• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৫ ‍জুলাই ২০২৬

ডাক্তারদের জন্য ওষুধ কম্পানির উপঢৌকন গ্রহণ কি জায়েজ?

মুফতি দিদার হুসাইন
ডাক্তারদের জন্য ওষুধ কম্পানির উপঢৌকন গ্রহণ কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক অনৈতিক দিক হলো, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব কিংবা ওষুধ কম্পানির পক্ষ থেকে ডাক্তারদের কমিশন, উপঢৌকন ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা প্রদান করা। শরিয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

কারণ এখানে রোগীর আস্থা, চিকিৎসকের পেশাগত আমানতদারিতা এবং মানুষের সম্পদের হক জড়িত, যা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার পথকে সুগম করে। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৮)

শরিয়তের পরিভাষায় ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্ককে আকদুল ইজারা তথা সেবাভিত্তিক চুক্তি বলে। রোগী নির্ধারিত ফি প্রদান করে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে।

এ অবস্থায় রোগী হলো সেবাগ্রহীতা। আর ডাক্তার হলেন সেবাদাতা। রোগীর দায়িত্ব হলো, নিজের শারীরিক অবস্থা সঠিকভাবে জানানো এবং নির্ধারিত ফি প্রদান করা। পক্ষান্তরে ডাক্তারের দায়িত্ব হলো, রোগ নির্ণয় করে যথাযথ চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োজনভেদে বিভিন্ন টেস্ট, স্ক্যান বা ল্যাব পরীক্ষার সাহায্য নেওয়া এ দায়িত্বেরই অংশ।

অতএব রোগীর কল্যাণ বিবেচনা করে কোন টেস্ট দিতে হবে, কোথায় করালে নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়া যাবে—এসব নির্ধারণ করা ডাক্তারের পেশাগত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এ কাজের বিনিময় রোগী আগেই ভিজিট ফি প্রদান করেছে, তাই এই দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ বৈধ হতে পারে না। কারণ এ ক্ষেত্রে কমিশন গ্রহণের অর্থ হলো, ডাক্তার নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাজের জন্যই অন্যদের থেকে অর্থ গ্রহণ করছেন। আর এটা শরিয়ত নিষিদ্ধঘোষিত উেকাচের অন্তর্ভুক্ত।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ থাকব। তারা হলো : ১. যে ব্যক্তি আমার নামে অঙ্গীকার করার পর গাদ্দারি করে (অঙ্গীকার ভেঙে ফেলে)। ২. যেকোনো স্বাধীন মানুষকে (দাস বানিয়ে) বিক্রি করে তার অর্থ ভক্ষণ করে। ৩. আরেকজন হলো, সে ব্যক্তি যে কাউকে কর্মচারী বা শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করার পর তার থেকে যথাযথভাবে কাজ বুঝে নিয়েছে অথচ তাকে তার পারিশ্রমিক দেয়নি। (বুখারি, হাদিস : ২২২৭)

অন্য হাদিসে এসেছে , রাসুল (সা.) ঘুসদাতা ও ঘুসগ্রহীতা উভয়ের ওপর লানত করেছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫৮০)

অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কী হয়েছে! আমরা যাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে পাঠাই, সে বলে, এটা সরকারি সম্পদ, আর এটা আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে! সে যদি তার পিতার ঘরে বা মাতার ঘরে বসে থাকত, তাহলে কি তাকে কেউ উপহার দিত? যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তার কসম! যে কেউ এমন অবৈধ উপহার গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে তা নিজের ঘাড়ে বহন করে আসবে। (বুখারি, হাদিস : ৭১৭৪)

আজকাল বহু ওষুধ কম্পানি তাদের ব্র্যান্ডের ওষুধ প্রেসক্রাইব করানোর জন্য ডাক্তারদের নগদ অর্থ, বিদেশভ্রমণ, দামি উপহার, মোবাইল রিচার্জ কার্ড, ইলেকট্রনিক ডিভাইস কিংবা অন্যান্য সুবিধা দেয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এসবও জায়েজ নয়। এটিও শরিয়তের দৃষ্টিতে বিনিময়হীন উপঢৌকনের শামিল। কেননা চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো, রোগীর জন্য যে ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর ও উপযোগী সেটিই নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা। কোনো কম্পানির আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করলে এ নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অরগানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যানশিয়াল ইনস্টিটিউশনস (এ-এ-ও-আই-এফ-আই)-এর সিদ্ধান্ত মতে, কলম, প্যাড, খাতা, স্টাপলার, প্রেসক্রিপশন স্লিপবক্সের মতো স্বল্পমূল্যের স্টেশনারি সামগ্রী গ্রহণের সুযোগ আছে। এগুলোতে ওষুধ কম্পানির ট্রেডমার্ক, উৎপাদিত পণ্যের ট্রেডনেম ছাপানো থাকে। মূলত এগুলো কম্পানির বিজ্ঞাপন হিসেবে দেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা বৈধ নয়।

