• ই-পেপার

অশ্লীলতা মানব জীবনে সর্বদা লাঞ্ছনা বয়ে আনে

হাদিসের বাণী

দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাতের এক-তৃতীয়াংশ হলে মহানবী (সা.) উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে মানুষসকল, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো। কম্পনকারী এবং তার সহযোগী (কিয়ামতের আগে শিঙ্গার ফুঁৎকার) চলে এসেছে এবং মৃত্যুও তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। 
(এ ঘোষনা শুনে একবার) আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আপনার ওপর দরুদ পাঠ করি। তাই আমি আপনার ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করার জন্য কোন সময় নির্ধারণ করব? তিনি বললেন, তোমার সময় অনুযায়ী করতে পারো। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে বেশি করে করতে পারলে, তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক সময়ে? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে পারলে যদি বেশি করো, তাহলে তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় করব? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে বেশি করে করতে পারলে, তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, আমি আমার সম্পূর্ণ সময় দরুদের জন্য নির্দিষ্ট করব? এবার মহানবী (সা.) বললেন, তাহলে এই দরুদ তোমার চিন্তা দূর করে দেবে এবং তোমার সব গুনাহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১২৪১)

শিক্ষা ও বিধান
1. রাতের শেষাংশ ইবাদতের সর্বোত্তম সময়। মহানবী (সা.) রাতের এক-তৃতীয়াংশে জেগে আল্লাহর জিকির করতেন এবং উম্মতকে ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাতেন।
2. মৃত্যু ও কিয়ামতের কথা স্মরণ করা ঈমানকে শক্তিশালী করে। তাই মানুষের উচিত সব সময় মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া এবং আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তোলা।
3. আল্লাহর জিকির মুমিনের সর্বোত্তম আমল। বিপদ-আপদ, গাফেলতি ও পাপ থেকে বাঁচতে নিয়মিত জিকির করা জরুরি।
4. মহানবী (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত।
5. দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী যত ইচ্ছা সম্ভব দরুদ পড়তে পারে।
6. দরুদ দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ তাআলা দরুদের বরকতে বান্দার দুঃখ-কষ্ট লাঘব করেন।
৭. দরুদ গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যমও বটে। তাই আন্তরিকভাবে দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার পাপ ক্ষমা করে দেন।


 

যেসব উপায়ে এআই ব্যবহার করে হালাল উপার্জন করবেন

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
যেসব উপায়ে এআই ব্যবহার করে হালাল উপার্জন করবেন
সংগৃহীত ছবি

ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুমিনের ইবাদত, দোয়া কবুল হওয়া এবং জীবনের বরকত অনেকাংশে তার উপার্জনের বৈধতার ওপর নির্ভর করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানবকুল, তোমরা পৃথিবীতে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৮)

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে লোক সকল! আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া কিছু কবুল করেন না। আল্লাহ তাঁর রাসুলদের যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরও সেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন। (তিনি বলেছেন) ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎ কাজ করো। তোমরা যা করো সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত।’ (সুরা : আল-মুমিনূন, আয়াত : ৫১)

তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করো।’(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭২)

বর্ণনাকারী বলেন, মহানবী (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আকাশের দিকে হাত দরাজ করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন-জীবিকাও হারাম। এ অবস্থায় তার দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৯৮৯)

তাই মুমিনের উচিত উপার্জনের ক্ষেত্রে তা হালাল পন্থায় হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। আজকের বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করেছে। যার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে অনেকেই এই সুযোগ হাতছাড়া করছেন। আবার অনেকে হালাল-হারামের তোয়াক্বা না করে, হারাম পথেও উপার্জন করছেন। তাই প্রথমত আমাদের জানতে হবে, এআইয়ের মাধ্যমে উপার্জন করা জায়েজ কি না? হলে কোন কোন কাজগুলো করা মুমিনের জন্য অধিক নিরাপদ?

