• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই

জাহেলি যুগে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণসমূহ

মুফতি ওমর বিন নাছির
জাহেলি যুগে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণসমূহ
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন পৃথিবী জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। আরব উপদ্বীপের সেই সময়টিই ইতিহাসে 'জাহেলিয়াতের যুগ' নামে পরিচিত। 'জাহেলিয়াত' শব্দের অর্থ শুধু অজ্ঞতা নয়; বরং আল্লাহর বিধান থেকে বিচ্যুতি, নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার ও মানবিক মূল্যবোধের পতন। সে যুগে শক্তিই ছিল ন্যায়ের মানদণ্ড, নারীরা ছিল অবহেলিত, দুর্বলরা ছিল নির্যাতিত এবং সমাজজুড়ে ছিল শিরক, মূর্তিপূজা, মদ, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার ও গোত্রবাদ। তবে জাহেলি যুগের সেই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে বর্তমান সমাজের অনেক সংকটেরও সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।

১. হেদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুতি ও শিরকে অবাধ বিস্তার
জাহেলি সমাজের সর্ববৃহৎ অবক্ষয়ের কারণ ছিল আল্লাহর একত্ববাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হওয়া। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করলেও ইবাদতে বহু দেব-দেবীকে শরিক করত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই শিরক এক মহা জুলুম।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৩)
শিরক মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয় এবং সব ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে।

২. অজ্ঞতা ও ওহির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া
জাহেলি সমাজে মানুষের জীবন পরিচালিত হতো কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ ও মনগড়া বিশ্বাসের মাধ্যমে। আল্লাহর কিতাব ও নবীদের শিক্ষা থেকে দূরে থাকার ফলে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তারা হারিয়ে ফেলেছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ১৬)

৩. অহংকার ও গোত্রবাদ
বংশ, গোত্র ও জাতিগত অহংকার ছিল জাহেলি সমাজের অন্যতম বড় ব্যাধি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি... নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

৪. নারীর প্রতি অবিচার
জাহেলি যুগে নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, তাদেরকে সম্পদের মতো বিবেচনা করা হতো এবং কন্যাসন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও প্রচলিত ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে— কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা : তাকভির, আয়াত : ৮–৯)

৫. মদ, জুয়া ও অশ্লীলতার প্রসার
মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা ছিল জাহেলি সমাজের সাধারণ সংস্কৃতি। এসব অপরাধ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাক।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৯০)

৬. সুদ ও অর্থনৈতিক শোষণ
ধনীরা সুদের মাধ্যমে গরিবদের শোষণ করত। ফলে সমাজে বৈষম্য ও অন্যায় বেড়ে যেত। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

৭. ন্যায়বিচারের অভাব
ক্ষমতাবানরা দুর্বলদের ওপর জুলুম করত। বিচার হতো প্রভাব ও শক্তির ভিত্তিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত।’ (বুখারি)

৮. নৈতিকতা ও আখিরাতের জবাবদিহিতার অভাব
আখিরাতের জবাবদিহিতার বিশ্বাস দুর্বল হওয়ায় মানুষ পাপকে ভয় করত না। ফলে অন্যায়, প্রতারণা ও অপরাধ সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে; আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭–৮)

অশ্লীলতা মানব জীবনে সর্বদা লাঞ্ছনা বয়ে আনে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অশ্লীলতা মানব জীবনে সর্বদা লাঞ্ছনা বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানবজাতিকে চারিত্রিক পবিত্রতা, শালীনতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। ঈমানের দাবি হলো মানুষের মুখের ভাষা, আচরণ, পোশাক, দৃষ্টি, চিন্তা-সবকিছুর মধ্যেই যেন শালীনতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। তাই ইসলাম শুধু অশ্লীল কাজকেই হারাম করেনি; বরং অশ্লীলতার প্রচার, প্রসার, স্বাভাবিকীকরণ এবং তাতে সহযোগিতা করাকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কারণ অশ্লীলতা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় এবং তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে অপমান ও লাঞ্ছনার কারণ হয়।

এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই যারা এটা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।' (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)

পবিত্র কোরআনের এই আয়াত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শুধু অশ্লীল কাজের কথা বলা হয়নি; বরং অশ্লীলতার 'প্রচার ও প্রসার' কামনা করাকেও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ যদি নিজে অশ্লীলতায় লিপ্ত না-ও হয়, কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করে, যাতে অশ্লীলতা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলেও সেও এ সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (নাউজুবিল্লাহ!)।

শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য অশ্লীলতার স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। এটা তার অন্যতম বড় কৌশল। যে কৌশলের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেছেন, 'হে মুমিনরা, তোমরা শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ কোরো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করবে, নিশ্চয়ই সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে।' (সুরা : নুর, আয়াত : ২১)

বোঝা গেল, মানব সমাজে যারা অশ্লীলতা স্বাভাবিকীকরণে কাজ করে, তারা মূলত শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই কিছু অশ্লীল শব্দ, বাক্য বা স্লোগান 'ট্রেন্ড' হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষ না বুঝেই সেগুলো 'মিম' বা 'ট্রেন্ড' মনে করে শেয়ার করে, মন্তব্যে ব্যবহার করে কিংবা ভিডিও বানিয়ে আরো ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য কোনো বিষয় জনপ্রিয় হওয়াই তার বৈধতার প্রমাণ নয়। মুমিন কখনো এসব কাজে লিপ্ত হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিশাপকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না।' (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭) 

অনেক ক্ষেত্রে মানুষ মতবিরোধ ও বিতর্কে জেতার জন্য অশ্লীল পথ অবলম্বন করে বসে। অথচ ইসলাম মতবিরোধ ও বিতর্কের ক্ষেত্রেও শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, 'তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করো এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো।' (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

অতএব, প্রতিপক্ষ ভুল করলেও তার জবাবে অশ্লীল ভাষা, কুরুচিপূর্ণ উপহাস বা নোংরা শব্দ ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষা নয়। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যও শালীনতা বিসর্জন দেওয়া বৈধ নয়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অশ্লীলতা ছড়ানো হয় ইন্টারনেটে। অশ্লীল একটি পোস্ট, মন্তব্য বা শেয়ার মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের চিন্তা করা উচিত আমার একটি লাইক, শেয়ার, কমেন্ট ইত্যাদি মানুষের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাচ্ছে কি না? আমি কি নিজের অজান্তেই শয়তানের কোনো পরিকল্পনার অংশ হয়ে যাচ্ছি?

রাসুল (সা.) বলেন, 'আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ নিয়মের প্রচলন ঘটাবে, তার জন্য তার গুনাহ তো রয়েছেই, অন্যদিকে সে অনুসারে আমলকারীদের গুনাহও তার জন্য রয়েছে। অবশ্য এর কারণে তাদের গুনাহ বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।' (নাসায়ি, হাদিস : ২৫৫৪)

সুতরাং অশ্লীল শব্দ, অশ্লীল কৌতুক, অশালীন ট্রেন্ড কিংবা নোংরা সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার আগে একজন মুমিনের মনে রাখা উচিত কঠিন কিয়ামতের দিনে প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি মন্তব্য এবং প্রতিটি শব্দেরও হিসাব দিতে হবে। মহান আল্লাহ সবাইকে এসব থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেসব উপায়ে এআই ব্যবহার করে হালাল উপার্জন করবেন

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
যেসব উপায়ে এআই ব্যবহার করে হালাল উপার্জন করবেন
সংগৃহীত ছবি

ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুমিনের ইবাদত, দোয়া কবুল হওয়া এবং জীবনের বরকত অনেকাংশে তার উপার্জনের বৈধতার ওপর নির্ভর করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানবকুল, তোমরা পৃথিবীতে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৮)

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে লোক সকল! আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া কিছু কবুল করেন না। আল্লাহ তাঁর রাসুলদের যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরও সেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন। (তিনি বলেছেন) ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎ কাজ করো। তোমরা যা করো সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত।’ (সুরা : আল-মুমিনূন, আয়াত : ৫১)

তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করো।’(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭২)

বর্ণনাকারী বলেন, মহানবী (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আকাশের দিকে হাত দরাজ করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন-জীবিকাও হারাম। এ অবস্থায় তার দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৯৮৯)

তাই মুমিনের উচিত উপার্জনের ক্ষেত্রে তা হালাল পন্থায় হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। আজকের বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করেছে। যার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে অনেকেই এই সুযোগ হাতছাড়া করছেন। আবার অনেকে হালাল-হারামের তোয়াক্বা না করে, হারাম পথেও উপার্জন করছেন। তাই প্রথমত আমাদের জানতে হবে, এআইয়ের মাধ্যমে উপার্জন করা জায়েজ কি না? হলে কোন কোন কাজগুলো করা মুমিনের জন্য অধিক নিরাপদ?

প্রথমত এটা জেনে রাখা উচিত এআইকে ঢালাওভাবে হালাল বা হারাম বলার সুযোগ নেই; এটি একটি প্রযুক্তি বা মাধ্যম। এটি যদি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ কাজ, উপকারী সেবা এবং মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এর মাধ্যমে উপার্জনও হালাল হবে। তবে কেউ যদি একে প্রতারণা, মিথ্যা প্রচার, কপিরাইট লঙ্ঘন, ভুয়া ছবি বা তথ্য তৈরি কিংবা অন্য কোনো শরিয়তবিরোধী কাজে ব্যবহার করে, তাহলে কাজটা যেমন হারাম হবে, তার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থও হারাম হবে। নিম্নে এআই ব্যবহার করে হালালভাবে আয় করার কয়েকটি উপায় তুলে ধরা হলো—

১. কাস্টমার সাপোর্ট অটোমেশন : অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। যার জন্য তাদের বহু জনবল নিয়োগ দিতে হয়। বড় অফিস নিতে হয়। তাদের আনুষঙ্গিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বহু টাকা খরচ করতে হয়। তাদের এই কাজকে সহজ করতে বর্তমানে জনপ্রিয় একটি টুল হচ্ছে এআইভিত্তিক অটোমেটিক চ্যাটবট। যার মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাস্টমার সার্ভিস সহজ করা যায়। ফলে এআই অটোমেশনের ব্যাপারে গভীর দীক্ষা নিয়ে তা তৈরি  করেও একটি স্মার্ট ইনকাম জেনারেট করা সম্ভব। যেখানে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম থাকে।

২. সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট সার্ভিস : বর্তমানে প্রায় সব ব্যবসারই নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট প্রয়োজন হয়। পোস্টের ইউনিক ক্যাপশন লেখা, স্ক্রিপ্ট তৈরি করা বা নতুন নতুন আইডিয়া তৈরি করে ক্লায়েন্টকে সেবা দেওয়া যায়। যারা খুব সূক্ষ্মভাবে এআই ব্যবহার করে মানসম্মত কনটেন্ট বা স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে নিজের মেধা খাটিয়ে তাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে, এআইয়ের সাহায্য নিয়ে এই প্ল্যাটফর্ম থেকেও তাদের হালাল আয় করার সুযোগ রয়েছে।

৩. এআই ই-মেইল মার্কেটিং : অনেক প্রতিষ্ঠানের বড় ই-মেইল তালিকা থাকলেও তারা তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এআই ব্যবহার করে আকর্ষণীয় ই-মেইল লেখা, প্রচারণা পরিকল্পনা করা এবং সয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকদের আলাদা আলাদ নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে বার্তা তৈরি করে একটি লাভজনক সেবা গড়ে তোলা সম্ভব। কোনো প্রতারণামূলক ই-মেইলের কাজ না হলে এই সেক্টর থেকেও হালাল উপার্জন করা যেতে পারে।

