• ই-পেপার

ডাক্তারদের জন্য ওষুধ কম্পানির উপঢৌকন গ্রহণ কি জায়েজ?

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় রাজস্বনীতি

ড. ইকবাল কবীর মোহন
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় রাজস্বনীতি
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী রাজস্বনীতির কতগুলো মৌলিক উদ্দেশ্য আছে। এক. জনগণের মৌলিক প্রয়োজনসমূহ তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করা। দুই. সম্পদকে জমিয়ে না রেখে তা ন্যায়পূর্ণ বণ্টনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তিন. অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিনিয়োগ সম্প্রসারিত করা। চার. বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাস করা। পাঁচ. আয় ও সম্পদের বণ্টন সুনিশ্চিত করা। (সূত্র : ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, ইসলামী অর্থনীতির রূপরেখা : তত্ত্ব ও প্রয়োগ)

ইসলামী রাজস্বব্যবস্থার উৎস
ইসলামী রাজস্বের উৎসগুলো কোরআন, হাদিস ও খোলাফায়ে রাশেদার নীতিমালার আলোকে নির্ধারিত হয়েছে। এ আয়ের উৎসসমূহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ইসলামী রাজস্বব্যবস্থাকে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা— ভূমি রাজস্ব, খুমুস জাকাত, সাদাকা ও জিজিয়া

মালিকানা বা উত্তরাধিকারহীন ধন-সম্পদ
১. ভূমি রাজস্ব :
রাষ্ট্রের সব ভূমি ব্যবহার করার নিমিত্তে জনগণের কাছ থেকে যে কর আদায় করা হয়, তাকে ভূমি রাজস্ব বলে। দেশের জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এটিকে আবার দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা—ক. ওশর ও খ. খারাজ। এই দুুটিই ভূমি রাজস্ব আদায়ের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ক. ওশর : আরবি ‘আশারাতুন’ শব্দ থেকে ওশর শব্দটি এসেছে। এর শাব্দিক অর্থ এক-দশমাংশ। যে জমির মালিক মুসলমান অথবা যে জমি মুসলমানই সর্বপ্রথম চাষের উপযোগী করে তুলেছে, সে জমি ওশরি জমি হিসেবে অভিহিত।

ওশর সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যা উপার্জন করো এবং যা আমরা তোমাদের জন্য জমিতে উৎপন্ন করি, সেখান থেকে উত্কৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো। আর সেখান থেকে নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার সংকল্প কোরো না, যা তোমরা নিজেরা গ্রহণ করো না চোখ বন্ধ করা ছাড়া। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত ও চির প্রশংসিত।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৭)

ওশর প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘বৃষ্টি ও প্রবাহিত পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসল বা সেচ ব্যতীত উর্বরতার ফলে উৎপন্ন ফসলের ওপর (এক- দশমাংশ) ওশর ওয়াজিব হয়। আর সেচ দ্বারা উৎপাদিত ফসলের ওপর অর্থ (বিশ ভাগের এক ভাগ) ওশর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৮৩)

খ. খারাজ : সাধারণত ভূমির ওপর ধার্যকৃত করকে খারাজ বলে। তবে ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের মালিকানা বা ভোগকৃত জমি থেকে যে রাজস্ব আদায় করা হয়, তাকে খারাজ বলা হয়। জমির জরিপ ও গুণাগুণ নির্ণয় করে ইসলামী রাষ্ট্র খারাজের পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকে। খোলাফায়ে রাশেদার শাসনামলে দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা) সর্বপ্রথম ইরাক, সিরিয়া ও মিসরের বিস্তৃত উর্বর জমির ওপর জরিপ পরিচালনা করেছিলেন। এ জন্য ভূমি রাজস্ব বিষয়ে পারদর্শী হজরত উসমান বিন হানিফ (রা) জরিপের কাজ পরিচালনা করেন। খারাজ রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সম্পদ। তাই এটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জমির গুণাগুণ, উর্বরতা, সেচ ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো অবহেলার কারণে ভূমির মালিকের প্রতি অবিচার বা জুলুম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর এ অবিচার হলো কঠিন গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি জালিমদের (যারা জুলুম ও অবিচার করে) জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি।’ (সুরা : কাহফ : ২৯)

অবিচার বা জুলুম সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজের ওপর জুলুম হারাম করে দিয়েছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম কোরো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৭) 