এই কমিশন সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নষ্ট হয়, নিম্নমানের ডায়াগনস্টিক সেন্টার টিকে থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় টেস্টের কারণে চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে চিকিৎসকের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত ব্যাহত হয়, রোগী-ডাক্তারের আস্থা ভেঙে পড়ে এবং চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়। এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা।
 হাদিসে এসেছে, কারো ক্ষতি করা বা একে অন্যকে ক্ষতির মুখোমুখি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। (ইবনে মাজাহ : ২৩৪০)

আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল পদ্ধতিতে ইনকাম করার তাওফিক দান করুন—আমীন।

সন্তানের আকিকা না দিলে ক্ষতি হয়? কী বলে ইসলাম?

অনলাইন ডেস্ক
সন্তানের আকিকা না দিলে ক্ষতি হয়? কী বলে ইসলাম?
সংগৃহীত ছবি

মা-বাবার জন্য মহান রবের দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার সন্তান। এ জন্য শিশুর জন্মের পর আকিকা করতে হয়। সেই সঙ্গে পশু জবাই করে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করতে হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ধন-সম্পদ আর সন্তানাদি পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ৪৬)।

অন্যদিকে হাদিসে সন্তান জন্মের পর আকিকা করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। সালমান ইবনু আমির (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, সন্তানের সঙ্গে আকিকা সম্পর্কিত। তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত (অর্থাৎ আকিকার পশু জবেহ) কর এবং তার (সন্তান) অশুচি (চুল, নখ ইত্যাদি) দূর করে দাও। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৭৬)

আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সপ্তম দিনে তার নাম রাখতে, মাথা মুণ্ডন করতে এবং আকিকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ২৮৩২)

এ ক্ষেত্রে ছেলে সন্তান হলে দু’টি ও মেয়ে সন্তান হলে একটি পশু কুরবানি দিতে হয়। ইসলামিক স্কলার মিজানুর রহমান আজহারীর মতে, আকিকা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন- ছেলে হলে দু’টি ছাগল দিয়ে আকিকা করো। আর যদি মেয়ে হয় তাহলে একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করো। আর আকিকার ক্ষেত্রে সুন্নত হলো- সন্তান ভূমিষ্ঠের ৭ দিন পর আকিকা করা। সপ্তম দিনে সন্তানের মাথার চুল ফেলে দিতে হয় এবং তার একটি সুন্দর নাম রাখতে হয়।

তবে অনেকেই বলে থাকেন আকিকার পশু শুধু নর হতে হবে। কিন্তু হাদিসে নির্দিষ্টভাবে এমন নির্দেশনা আসেনি। উম্মু কুরয রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আকিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন তিনি (নবীজি সা.) বলেন, ছেলের জন্য দুটো ছাগল আর মেয়ের জন্য একটি ছাগল আকিকা দিতে হবে। আকিকার পশু নর হোক বা মাদী হোক তোমাদের কোনো ক্ষতি (গুনাহ) হবে না। (সুনাত আত তিরমিজি, হাদিস: ১৫২২)

কিন্তু আকিকার ক্ষেত্রে অনেকেই প্রায় সময় বলে থাকেন, কেউ যদি সন্তানের আকিকা না দেন তাহলে সন্তানের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে সন্তানের ওপর বিপদ-আপদ লেগেই থাকে। আসলেই কী ইসলামে এমন কিছু আছে?

ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, ছেলে-মেয়েদের আকিকা করা অনেকটা লাইফ ইনস্যুরেন্সের মতো। সেই জায়গা থেকে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য এটা করা উচিত। কিন্তু আকিকা না দিলে সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমন কোনো কথা হাদিসে আসেনি। তবে নিরাপত্তার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাধ্য অনুযায়ী আকিকা করা উচিত।

বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা নিয়ে ইসলাম কী বলে

মুফতি ওমর বিন নাছির
বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা নিয়ে ইসলাম কী বলে
সংগৃহীত ছবি

বিয়ে ইসলামে শুধুমাত্র দুটি মানুষের একত্রে বসবাসের চুক্তি নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি পবিত্র বন্ধন। কিন্তু বিয়েকে কেন্দ্র করে সমাজে এমন অনেক প্রচলিত ধারণা রয়েছে, যার একটি হলো—স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর বয়স কম হওয়াই বাধ্যতামূলক। অনেকে তো মনে করেন যে, নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে কিংবা অনুচিত। 

মূলত ইসলাম বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সকে নয়; বরং দ্বীনদারিতা, চরিত্র, পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্ববোধ এবং দাম্পত্য জীবনের কল্যাণকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। বয়সের সামঞ্জস্যকে একটি ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটিকে কখনো বৈধতা বা অবৈধতার মানদণ্ড বানানো হয়নি। 

তাই ইসলামী শরিয়তে স্বামী-স্ত্রীর সমবয়সী হওয়া, স্বামীর বয়সে বড় হওয়া কিংবা স্ত্রীর বয়সে বড় হওয়া—সব ক্ষেত্রেই বিয়ে বৈধ। কোরআন বা সহিহ সুন্নাহর কোথাও এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যে, একজন পুরুষ নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করতে পারবে না। বরং ইসলাম এ বিষয়ে মানুষের জন্য প্রশস্ততা রেখেছে। কোন বিয়ে অধিক কল্যাণকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বীনদারিতা, চরিত্র, পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানসিক পরিপক্বতা এবং পারিবারিক বাস্তবতার ওপর।

মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে দৃষ্টান্ত
নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বয়ং মহানবী (সা.) নিজেই। তিনি সর্বপ্রথম বিবাহ করেন খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)-কে। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, খাদিজা (রা.) নবীজি (সা.)-এর চেয়ে প্রায় ১৫ বছর বয়সে বড় ছিলেন। তিনি ছিলেন সম্মানিত ব্যবসায়ী, প্রজ্ঞাবান এবং কুরাইশ সমাজের অন্যতম মর্যাদাবান নারী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত নবী (সা.) অন্য কোনো নারীকে বিবাহ করেননি। (ফিকহুস সিরাহ)
এ ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ এবং এতে কোনো অসম্মান বা অপছন্দের বিষয় নেই।

সাহাবিদের জীবন থেকে দৃষ্টান্ত
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ও উম্মে আইমান (রা.)-এর বিবাহ। উম্মে আইমান (রা.) ছিলেন নবী (সা.)-এর শৈশবের লালন-পালনকারী এবং তাঁর পরিবারের অত্যন্ত সম্মানিত সদস্য। নবী (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘যে ব্যক্তি জান্নাতি একজন নারীকে বিয়ে করতে চায়, সে যেন উম্মে আইমানকে বিয়ে করে।’ মহানবী (সা.)-এর উৎসাহে জায়েদ (রা.) তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন ইসলামের বিখ্যাত সেনাপতি উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)। (উসদুল গাবাহ, আল-ইসাবাহ)
এ ঘটনাও প্রমাণ করে যে, স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়া ইসলামে কোনো বাধা নয়।

তবে পবিত্র কোরআনে জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেখানে থাকবে সমবয়সী সঙ্গিনীরা।’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ৫২)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আমি জান্নাতি নারীদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব, আমি তাদের বানাবো কুমারী, প্রেমময় ও সমবয়সী।’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ৩৫–৩৮)

তাফসিরবিদরা উল্লেখ করেছেন, এখানে ‘সমবয়সী’ হওয়ার বর্ণনা জান্নাতের পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্য ও পারস্পরিক সামঞ্জস্যের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে এসেছে। তবে এটি পৃথিবীতে বিয়ের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়। বরং এটি দাম্পত্য জীবনে মানসিক ও আচরণগত সামঞ্জস্যের গুরুত্বের প্রতি একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করে।

একটি ঘটনা
বিশিষ্ট সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর ঘটনা একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.)- তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুমি কি কুমারী মেয়েকে বিয়ে করতে পারতে না, তাহলে তোমরা একে অপরের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করতে?’ জাবির (রা.) বলেন যে, তাঁর ছোট ছোট বোনদের দেখাশোনার জন্য অভিজ্ঞ একজন নারীকে বিয়ে করাই তাঁর জন্য অধিক উপযুক্ত ছিল। তখন মহানবী (সা.) তাঁর এই বাস্তব কারণকে সমর্থন করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭৫৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবী (সা.) সাধারণ অবস্থায় বয়স ও মানসিক সামঞ্জস্যকে পছন্দ করলেও বাস্তব প্রয়োজন, দায়িত্ব ও কল্যাণের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। সাধারণভাবে স্বামী-স্ত্রীর বয়স কাছাকাছি হলে পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানসিক মিল এবং দাম্পত্য জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা অনেক ক্ষেত্রে সহজ হতে পারে। অনেক সমাজে স্বামীর বয়স স্ত্রীর চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়াও প্রচলিত ও বাস্তবসম্মত বলে বিবেচিত হয়। তবে এগুলো কোনো শরিয়তসম্মত বাধ্যবাধকতা নয়। যদি উভয় পক্ষ দ্বীনদার, পরিপক্ব, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন, তাহলে স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়া বিয়ের বৈধতা বা সফলতার পথে কোনো বাধা নয়।

অতএব, বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক কুসংস্কার বা প্রচলিত ধারণাকে নয়; বরং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাকে প্রাধান্য দেওয়াই একজন মুসলমানের কর্তব্য। বয়স নয়, বরং ঈমান, উত্তম চরিত্র, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহভীতি—এসবই একটি সুখী, স্থায়ী ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত ভিত্তি।

হাদিসের বাণী

মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর যে কারণে কাঁদতেন উম্মে আইমান (রা.)

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর যে কারণে কাঁদতেন উম্মে আইমান (রা.)
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আনাস (রা.)- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর ইন্তিকালের পর আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বললেন, মহানবী (সা.) যেভাবে উম্মে আইমান (রা.)-এর সাক্ষাতে যেতেন, চলুন, আমরাও তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে যাই। তাঁরা উম্মে আইমান (রা.)-এর কাছে গেলে উম্মে আইমান (রা.) কান্না করতে লাগলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি কি জানেন না যে, মহানবী (সা.)-এর জন্য (ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়া থেকে) আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর কাছে মহানবী (সা.)-এর জন্য কী উত্তম জিনিস আছে, তা আমি জানি। তবে আমি সে কারণে কাঁদছি না। আমি এজন্য কাঁদছি যে, আসমান থেকে ওহি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। একপর্যায়ে উম্মে আইমান (রা.)-এর কান্না তাঁদের কাঁদতে বাধ্য করল। ফলে তাঁরাও তাঁর সঙ্গে কাঁদতে লাগলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৩১৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৩৫৯)


শিক্ষা ও বিধান 

১. নেককার ব্যক্তিদের খোঁজখবর নেওয়া ও তাঁদের সম্মান করা উচিত। আর উম্মে আইমান (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবিয়া।

২. ওহি ছিল উম্মাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত। উম্মে আইমান (রা.)-এর কান্নার প্রধান কারণ ছিল ওহি বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর সাহাবায়ে কেরাম দুনিয়াবি ক্ষতির চেয়ে দ্বীনের ক্ষতিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

৩. আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। তিনি জানতেন যে, আল্লাহর কাছে মহানবী (সা.)-এর জন্য দুনিয়ার চেয়ে উত্তম প্রতিদান রয়েছে। তাই তাঁর কান্না আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি ছিল না।

৪. আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও দ্বীনের প্রতি গভীর আবেগ। মূলত তাঁর আবেগ-অনুভূতি ছিল দ্বীনের কল্যাণকে কেন্দ্র করে, ব্যক্তিগত স্বার্থকে নয়।

৫. নেককার মানুষের কান্না অন্যদের হৃদয়কেও নরম করে। উম্মে আইমান (রা.)-এর আন্তরিক আবেগ দেখে আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)-ও কেঁদে ফেলেন। এটি ঈমানদারদের পারস্পরিক হৃদ্যতার প্রমাণ।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের কাছে দুনিয়ার কোনো ক্ষতির চেয়ে দ্বীনের ক্ষতি বেশি বেদনাদায়ক হওয়া উচিত। একই সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ, নেককার মানুষের খোঁজ নেওয়া এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।