রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার সরকারি উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। দলটি এ উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করে প্রস্তাবিত ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
আজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার আওতাধীন ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি বেসরকারি কম্পানির বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ গণবিরোধী। তাঁর ভাষায়, দেশের বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিলামে তোলার এ উদ্যোগ দেখে মনে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ‘বানরের পিঠা ভাগের’ মতো ভাগ-বাটোয়ারার আয়োজন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাজার হাজার একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘বিদ্যমান শিল্পসম্পদে পুনঃবিনিয়োগ’, ‘পুনর্গঠন ও পুনঃউন্নয়ন’, ‘দীর্ঘমেয়াদি ইজারা’, ‘যৌথ উদ্যোগ’ ও ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’-এর মতো বিভিন্ন নামে বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে জনগণের মালিকানাধীন সম্পদের ওপর করপোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
বাসদ সাধারণ সম্পাদক দাবি করেন, সরকার এ উদ্যোগকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে এটি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে অনুসৃত বেসরকারিকরণ নীতির ধারাবাহিকতা। রাষ্ট্রকে উৎপাদন ও শিল্প পরিচালনা থেকে সরিয়ে দিয়ে বেসরকারি পুঁজির পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার নীতিই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের অভাব এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করার কারণে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। সেই সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সেগুলো বেসরকারি মালিকানায় তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ভূমি ও অবকাঠামো জনগণের সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জাতীয় সম্পদ। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সাময়িক আর্থিক লাভ বা বিনিয়োগ আকর্ষণের অজুহাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
তিনি অভিযোগ করেন, ৪৪টি শিল্পসম্পদ কী ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন হয়েছে কি না, কী শর্তে ইজারা বা যৌথ বিনিয়োগ হবে এবং রাষ্ট্রের মালিকানা কতটুকু বজায় থাকবে, এসব বিষয়ে সরকার কোনো স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করেনি। জাতীয় সংসদ, শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ ও জনগণকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার পরিপন্থী।
বিবৃতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ স্থগিত, প্রস্তাবিত ৪৪টি প্রকল্পের তালিকা, মূল্যায়ন ও চুক্তির শর্ত প্রকাশ, শ্রমিক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে জাতীয় সংলাপ আয়োজন এবং বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালুর জন্য সমন্বিত জাতীয় শিল্পনীতি প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতীয় সম্পদ, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।