২. খুমুস : আরবি শব্দ ‘খুমুস’, অর্থ এক-পঞ্চমাংশ। ইসলামী শরিয়তে এটি একটি বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে আর্থিক ব্যবস্থার অংশ। এটি এমন একটি কর, যা নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের ওপর প্রযোজ্য। ইসলামী আইন মতে, সাধারণত যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (গনিমতের মাল) এক-পঞ্চমাংশ খুমুস হিসেবে গণ্য করা হয়। যা ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমাল তহবিলে জমা করতে হয়। গনিমত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর নির্দেশনা হচ্ছে, ‘আর তোমরা জেনে নাও যে যুদ্ধে তোমরা যেসব বস্তু গনিমত হিসেবে লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহ, তাঁর রাসুল, তাঁর নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরের জন্য। যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহর ওপর এবং যা কিছু (বণ্টননীতি) আমরা নাজিল করেছি আমাদের বান্দার ওপর সত্য-মিথ্যার ফায়সালার দিন এবং দুই দলের জমা হওয়ার দিন (অর্থাৎ বদরের যুদ্ধের দিন)। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : আনফাল : ৪১)।

এ ছাড়া খনিজ সম্পদ, সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত সম্পদ ও গুপ্তধনের ওপরও খুমুস প্রযোজ্য। এসব অর্থের প্রতিটি থেকে এক-পঞ্চমাংশ ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমালে জমা করার বিধানকে খুমুস বলা হয়।

৩. জাকাত ও সাদাকা : ইসলামে জাকাতের বিধানকে ফরজ করা হয়েছে। জাকাত কোনো কর বা ট্যাক্স নয়, বরং এটি আর্থিক ইবাদত। এটি সম্পদের পবিত্রকারী। জাকাত ইসলামী অর্থব্যবস্থার হূিপণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এটি ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ইসলামী সমাজে আয় ও সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্য দূর করে জাকাত।

জাকাত রাষ্ট্রের দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত এবং অবহেলিত বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি সুরক্ষাবলয়। তাই পবিত্র কোরআনের প্রায় ৩০টি আয়াতে জাকাতের কথা বলা হয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ মাল বা সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার নাম জাকাত। জাকাত সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আল্লাহ তাআলা জাকাত বণ্টনের খাত ও নীতি ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘জাকাত (সাদাকাসমূহ) আট শ্রেণির লোকের জন্য। ফকির, অভাবগ্রস্ত, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট ব্যক্তি, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬০)

৪. জিজিয়া : জিজিয়া অর্থ হচ্ছে মাথাপিছু ধার্যকৃত কর। এটি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের ওপর ধার্যকৃত নিরাপত্তা কর। ইসলামী রাষ্ট্রে যুদ্ধ করতে সক্ষম অমুসলিম নাগরিকদের কাছ থেকে দেশ রক্ষার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিবছর যে অর্থ আদায় করা হয়, তাকে জিজিয়া বলা হয়। জিজিয়া সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যুদ্ধ করো আহলে কিতাবদের মধ্যকার সেসব লোকের বিরুদ্ধে, যারা আল্লাহ ও বিচার দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা হারাম করেছেন তা হারাম করে না ও সত্য দ্বিন (ইসলাম) কবুল করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা বিনীত হয়ে করজোড়ে জিজিয়া প্রদান করে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২৯)

৪. মালিকানাবিহীন সম্পদ : দুনিয়ার সম্পদের মালিক এক আল্লাহ। মানুষ দুনিয়াতে তাঁর খলিফা হিসেবে সাময়িকভাবে তাঁর সে সম্পদ ভোগ করে। সমাজে অনেক সময় দেখা যায় অনেক সম্পদ এমন আছে তার কোনো মালিক বা উত্তরাধিকার নেই। এসব মালিকানাবিহীন সম্পদের মালিক হবে ইসলামী রাষ্ট্র। এসব সম্পদ রাষ্ট্র দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করবে।

ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থনীতি পরিচালনায় আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যে নীতি ও বিধান দিয়েছেন তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে দেশের মানুষ যেমন সুখ-সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন লাভ করবে, তেমনি একটি বৈষম্যহীন সমাজ লাভ করবে, যেখানে জুলুম, অবিচার ও নীতিহীনতার লেশমাত্র থাকবে না।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৫ ‍জুলাই ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ৫ ‍জুলাই ২০২৬

আজ রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩, ১৯ মহররম, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৭ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪২ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫৪ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ২০ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৫২ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৫০ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৪ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

সন্তানের আকিকা না দিলে ক্ষতি হয়? কী বলে ইসলাম?

