বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেশের সব ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থাকে, বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষাকে, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানমুখী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, জনসংখ্যাগত সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগাতে হলে শুধু বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী থাকাই যথেষ্ট নয়; তাদের আধুনিক অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদরাসায় প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। পাশাপাশি ৯ হাজারের বেশি আলিয়া মাদরাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী এবং হাজারো ইবতেদায়ি প্রতিষ্ঠানে আরও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির একটি বড় অংশ মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে গড়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ভবিষ্যতের যে বাংলাদেশকে শিল্প, প্রযুক্তি ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেই বাস্তবতার জন্য কি এসব শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে?
সরকার আগামী দিনে বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্প, প্রযুক্তি ও সেবাখাতের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইলেকট্রনিক্স, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস, কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ বিভিন্ন উন্নত খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা ঘোষণা করলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা সবার আগে জানতে চান- দেশে পর্যাপ্ত দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, প্রোগ্রামার, ইলেকট্রিশিয়ান, যন্ত্রচালক, মাননিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা এবং ডিজিটাল দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী রয়েছে কি না। একই সঙ্গে কর্মীদের যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, কওমি মাদরাসায় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এখনও সমন্বিত কোনও জাতীয় নীতিমালা নেই। তবে ধর্মীয় পাঠ্যক্রম অক্ষুণ্ন রেখে ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আলিয়া মাদরাসা থেকে অসংখ্য আলেম ও গবেষক তৈরি হয়েছেন। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে বাস্তবতাও হলো, অনেক কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী উচ্চতর গণিত, বিজ্ঞান, কম্পিউটার শিক্ষা, ব্যবসায় শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং পেশাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে মেধা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুননের পর্যবেক্ষণও একই বার্তা দেয়। তার মতে, বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ শুধু বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। ব্যবসায়ীরা নিয়মিতভাবে যে ঘাটতির কথা তুলে ধরেন, তার মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে দ্রুত নতুন বিষয় শেখার মানসিকতা।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব দক্ষতা এখন আর অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়; আধুনিক কর্মক্ষেত্রের মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে। তাই কোটি কোটি তরুণ যদি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামোর বাইরে থেকে যায়, তাহলে দক্ষ জনশক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা কঠিন হবে।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাকে সমন্বিত করেছে। তুরস্কে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইমাম হাতিপ বিদ্যালয়ে ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা ও সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয়। সৌদি আরবেও জাতীয় পাঠ্যক্রমের আওতায় ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত ও আধুনিক ভাষা শিক্ষা যুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশকে অন্য কোনও দেশের মডেল অনুসরণ করতে হবে- এমন নয়। তবে ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক- এই ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কয়েকটি ধর্মীয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাকিস্তানের কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতা স্বাভাবিক বিষয় হলেও এ ধরনের অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যথাযথ সরকারি তদারকি থাকা জরুরি। কারণ, এসব সহযোগিতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা, পাঠ্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, পাকিস্তান নিজেও শিক্ষা সংস্কার ও ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকীকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ফলে যেকোনও আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষা মানোন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদরাসা শিক্ষাকে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী- সে মাদরাসা, স্কুল বা অন্য যেকোনও প্রতিষ্ঠানের হোক- আধুনিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো দক্ষতা অর্জন করবে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাখাতগুলোর একটিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের বাইরে রাখা যাবে না। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে মাদরাসা থেকে পাস করা একজন শিক্ষার্থীও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কারখানা, সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর কিংবা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন।
তাদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- দেশ কি লাখো তরুণকে দক্ষতার এই বিপ্লবের বাইরে রেখে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে? একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে আগ্রহী দেশের জন্য উত্তরটি স্বতঃসিদ্ধ হওয়া উচিত।