প্রথমত এটা জেনে রাখা উচিত এআইকে ঢালাওভাবে হালাল বা হারাম বলার সুযোগ নেই; এটি একটি প্রযুক্তি বা মাধ্যম। এটি যদি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ কাজ, উপকারী সেবা এবং মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এর মাধ্যমে উপার্জনও হালাল হবে। তবে কেউ যদি একে প্রতারণা, মিথ্যা প্রচার, কপিরাইট লঙ্ঘন, ভুয়া ছবি বা তথ্য তৈরি কিংবা অন্য কোনো শরিয়তবিরোধী কাজে ব্যবহার করে, তাহলে কাজটা যেমন হারাম হবে, তার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থও হারাম হবে। নিম্নে এআই ব্যবহার করে হালালভাবে আয় করার কয়েকটি উপায় তুলে ধরা হলো—

১. কাস্টমার সাপোর্ট অটোমেশন : অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। যার জন্য তাদের বহু জনবল নিয়োগ দিতে হয়। বড় অফিস নিতে হয়। তাদের আনুষঙ্গিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বহু টাকা খরচ করতে হয়। তাদের এই কাজকে সহজ করতে বর্তমানে জনপ্রিয় একটি টুল হচ্ছে এআইভিত্তিক অটোমেটিক চ্যাটবট। যার মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাস্টমার সার্ভিস সহজ করা যায়। ফলে এআই অটোমেশনের ব্যাপারে গভীর দীক্ষা নিয়ে তা তৈরি  করেও একটি স্মার্ট ইনকাম জেনারেট করা সম্ভব। যেখানে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম থাকে।

২. সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট সার্ভিস : বর্তমানে প্রায় সব ব্যবসারই নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট প্রয়োজন হয়। পোস্টের ইউনিক ক্যাপশন লেখা, স্ক্রিপ্ট তৈরি করা বা নতুন নতুন আইডিয়া তৈরি করে ক্লায়েন্টকে সেবা দেওয়া যায়। যারা খুব সূক্ষ্মভাবে এআই ব্যবহার করে মানসম্মত কনটেন্ট বা স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে নিজের মেধা খাটিয়ে তাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে, এআইয়ের সাহায্য নিয়ে এই প্ল্যাটফর্ম থেকেও তাদের হালাল আয় করার সুযোগ রয়েছে।

৩. এআই ই-মেইল মার্কেটিং : অনেক প্রতিষ্ঠানের বড় ই-মেইল তালিকা থাকলেও তারা তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এআই ব্যবহার করে আকর্ষণীয় ই-মেইল লেখা, প্রচারণা পরিকল্পনা করা এবং সয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকদের আলাদা আলাদ নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে বার্তা তৈরি করে একটি লাভজনক সেবা গড়ে তোলা সম্ভব। কোনো প্রতারণামূলক ই-মেইলের কাজ না হলে এই সেক্টর থেকেও হালাল উপার্জন করা যেতে পারে।

৪. গ্রাফিক ডিজাইন ও ক্রিয়েটিভ সার্ভিস : বর্তমানে এআই ডিজাইন টুল ব্যবহার করে দ্রুত (প্রাণীর ছবি ছাড়া) হালাল লোগো, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ব্যানার, বুক কাভার, পোস্টার বা বিজ্ঞাপনের ডিজাইন তৈরি করা যায়, বিশেষ করে যারা অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের এই সেবা খুব বেশি প্রয়োজন হয়। ফলে যারা এআই টুল ব্যবহার করে হালাল ডিজাইন জেনারেট করতে অভিজ্ঞ, তারা এর মাধ্যমে হালাল উপার্জন করতে পারে।

৫. ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যার তৈরি : বর্তমানে এআইয়ের সহায়তায় খুব কম কোডিং জ্ঞান দিয়েও আধুনিক ওয়েবসাইট ও সহজ সফটওয়্যার তৈরি করা সম্ভব। ছোট ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা কিংবা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করে বৈধভাবে আয় করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে গ্রাহককে পূর্ণ সাপোর্ট দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেই সেবা প্রদান শুরু করা উচিত। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক সময় কাস্টমারকে পরিপূর্ণ সেবা দেওয়া কঠিন হতে পারে।