অনলাইন ডেস্ক
সন্তানের আকিকা না দিলে ক্ষতি হয়? কী বলে ইসলাম?
সংগৃহীত ছবি

মা-বাবার জন্য মহান রবের দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার সন্তান। এ জন্য শিশুর জন্মের পর আকিকা করতে হয়। সেই সঙ্গে পশু জবাই করে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করতে হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ধন-সম্পদ আর সন্তানাদি পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ৪৬)।

অন্যদিকে হাদিসে সন্তান জন্মের পর আকিকা করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। সালমান ইবনু আমির (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, সন্তানের সঙ্গে আকিকা সম্পর্কিত। তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত (অর্থাৎ আকিকার পশু জবেহ) কর এবং তার (সন্তান) অশুচি (চুল, নখ ইত্যাদি) দূর করে দাও। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৭৬)

আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সপ্তম দিনে তার নাম রাখতে, মাথা মুণ্ডন করতে এবং আকিকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ২৮৩২)

এ ক্ষেত্রে ছেলে সন্তান হলে দু’টি ও মেয়ে সন্তান হলে একটি পশু কুরবানি দিতে হয়। ইসলামিক স্কলার মিজানুর রহমান আজহারীর মতে, আকিকা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন- ছেলে হলে দু’টি ছাগল দিয়ে আকিকা করো। আর যদি মেয়ে হয় তাহলে একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করো। আর আকিকার ক্ষেত্রে সুন্নত হলো- সন্তান ভূমিষ্ঠের ৭ দিন পর আকিকা করা। সপ্তম দিনে সন্তানের মাথার চুল ফেলে দিতে হয় এবং তার একটি সুন্দর নাম রাখতে হয়।

তবে অনেকেই বলে থাকেন আকিকার পশু শুধু নর হতে হবে। কিন্তু হাদিসে নির্দিষ্টভাবে এমন নির্দেশনা আসেনি। উম্মু কুরয রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আকিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন তিনি (নবীজি সা.) বলেন, ছেলের জন্য দুটো ছাগল আর মেয়ের জন্য একটি ছাগল আকিকা দিতে হবে। আকিকার পশু নর হোক বা মাদী হোক তোমাদের কোনো ক্ষতি (গুনাহ) হবে না। (সুনাত আত তিরমিজি, হাদিস: ১৫২২)

কিন্তু আকিকার ক্ষেত্রে অনেকেই প্রায় সময় বলে থাকেন, কেউ যদি সন্তানের আকিকা না দেন তাহলে সন্তানের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে সন্তানের ওপর বিপদ-আপদ লেগেই থাকে। আসলেই কী ইসলামে এমন কিছু আছে?

ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, ছেলে-মেয়েদের আকিকা করা অনেকটা লাইফ ইনস্যুরেন্সের মতো। সেই জায়গা থেকে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য এটা করা উচিত। কিন্তু আকিকা না দিলে সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমন কোনো কথা হাদিসে আসেনি। তবে নিরাপত্তার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাধ্য অনুযায়ী আকিকা করা উচিত।

বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা নিয়ে ইসলাম কী বলে

মুফতি ওমর বিন নাছির
বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা নিয়ে ইসলাম কী বলে
সংগৃহীত ছবি

বিয়ে ইসলামে শুধুমাত্র দুটি মানুষের একত্রে বসবাসের চুক্তি নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি পবিত্র বন্ধন। কিন্তু বিয়েকে কেন্দ্র করে সমাজে এমন অনেক প্রচলিত ধারণা রয়েছে, যার একটি হলো—স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর বয়স কম হওয়াই বাধ্যতামূলক। অনেকে তো মনে করেন যে, নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে কিংবা অনুচিত। 

মূলত ইসলাম বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সকে নয়; বরং দ্বীনদারিতা, চরিত্র, পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্ববোধ এবং দাম্পত্য জীবনের কল্যাণকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। বয়সের সামঞ্জস্যকে একটি ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটিকে কখনো বৈধতা বা অবৈধতার মানদণ্ড বানানো হয়নি। 

তাই ইসলামী শরিয়তে স্বামী-স্ত্রীর সমবয়সী হওয়া, স্বামীর বয়সে বড় হওয়া কিংবা স্ত্রীর বয়সে বড় হওয়া—সব ক্ষেত্রেই বিয়ে বৈধ। কোরআন বা সহিহ সুন্নাহর কোথাও এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যে, একজন পুরুষ নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করতে পারবে না। বরং ইসলাম এ বিষয়ে মানুষের জন্য প্রশস্ততা রেখেছে। কোন বিয়ে অধিক কল্যাণকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বীনদারিতা, চরিত্র, পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানসিক পরিপক্বতা এবং পারিবারিক বাস্তবতার ওপর।

মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে দৃষ্টান্ত
নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বয়ং মহানবী (সা.) নিজেই। তিনি সর্বপ্রথম বিবাহ করেন খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)-কে। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, খাদিজা (রা.) নবীজি (সা.)-এর চেয়ে প্রায় ১৫ বছর বয়সে বড় ছিলেন। তিনি ছিলেন সম্মানিত ব্যবসায়ী, প্রজ্ঞাবান এবং কুরাইশ সমাজের অন্যতম মর্যাদাবান নারী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত নবী (সা.) অন্য কোনো নারীকে বিবাহ করেননি। (ফিকহুস সিরাহ)
এ ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ এবং এতে কোনো অসম্মান বা অপছন্দের বিষয় নেই।

সাহাবিদের জীবন থেকে দৃষ্টান্ত
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ও উম্মে আইমান (রা.)-এর বিবাহ। উম্মে আইমান (রা.) ছিলেন নবী (সা.)-এর শৈশবের লালন-পালনকারী এবং তাঁর পরিবারের অত্যন্ত সম্মানিত সদস্য। নবী (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘যে ব্যক্তি জান্নাতি একজন নারীকে বিয়ে করতে চায়, সে যেন উম্মে আইমানকে বিয়ে করে।’ মহানবী (সা.)-এর উৎসাহে জায়েদ (রা.) তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন ইসলামের বিখ্যাত সেনাপতি উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)। (উসদুল গাবাহ, আল-ইসাবাহ)
এ ঘটনাও প্রমাণ করে যে, স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়া ইসলামে কোনো বাধা নয়।

তবে পবিত্র কোরআনে জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেখানে থাকবে সমবয়সী সঙ্গিনীরা।’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ৫২)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আমি জান্নাতি নারীদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব, আমি তাদের বানাবো কুমারী, প্রেমময় ও সমবয়সী।’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ৩৫–৩৮)

তাফসিরবিদরা উল্লেখ করেছেন, এখানে ‘সমবয়সী’ হওয়ার বর্ণনা জান্নাতের পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্য ও পারস্পরিক সামঞ্জস্যের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে এসেছে। তবে এটি পৃথিবীতে বিয়ের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়। বরং এটি দাম্পত্য জীবনে মানসিক ও আচরণগত সামঞ্জস্যের গুরুত্বের প্রতি একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করে।

একটি ঘটনা
বিশিষ্ট সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর ঘটনা একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.)- তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুমি কি কুমারী মেয়েকে বিয়ে করতে পারতে না, তাহলে তোমরা একে অপরের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করতে?’ জাবির (রা.) বলেন যে, তাঁর ছোট ছোট বোনদের দেখাশোনার জন্য অভিজ্ঞ একজন নারীকে বিয়ে করাই তাঁর জন্য অধিক উপযুক্ত ছিল। তখন মহানবী (সা.) তাঁর এই বাস্তব কারণকে সমর্থন করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭৫৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবী (সা.) সাধারণ অবস্থায় বয়স ও মানসিক সামঞ্জস্যকে পছন্দ করলেও বাস্তব প্রয়োজন, দায়িত্ব ও কল্যাণের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। সাধারণভাবে স্বামী-স্ত্রীর বয়স কাছাকাছি হলে পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানসিক মিল এবং দাম্পত্য জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা অনেক ক্ষেত্রে সহজ হতে পারে। অনেক সমাজে স্বামীর বয়স স্ত্রীর চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়াও প্রচলিত ও বাস্তবসম্মত বলে বিবেচিত হয়। তবে এগুলো কোনো শরিয়তসম্মত বাধ্যবাধকতা নয়। যদি উভয় পক্ষ দ্বীনদার, পরিপক্ব, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন, তাহলে স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়া বিয়ের বৈধতা বা সফলতার পথে কোনো বাধা নয়।

অতএব, বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক কুসংস্কার বা প্রচলিত ধারণাকে নয়; বরং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাকে প্রাধান্য দেওয়াই একজন মুসলমানের কর্তব্য। বয়স নয়, বরং ঈমান, উত্তম চরিত্র, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহভীতি—এসবই একটি সুখী, স্থায়ী ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত ভিত্তি।