দেশের নিত্যপণ্য আমদানিতে টানা তৃতীয়বারের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। অন্যদিকে এক সময় দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষে থাকা সিটি গ্রুপ এবার আরো পিছিয়ে চতুর্থ অবস্থানে নেমে গেছে। একই সময়ে টিকে গ্রুপ ও স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এ ছাড়া ডেল্টা এগ্রোফুড ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। বিশ্লেষণে চিনি, পাম তেল, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ও সয়াবিন বীজ, গম, মসুর ডাল, মটর ডাল এবং ছোলাসহ সাতটি প্রধান নিত্যপণ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে এসব পণ্যের মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টনে, যার মূল্য প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে ৩ শতাংশেরও কম। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম মূল্যের পণ্যের আমদানি বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরো পড়ুন
রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ সাতটি পণ্যের মাত্র ১১ শতাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি ৮৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে বড় আমদানিকারকদের সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাজার অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এমজিআইয়ের ব্যবধান বাড়ছে
বিদায়ী অর্থবছরে এমজিআই প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ১৫১ কোটি ডলার। আগের বছরের তুলনায় তাদের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশই করেছে প্রতিষ্ঠানটি। চিনি ও সয়াবিন বীজ আমদানিতে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষে রয়েছে। এ ছাড়া ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য পণ্যেও তাদের বড় অংশীদারি রয়েছে। এসব আমদানির বিপরীতে সরকার প্রায় ৩ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে।
এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আগাম কাঁচামাল আমদানির কারণেই আমদানি বেড়েছে।
সিটি গ্রুপের ধারাবাহিক পতন
এক সময় নিত্যপণ্য আমদানিতে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ছিল সিটি গ্রুপ। তবে তিন বছর আগে শীর্ষস্থান হারানোর পর এবার দ্বিতীয় অবস্থানও ধরে রাখতে পারেনি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৫৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে তারা দ্বিতীয় স্থান থেকে নেমে চতুর্থ অবস্থানে চলে গেছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন শিল্পে বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যাংকঋণ ও অর্থায়নের চাপ বাড়ায় নিত্যপণ্যের আমদানি কমেছে। যদিও এ বিষয়ে সিটি গ্রুপের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরো পড়ুন
সৌদি প্রবাসী যুবকের বাড়িতে ২ নারীর অনশন
দ্বিতীয় স্থানে টি কে, তৃতীয় স্মাইল ফুড
টি কে গ্রুপ একধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় স্থানে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭৯ কোটি ডলারের ১০ লাখ টনের মতো নিত্যপণ্য আমদানি করেছে। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে এখন তারাই শীর্ষে। টি কে গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিত্যপণ্য খাতে আরো বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে আবুল খায়ের গ্রুপের স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসও এক ধাপ এগিয়ে তৃতীয় স্থানে উঠেছে। বিদায়ি অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৭০ কোটি ডলারের ৮ লাখ ৪৪ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে। চিনি পরিশোধনাগার ও ভোজ্যতেল কারখানায় বিনিয়োগের পর তাদের কাঁচামাল আমদানি দ্রুত বেড়েছে।
নাবিলের অবস্থান স্থিতিশীল, ডেল্টার বড় উত্থান
রাজশাহীকেন্দ্রিক নাবিল গ্রুপ টানা দ্বিতীয়বারের মতো পঞ্চম অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রায় ৪০ কোটি ডলারের ১২ লাখ ৯৩ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গম আমদানিতে তারা শীর্ষে রয়েছে। নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, নতুন ফ্লাওয়ার মিল চালু হলে আমদানি ও সরবরাহ আরও বাড়বে।
সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে ডেল্টা অ্যাগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের। এক বছরে ১৩তম অবস্থান থেকে উঠে ষষ্ঠ স্থানে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ২৮ কোটি ডলারের গম, সয়াবিন বীজ ও ভোজ্যতেল আমদানি করেছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরু হওয়ায় আমদানি বেড়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হলে এই প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।
শীর্ষ দশে প্রাণ-আরএফএল
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এবার প্রথমবারের মতো শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে। প্রায় ২১ কোটি ডলারের ৬ লাখ ৩০ হাজার টন নিত্যপণ্য আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি নবম অবস্থানে রয়েছে। এদিকে প্রায় ২৫ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের ভোজ্যতেল আমদানি করে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল (বিইওএল) সপ্তম এবং প্রায় ২৩ কোটি ডলারের গম আমদানি করে সরকারি খাদ্য বিভাগ অষ্টম স্থানে রয়েছে। ১৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে দশম অবস্থানে রয়েছে জহির গ্রুপ।
সাম্প্রতিক প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, নিত্যপণ্য আমদানির বাজারে পুরনো আধিপত্য ভেঙে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। এস আলম গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের নামে আলোচ্য সাতটি পণ্যের নতুন কোনো চালান খালাসের তথ্য বিদায়ী অর্থবছরে পাওয়া যায়নি। বিপরীতে এমজিআইয়ের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং স্মাইল ফুড, ডেল্টা এগ্রোফুড ও প্রাণ-আরএফএলের মতো প্রতিষ্ঠান দ্রুত নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এতে দেশের নিত্যপণ্য আমদানির বাজারে দীর্ঘদিনের সমীকরণে স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।