এআই এমন একটি টুল, একটু মাথা খাটালেই যার মাধ্যমে আরো বহু হালাল আয়ের পথ বের করা সম্ভব। তবে এর ব্যবহারের সময় কয়েকটি ইসলামী নীতিমালা সব সময় মনে রাখা উচিত। যেমন—হারাম, অশ্লীল বা প্রতারণামূলক কোনো কাজে তা ব্যবহার করা যাবে না। ভুয়া তথ্য, ভুয়া ছবি বা মানুষকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কোনো কিছু তৈরি করা যাবে না। কাজে সততা, আমানতদারিতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। মানুষের উপকার হয়, এমন সেবা ও ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সব কথার শেষ কথা হলো এআই বর্তমান যুগের একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। তবে এটি মানুষের বিকল্প নয়; বরং দক্ষতা বাড়ানোর একটি কার্যকর মাধ্যম। একজন মুসলিম যদি শরিয়তের সীমারেখা মেনে, সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে এআই ব্যবহার করে মানুষের সমস্যা সমাধান করেন, তাহলে এটি তাঁর জন্য হালাল ও বরকতময় উপার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। মহান আল্লাহ সবাইকে হালালভাবে উপার্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

উপকারী জ্ঞান লাভে মহানবী (সা.)-এর শিখানো দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
উপকারী জ্ঞান লাভে মহানবী (সা.)-এর শিখানো দোয়া
সংগৃহীত ছবি

জ্ঞান মানুষের জীবনকে আলোকিত করে, তবে সব জ্ঞান মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়। এমন অনেক জ্ঞান রয়েছে যা অহংকার, বিভ্রান্তি বা গুনাহের পথ উন্মুক্ত করে; আবার এমন জ্ঞানও আছে যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয় লাভে সাহায্য করে, আমলকে শুদ্ধ করে, চরিত্রকে পরিশীলিত করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথ দেখায়। তাই ইসলামে উপকারী জ্ঞান অর্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

মহানবী (সা.) নিজেই আল্লাহর কাছে এমন জ্ঞানের জন্য দোয়া করতেন, যা মানুষের ঈমান, আমল ও নৈতিকতাকে সমৃদ্ধ করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়ক হয়। একই সঙ্গে তিনি এমন জ্ঞান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যা মানুষের কোনো উপকারে আসে না।  তাই একজন মুমিনের প্রতিদিনের প্রার্থনার অন্যতম অংশ হওয়া উচিত—আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞান, কবুলযোগ্য আমল এবং কল্যাণময় জীবন কামনা করা। এই বিষয়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও সহজ একটি দোয়াটি হলো—

اَللّٰهُمَّ اِنِّيْ اَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিজক্বান ত্বইয়্যিবা, ওয়া আমালান মুতাক্বাব্বালা। 
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট উপকারী জ্ঞান, উত্তম রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করি।’

হাদিস : উম্মে সালামা (রা.)-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর নিয়মিত এই দোয়াটি পাঠ করতেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৯২৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬৬০২)


 

আল্লাহ সম্পর্কে যেসব ধারণা পোষণ করা সম্পূর্ণ অনুচিত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহ সম্পর্কে যেসব ধারণা পোষণ করা সম্পূর্ণ অনুচিত
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা একটি অত্যন্ত মারাত্মক আধ্যাত্মিক ব্যাধি। ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ (মহাপাপ) হিসেবে বিবেচিত। এটি মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে এবং তাঁর প্রতি অবিশ্বাসের মনোভাব সৃষ্টি করে। আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা কী?

আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণার অর্থ হলো সন্দেহ, অবিশ্বাস ও নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা। ইসলামের পরিভাষায়, যিনি বিশ্বাস ও আস্থার যোগ্য, তাঁর প্রতি আস্থা না রাখা বা তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করাই কুধারণা। আর আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা বলতে বোঝায়- এটা মনে করা যে আল্লাহ তাঁর দ্বিনকে সাহায্য করবেন না, আল্লাহ তাঁর বাণীকে বিজয়ী করবেন না, আল্লাহ বান্দার সব বিষয়ে যথেষ্ট নন, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না বা দয়া করবেন না। (নাউজুবিল্লাহ)
এসব আল্লাহর প্রতি মারাত্মক কুধারণা, যা মানুষের ওপর আল্লাহর অসন্তোষ ও অভিশাপ ডেকে আনে। এর বিপরীত হলো আল্লাহ সম্পর্কে সুধারণা রাখা ঈমানি দায়িত্ব। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তাঁর সাহায্য, ক্ষমা, রহমত ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতি যে দিয়েছেন, সে ব্যাপারে দৃঢ়বিশ্বাস রাখা। কাজেই যে ব্যক্তি মনে করে যে মিথ্যা ও বাতিল চিরকাল সত্যের ওপর বিজয়ী থাকবে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা পোষণ করে।

