এক দশক অপেক্ষার পর অবশেষে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল আলোচিত চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। সোমবার (২৬ জুলাই) প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে বাস্তবায়ন কার্যক্রম।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসার পাশাপাশি এ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এক লাখের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সকাল ১০টায় আনোয়ারার প্রকল্প এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
আরো পড়ুন
সাগরে লঘুচাপ, ঝড়ের শঙ্কায় বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত
সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি। সরকার মনে করছে, এটি বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষায়িত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরো শক্তিশালী করবে। তাঁর মতে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আরো বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, বর্তমানে পোশাকশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়, অ্যাকসেসরিজ ও বিভিন্ন কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করতে হয়। এসব উপকরণ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হলে সরবরাহের সময় কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পাঁচ বছর সময় ধরা হলেও প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করার লক্ষ্য রয়েছে।
গত ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে। ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ জুন বেজা ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ডেভেলপার চুক্তি বিনিময় করা হয়।
আরো পড়ুন
ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে চীনের আগ্রহ, সমঝোতার চেষ্টা সামিটের
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন পরে জানান, দীর্ঘদিন আটকে থাকা প্রকল্পটির প্রয়োজনীয় প্রায় সব প্রক্রিয়া নতুন সরকারের প্রথম চার মাসেই সম্পন্ন হয়েছে। ইতিমধ্যে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, বেইজিং ও ডালিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বৈঠকের পর বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সিইআইজেড প্রকল্পের অগ্রগতি সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন।
কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধার দিক থেকে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করবে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরো সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের মতে, শিল্পায়নের গতি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন চূড়ান্তকরণ এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০২২ সালে চীন সরকার সিআরবিসিকে প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করলে বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়।
আরো পড়ুন
পাবনায় বসুন্ধরা শুভসংঘের দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটির সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করে। এর মধ্যে চীন সরকার রেয়াতি ঋণের মাধ্যমে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা দেবে। অবশিষ্ট অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।
সহায়ক অবকাঠামোর আওতায় নির্মাণ করা হবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার চার লেনের সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন সক্ষমতার বহুমুখী জেটি, গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইন, জলাধার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর।