জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিক্যাল সেন্টারে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার ৫৬৭ পিস ওষুধের গরমিল ধরা পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ ক্রয় কমিটির আকস্মিক মজুদ যাচাইয়ে প্রায় ৭৩ হাজার ১০১ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের ওষুধের হিসাবের সঙ্গে স্টোরে থাকা ওষুধের বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মেডিক্যাল সেন্টারের ওষুধ সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)।
ওষুধ ক্রয় কমিটির সদস্য সচিব ও সহকারী কম্পট্রোলার মো. ফখরুল ইসলাম সূত্র জানায়, গত ১ জুলাই মেডিক্যাল সেন্টারের জন্য নতুন করে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ কেনা হয়। এর মধ্যে শুধু অ্যালাট্রল কেনা হয়েছিল ৯ হাজার পিস। অল্প সময়ের মধ্যেই ওষুধটির মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কমিটির সদস্যদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে এবং কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও ওষুধ ক্রয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের নির্দেশে মেডিক্যাল সেন্টারের স্টোরে আকস্মিক অডিট পরিচালনা করা হয়। এতে অংশ নেন ওষুধ ক্রয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সালেকুল ইসলাম, সদস্যসচিব মো. ফখরুল ইসলাম এবং জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারক। অডিটে স্টোরের ওষুধের মজুদ ও রেজিস্টারের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে।
অডিটে দেখা যায়, রেজিস্টার অনুযায়ী অ্যালাট্রল থাকার কথা ছিল ৪ হাজার ৬৪৫ পিস, কিন্তু স্টোরে একটিও পাওয়া যায়নি। অ্যাজিথ্রোমাইসিন ১ হাজার ২১৮ পিসের স্থলে পাওয়া গেছে মাত্র ৩০৬ পিস। সিপ্রোসিন ২ হাজার ৪০০ পিসের বিপরীতে পাওয়া যায় ১ হাজার ৯৮০ পিস। প্যারাসিটামল ১৫ হাজার পিস থাকার কথা থাকলেও পাওয়া যায় ১০ হাজার পিস। এছাড়া টাইমোনিয়াম ৭০০ পিস, ফ্যামোটিডিন ২ হাজার ৫০০ পিস ও ন্যাপরন ৯৯০ পিসের একটিও স্টোরে পাওয়া যায়নি। অ্যান্টানিল ৫ হাজার ৬০০ পিসের বিপরীতে পাওয়া যায় ৫ হাজার ৪০০ পিস এবং ডমপেরিডোন ৫ হাজার ৮০০ পিসের বিপরীতে পাওয়া যায় মাত্র ১ হাজার ৬০০ পিস। সব মিলিয়ে ১৯ হাজার ৫৬৭ পিস ওষুধের গরমিল পাওয়া গেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭৩ হাজার ১০১ টাকা।
একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই মেডিক্যাল সেন্টারে ওষুধের হিসাব-নিকাশে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তবে বিষয়টি নিয়ে আগে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খোলেননি।
এ বিষয়ে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (স্টোর) মো. নূর-এ-কামাল বলেন, ‘স্টোরের চাবি আমার কাছেই থাকে এবং আমি নিজেই ওষুধ বিতরণ করি। কিন্তু কিভাবে ওষুধের ঘাটতি হলো, তা বুঝতে পারছি না। প্রয়োজন হলে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা যেতে পারে।’
মেডিক্যাল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. শামছুর রহমান বলেন, ‘স্টোরের চাবি ও মজুদের দায়িত্ব স্টোর অফিসারের কাছে। ওষুধ কোথায় গেছে, সে বিষয়ে তিনিই ভালো বলতে পারবেন। বিষয়টি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যকে (প্রশাসন) জানিয়েছি। আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে গরমিলের কারণ অনুসন্ধান করা হবে এবং ভবিষ্যতে ওষুধ সংরক্ষণ ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় আরো কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা হবে।’
ওষুধ ক্রয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সালেকুল ইসলাম বলেন, ‘আগেও অভিযোগ পেয়েছিলাম যে খাতা-কলমে যে পরিমাণ ওষুধ বিতরণের হিসাব দেখানো হয়, বাস্তবে তা সঠিক নয়। আকস্মিক অডিটে ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হবে। এরপর প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
এদিকে, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেলে জাকসুর পক্ষ থেকে প্রচারিত এক বার্তায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারক বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জরুরি ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে আমরা মেডিক্যাল সেন্টারের ওষুধের হিসাব যাচাই করি। সেখানে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার ৫৬৭ পিস ওষুধের গরমিল পাওয়া গেছে। প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, গ্যাস্ট্রিক ও ব্যথানাশকসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ স্টোরে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও মেডিক্যাল সেন্টারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মেডিক্যাল সেন্টারে ওষুধ সংকটের অভিযোগ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছিল। হিসাব অনুযায়ী সংকট হওয়ার কথা নয়। তাই আকস্মিকভাবে মজুদ যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। অডিটে বেশ কিছু গরমিল পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে জরুরি সভা ডাকা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ল্যাবরেটরির ওষুধ সরবরাহ, ব্যবহার ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখা হবে।’




