মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন পৃথিবী জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। আরব উপদ্বীপের সেই সময়টিই ইতিহাসে 'জাহেলিয়াতের যুগ' নামে পরিচিত। 'জাহেলিয়াত' শব্দের অর্থ শুধু অজ্ঞতা নয়; বরং আল্লাহর বিধান থেকে বিচ্যুতি, নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার ও মানবিক মূল্যবোধের পতন। সে যুগে শক্তিই ছিল ন্যায়ের মানদণ্ড, নারীরা ছিল অবহেলিত, দুর্বলরা ছিল নির্যাতিত এবং সমাজজুড়ে ছিল শিরক, মূর্তিপূজা, মদ, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার ও গোত্রবাদ। তবে জাহেলি যুগের সেই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে বর্তমান সমাজের অনেক সংকটেরও সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।
১. হেদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুতি ও শিরকে অবাধ বিস্তার
জাহেলি সমাজের সর্ববৃহৎ অবক্ষয়ের কারণ ছিল আল্লাহর একত্ববাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হওয়া। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করলেও ইবাদতে বহু দেব-দেবীকে শরিক করত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই শিরক এক মহা জুলুম।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৩)
শিরক মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয় এবং সব ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে।
২. অজ্ঞতা ও ওহির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া
জাহেলি সমাজে মানুষের জীবন পরিচালিত হতো কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ ও মনগড়া বিশ্বাসের মাধ্যমে। আল্লাহর কিতাব ও নবীদের শিক্ষা থেকে দূরে থাকার ফলে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তারা হারিয়ে ফেলেছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ১৬)
৩. অহংকার ও গোত্রবাদ
বংশ, গোত্র ও জাতিগত অহংকার ছিল জাহেলি সমাজের অন্যতম বড় ব্যাধি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি... নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
৪. নারীর প্রতি অবিচার
জাহেলি যুগে নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, তাদেরকে সম্পদের মতো বিবেচনা করা হতো এবং কন্যাসন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও প্রচলিত ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে— কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা : তাকভির, আয়াত : ৮–৯)
৫. মদ, জুয়া ও অশ্লীলতার প্রসার
মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা ছিল জাহেলি সমাজের সাধারণ সংস্কৃতি। এসব অপরাধ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাক।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৯০)
৬. সুদ ও অর্থনৈতিক শোষণ
ধনীরা সুদের মাধ্যমে গরিবদের শোষণ করত। ফলে সমাজে বৈষম্য ও অন্যায় বেড়ে যেত। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
৭. ন্যায়বিচারের অভাব
ক্ষমতাবানরা দুর্বলদের ওপর জুলুম করত। বিচার হতো প্রভাব ও শক্তির ভিত্তিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত।’ (বুখারি)
৮. নৈতিকতা ও আখিরাতের জবাবদিহিতার অভাব
আখিরাতের জবাবদিহিতার বিশ্বাস দুর্বল হওয়ায় মানুষ পাপকে ভয় করত না। ফলে অন্যায়, প্রতারণা ও অপরাধ সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে; আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭–৮)




