্থানীয়রা জানান, গত বুধবার (১ জুলাই) রাতে উপজেলার বল্লভপুর গ্রামে এক প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে প্রবেশ করেন মুক্তল মাস্টার। এ নিয়ে বাড়ির লোকজন মুক্তল মাস্টার ঘরে প্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসীর স্ত্রী কলাপসেবল গেট বন্ধ করে জানান, ঘরে কেউ নেই। পরে গ্রামবাসী বাড়ি ঘেরাও করে ফেললে প্রধান শিক্ষক মুক্তল মাস্টার রান্নাঘরের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসী তাকে আটক করেন এবং গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পৌঁছার পূর্বেই স্থানীয় কয়েকজন তাকে চিকিৎসা দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেছে বলে জানান।
আন্দোলনকারীরা তাকে (প্রধান শিক্ষককে) ওই প্রবাসীর ঘরে আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়ার অভিযোগ তুলেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ওই নারীর প্রবাসী স্বামী ফেসবুকে ভিডিও লাইভে জানান, তার স্ত্রী অসুস্থ থাকায়, তিনি তার ধর্মভাই মুক্তল মাস্টারকে তার স্ত্রীর খোঁজখবর নিতে বাড়ি পাঠিয়েছেন। ওখানের কিছু লোকজন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার স্ত্রী এবং মুক্তল মাস্টারকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালায়।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন স্থানীয় শাকতলা মসজিদের ইমাম মাওলানা আলী আকবর, মো. জহিরল ইসলাম, মো. মোবারক হোসেন, মো. রিয়াদ হোসেন, মো. সজিব, জামাল প্রমুখ।
মানববন্ধনে বক্তারা আরো বলেন, গত ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুক্তল মাস্টারের বিরুদ্ধে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এলাকাবাসী প্রধান শিক্ষক মুক্তল মাস্টারকে তার অফিস কক্ষে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। দিনব্যাপী সার্কেল এএসপি ও ওসির নেতৃত্বে ওই শিক্ষককে অবরুদ্ধ থেকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক পুলিশ এনে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এ সময় কয়েকজন পুলিশসহ অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হন। বিক্ষোভকারীরা ২টি মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেয়।
ওইদিন পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশের গাড়ি ভাংচুর, পুলিশের অস্ত্র খোয়া গেলে ২ শতাধিক গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২২ নিরীহ গ্রামবাসী ও বাজারের ব্যাবসায়ীকে আটক করেন। মামলা-আতঙ্কে প্রায় দেড় মাস গ্রামে পুরুষশূন্য ছিল। গ্রেপ্তার হওয়া ২২ জন নিরপরাধী হয়েও দেড় মাস জেল খাটতে হয়েছে। এখনো ওই মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। একমাত্র মুক্তল মাস্টারের অনৈতিক কাজের কারণে।
ওই ঘটনার পর ভিক্টিম ছাত্রীর বাবা তাঁর মেয়েকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মুক্তল মাস্টারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করে। রাজনৈতিক প্রভাবে মুক্তল মাস্টার স্বীয় পদে বহাল হন। শর্ত ছিল মুক্তল মাস্টারের বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারির আর কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে সে নিয়ম মাফিক চাকরিচ্যুত হবেন। এর আগেও তিতাস উপজেলার একটি স্কুল এবং দেবীদ্বার বারুর উচ্চ বিদ্যালয়ে একই ঘটনা সৃষ্টির দায়ে তাকে স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হয়। সর্বশেষ ঘটনার ৪ দিন অতিবাহিত হলেও মুক্তল মাস্টারকে গ্রেপ্তার কিংবা তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমরা মুক্তল মাস্টারের অপসারণই নয়, প্রশাসনের নিকট তার কঠিন শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
ইউপি সদস্য মো. জাকির হোসেন মোল্লা, শিউলি আক্তারসহ স্থানীয়রা জানান, উপজেলার ঊজানীজোড়া গ্রামের খন্দকার বাড়ির এক প্রবাসীর স্ত্রী (৩০) তার এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তান নিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামের মোল্লা বাড়ির জলিল মোল্লার ঘরে মাসিক ১৫ টাকায় ভাড়ায় বসবাস করে আসছিলেন। ওই বাড়িতে থেকে প্রবাসীর স্ত্রী উজানীজোড়া আদর্শ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এরই মধ্যে উপজেলার মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মুক্তল হোসেন (৫০) ওই নারীর ঘরে প্রায়ই রাতে আসা-যাওয়া করতেন। স্থানীয়রা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে পাহারা বসান। মঙ্গলবার রাতে ওই প্রধান শিক্ষক ঘরে ঢুকলে বাড়ির নারীরা এসে খোঁজ নেন। প্রবাসীর স্ত্রী ঘরের গেট বন্ধ করে ঘরে কেউ নেই বলে জানান। পরে গ্রামবাসী ঘরটি ঘিরে রাখলে মুক্তল মাস্টার পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীদের হাতে আটক হন। অভিযুক্ত মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মুক্তল হোসেন মাস্টার উপজেলার বনকোট গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে।
এ ব্যাপারে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত কোনো পক্ষই মামলা বা অভিযোগ করেননি।’
এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেওয়ান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘ওই ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. মুক্তল হোসেন মাস্টারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ৩ কার্যদিবসের মধ্যে মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে তদন্তসাপেক্ষে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অশোক বিক্রম চাকমা জানান, বিষয়টি শোনার পরই মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ওই শিক্ষককে শোকজ করার নির্দেশ দিয়েছি। জবাব পেলেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’