৪. গ্রাফিক ডিজাইন ও ক্রিয়েটিভ সার্ভিস : বর্তমানে এআই ডিজাইন টুল ব্যবহার করে দ্রুত (প্রাণীর ছবি ছাড়া) হালাল লোগো, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ব্যানার, বুক কাভার, পোস্টার বা বিজ্ঞাপনের ডিজাইন তৈরি করা যায়, বিশেষ করে যারা অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের এই সেবা খুব বেশি প্রয়োজন হয়। ফলে যারা এআই টুল ব্যবহার করে হালাল ডিজাইন জেনারেট করতে অভিজ্ঞ, তারা এর মাধ্যমে হালাল উপার্জন করতে পারে।

৫. ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যার তৈরি : বর্তমানে এআইয়ের সহায়তায় খুব কম কোডিং জ্ঞান দিয়েও আধুনিক ওয়েবসাইট ও সহজ সফটওয়্যার তৈরি করা সম্ভব। ছোট ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা কিংবা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করে বৈধভাবে আয় করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে গ্রাহককে পূর্ণ সাপোর্ট দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেই সেবা প্রদান শুরু করা উচিত। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক সময় কাস্টমারকে পরিপূর্ণ সেবা দেওয়া কঠিন হতে পারে।

এআই এমন একটি টুল, একটু মাথা খাটালেই যার মাধ্যমে আরো বহু হালাল আয়ের পথ বের করা সম্ভব। তবে এর ব্যবহারের সময় কয়েকটি ইসলামী নীতিমালা সব সময় মনে রাখা উচিত। যেমন—হারাম, অশ্লীল বা প্রতারণামূলক কোনো কাজে তা ব্যবহার করা যাবে না। ভুয়া তথ্য, ভুয়া ছবি বা মানুষকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কোনো কিছু তৈরি করা যাবে না। কাজে সততা, আমানতদারিতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। মানুষের উপকার হয়, এমন সেবা ও ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সব কথার শেষ কথা হলো এআই বর্তমান যুগের একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। তবে এটি মানুষের বিকল্প নয়; বরং দক্ষতা বাড়ানোর একটি কার্যকর মাধ্যম। একজন মুসলিম যদি শরিয়তের সীমারেখা মেনে, সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে এআই ব্যবহার করে মানুষের সমস্যা সমাধান করেন, তাহলে এটি তাঁর জন্য হালাল ও বরকতময় উপার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। মহান আল্লাহ সবাইকে হালালভাবে উপার্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

উপকারী জ্ঞান লাভে মহানবী (সা.)-এর শিখানো দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
উপকারী জ্ঞান লাভে মহানবী (সা.)-এর শিখানো দোয়া
সংগৃহীত ছবি

জ্ঞান মানুষের জীবনকে আলোকিত করে, তবে সব জ্ঞান মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়। এমন অনেক জ্ঞান রয়েছে যা অহংকার, বিভ্রান্তি বা গুনাহের পথ উন্মুক্ত করে; আবার এমন জ্ঞানও আছে যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয় লাভে সাহায্য করে, আমলকে শুদ্ধ করে, চরিত্রকে পরিশীলিত করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথ দেখায়। তাই ইসলামে উপকারী জ্ঞান অর্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

মহানবী (সা.) নিজেই আল্লাহর কাছে এমন জ্ঞানের জন্য দোয়া করতেন, যা মানুষের ঈমান, আমল ও নৈতিকতাকে সমৃদ্ধ করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়ক হয়। একই সঙ্গে তিনি এমন জ্ঞান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যা মানুষের কোনো উপকারে আসে না।  তাই একজন মুমিনের প্রতিদিনের প্রার্থনার অন্যতম অংশ হওয়া উচিত—আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞান, কবুলযোগ্য আমল এবং কল্যাণময় জীবন কামনা করা। এই বিষয়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও সহজ একটি দোয়াটি হলো—

اَللّٰهُمَّ اِنِّيْ اَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিজক্বান ত্বইয়্যিবা, ওয়া আমালান মুতাক্বাব্বালা। 
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট উপকারী জ্ঞান, উত্তম রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করি।’

হাদিস : উম্মে সালামা (রা.)-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর নিয়মিত এই দোয়াটি পাঠ করতেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৯২৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬৬০২)