‘মা’ বলে ডাক দিতেই জং ধরা টিনের দরজা খুলে গেল। একটি শিশুর হাত ধরে উঠানে বেরিয়ে এলেন রাজকুমারী ফুলমতি রানী রবিদাস। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার এই ফুলমতি। ষাটোর্ধ্ব এই ‘বীরাঙ্গনা’ এখন আর কারো সাহায্য ছাড়া একা চলতে পারেন না। সারা শরীরে অসুস্থতার চিহ্ন। কপালে বলিরেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ নির্বাক থাকলেন। তারপর একসময় মুখ খুললেন বীরাঙ্গনা, ‘বছর বছর এত কিছু বলে কী লাভ? আমি তো টাকাপয়সা চাইনি। এত দিন পরও আমার প্রাপ্য সম্মান আর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম না। সম্মান হিসেবে গত ৪২ বছরে পেয়েছি দুই বান্ডিল ঢেউটিন আর স্থানীয়ভাবে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া সম্মাননা।’ পাকিস্তানি বাহিনীর পাষণ্ডদের হাতে লাঞ্ছিত, অপমানিত এই নারী ৪২ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সম্মানের জন্য ঘুরেছেন প্রশাসন, রাজনীতিক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে। তারপরও সেই সম্মান অর্জন করতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন ছাড়াও গোটা জেলার সচেতন মানুষের কাছে বীরাঙ্গনা হিসেবে পরিচিত তিনি। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে থেকে গেছেন উপেক্ষিত, অবহেলিত দেশের জন্য সম্ভ্রমহারানো এই দুঃখিনী মা। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলা সদরের উত্তরপাড়া এলাকার রাস্তার ধারে খাস জমিতে টিন, বাঁশ আর খড়ের তৈরি বাড়িতে ছেলে, নাতি-নাতনিদের নিয়ে বাস করেন ফুলমতি রানী। এই বাড়িতেই স্বামী ফসিরাম রবিদাসকে বেঁধে রেখে ফুলমতির ওপর স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় কয়েক দিন ধরে নির্যাতন চালায় পাকিস্তানি সেনারা। সেদিনকার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এককালের রূপবতী ফুলমতির নিষ্প্রভ চোখ দুটোতে হঠাৎ যেন আগুন জ্বলে ওঠে। বলেন, সাদুল্যাপুরের আশপাশের এলাকায় হানাদারদের ঠেকাতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধযুদ্ধের সময় ফসিরাম বিভিন্নভাবে তাদের সহায়তা করে। একাত্তরের এপ্রিল মাসে হানাদাররা সাদুল্যাপুরের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটি ক্যাম্প করলে মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে নিরাপদে সরে যায়। অনেকেই ফুলমতিদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বললেও তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। নানা অছিলায় রাজাকাররা বাড়ির চারপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করত। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি একদিন দুপুরে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল আচমকা বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তাঁর স্বামীকে অস্ত্রের মুখে বেঁধে ফেলে তারা ফুলমতির ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকি দিয়ে দিনের পর দিন চলে একই অত্যাচার। চোখভরা জল নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করেন এই অসহায় নারী। সাদুল্যাপুর ডিগ্রি কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা আনসার আলী সরকার জানান, নির্যাতিত হওয়ার পর একটি যুবতী গৃহবধূর তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার দৃশ্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা স্বচক্ষে দেখেছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ইউনিয়ন পরিষদ, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তিনি স্বীকৃতির আবেদন করেছেন। বহুবার নিজে গিয়ে ও ছেলেকে পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। অথচ মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও অনেকে ত্বরিত গতিতে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পেয়েছেন। চোখ মুছতে মুছতে রাজকুমারী ফুলমতি শোনালেন তাঁর দুঃখগাথা। চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। ১৯৮৮ সালে স্বামীকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাঁকে। দিন এনে দিন খাওয়া সংসারে অনেক লড়াই-সংগ্রাম করেই ছেলেমেয়েদের বড় করতে হয়েছে। একপর্যায়ে বংশানুক্রমিক জুতা সেলাই পেশায়ও নামতে হয়েছে তাঁকে। মেয়ে সপ্তমী রানীর বিয়ে দেওয়ার পর তৃতীয় ছেলে কলেজছাত্র মনিরাজের ওপর ভর করেই বেঁচে আছেন তিনি। অন্য ছেলেরা আলাদা হয়ে গেলেও ছোট ছেলে সুজন ও এক নাতনি আছে তাঁর সংসারে। দিন দিন তাঁর চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসছে। জোরে কথা না বললে কানেও তেমন শোনেন না। শরীরে কর্মক্ষমতা নেই বললেই চলে। মাঝেমধ্যে তলপেটের ব্যথায় ছটফট করেন। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হলেও স্মৃতিশক্তি এখনো কমেনি। স্মৃতিতে ভেসে ওঠা পাকিস্তানি বাহিনীর সেই নির্যাতনের দৃশ্যগুলো এখনো তাড়া করে ফেরে তাঁকে। ফুলমতি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল তাঁর কাছে এসেছিল। ওই ঘটনার পর মনের দিক থেকে ভেঙে পড়লেও মুক্তিযোদ্ধাদের সান্ত্বনা তাঁকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন আমাকে মা ডেকে বলেছিল, দেশের জন্য আপনার এই মহান আত্মত্যাগের কথা জাতি কোনো দিন ভুলবে না। কিন্তু স্বাধীনতার পর একে একে ৪২ বছর পার হলো। আমি আমার ত্যাগের স্বীকৃতি পাইনি। এ জন্য মনে এখন আর কোনো ক্ষোভও নেই। তবে হতাশা আছে।’ ফুলমতি রানীর কলেজপড়ুয়া ছেলে মনিরাজ জানান, দেশের জন্য মায়ের এমন ত্যাগের কথা শুনে তাঁর গর্ব হলেও দুঃখ পেতে হয় রাষ্ট্রের এমন অবহেলার কথা ভেবে। রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষ না হলে হয়তো এত দিনে তাঁর মায়ের স্বীকৃতি মিলত। তিনি বলেন, আশা ছিল মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের সময় তাঁর মা ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত হবেন। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। স্থানীয় কলেজ শিক্ষক তাজুল ইসলাম রেজা বলেন, ফুলমতির আর্থিক সংগতি থাকলে হয়তো এই পরিস্থিতির শিকার হতে হতো না। হয়তো স্বীকৃতিও পেতেন তিনি। তিনি বলেন, তাঁর নিজের বসবাসের জন্য কোনো ভিটেমাটিও নেই। মাথা গোঁজার জন্য অন্তত স্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি করে দেওয়া দরকার। সাদুল্যাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মেছের উদ্দিন সরকার বলেন, সংসদের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাইকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুলমতি রানীর নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু তাঁর নাম ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মাহমুদুল হক শাহজাদা বলেন, ‘কেন ফুলমতির বীরাঙ্গনা খেতাব জুটছে না তা তিনিও বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, ফুলমতিদের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে না পারলে আমরা বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হব।’ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ শামসউল আলম হীরু বলেন, জেলা পরিষদ এই বীরাঙ্গনাকে সম্মাননা জানিয়েছে। তিনি নিজে তাঁর জন্য সুপারিশ করেছেন। বিদায় নেওয়ার সময় রাজকুমারী ফুলমতি বললেন, ‘বাবা লিখে দিস, আমার মৃত্যুর পর লাশ দাহ করার সময় যেন মুক্তিযোদ্ধারা আমার সন্তানদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়ায়। সেটাই হবে আমার বড় স্বীকৃতি।’