প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জাদুল মাআদ’-এ আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণার বহু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে আমাদের সময় ও প্রসঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো- ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, বেশির ভাগ মানুষই আল্লাহ সম্পর্কে যথার্থ ধারণা পোষণ করে না। তারা নিজেদের ব্যাপারে এবং অন্যদের ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালা সম্পর্কে কুধারণা করে। এ থেকে শুধু সেই ব্যক্তি মুক্ত থাকতে পারে, যে আল্লাহকে, তাঁর নামসমূহ, গুণাবলি এবং তাঁর অসীম প্রজ্ঞাকে যথাযথভাবে চিনেছে।’ এরপর তিনি বলেন-

১. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া : যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায় এবং তাঁর অনুগ্রহের আশা ছেড়ে দেয়, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।

২. মনে করা যে সত্য কখনো বিজয়ী হবে না : যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে-আল্লাহ সত্যকে সাহায্য করবেন না, তাঁর দ্বিনকে পূর্ণতা দেবেন না, তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিজয় দেবেন না, বরং বাতিলই স্থায়ীভাবে বিজয়ী থাকবে, সে আল্লাহর মহিমা, প্রজ্ঞা, শক্তি ও পরিপূর্ণতার পরিপন্থী ধারণা পোষণ করেছে।

৩. আল্লাহর ফয়সালার পেছনে প্রজ্ঞা অস্বীকার করা : যে ব্যক্তি মনে করে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী নয়, অথবা আল্লাহ কোনো গভীর প্রজ্ঞা ছাড়াই সব কিছু নির্ধারণ করেছেন, সে আল্লাহর রবুবিয়‍্যাত, সার্বভৌমত্ব ও অসীম প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করেছে।

৪. মনে করা যে আল্লাহ নেককার ও পাপীকে সমানভাবে শাস্তি দেবেন : যে ব্যক্তি মনে করে, আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ ও সৎ বান্দাদেরও শত্রুদের মতো একইভাবে শাস্তি দেবেন, সে আল্লাহ সম্পর্কে মারাত্মক কুধারণা করেছে।

৫. আখিরাত ও পুনরুত্থান অস্বীকার করা : যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে না যে আল্লাহ মৃত্যুর পর সব মানুষকে পুনরুত্থিত করবেন, সৎকর্মশীলকে পুরস্কৃত করবেন, পাপীকে শাস্তি দেবেন এবং মানুষের সব মতভেদ ও সত্য-মিথ্যার ফয়সালা করবেন, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।

৬. মনে করা যে আল্লাহ নেক আমল নষ্ট করে দেবেন : যে ব্যক্তি মনে করে যে আল্লাহ তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করা আন্তরিক নেক আমল বিনা কারণে নষ্ট করে দেবেন, অথবা সারা জীবন ইবাদতকারীকে শাস্তি দেবেন, আর যারা সারা জীবন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করবেন, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।

৭. দোয়া ও তাওয়াক্কুলের পরও আল্লাহ সাড়া দেবেন না, এমন ধারণা করা : যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে চায়, তাঁর ওপর ভরসা করে, সাহায্য প্রার্থনা করে; তার পরও মনে করে আল্লাহ তাকে নিরাশ করবেন এবং তার দোয়া কবুল করবেন না, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।

৮. আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার পর অন্য কারো ওপর ভরসা করা : যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার পর কোনো ফেরেশতা, জীবিত বা মৃত মানুষ কিংবা অন্য কাউকে আল্লাহর পরিবর্তে আশ্রয় মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে তারা তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করবে, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে। এ ধরনের বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহ থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেয় এবং তার শাস্তি বৃদ্ধি করে।