• ই-পেপার

সন্তানের আকিকা না দিলে ক্ষতি হয়? কী বলে ইসলাম?

বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা নিয়ে ইসলাম কী বলে

মুফতি ওমর বিন নাছির
বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা নিয়ে ইসলাম কী বলে
সংগৃহীত ছবি

বিয়ে ইসলামে শুধুমাত্র দুটি মানুষের একত্রে বসবাসের চুক্তি নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি পবিত্র বন্ধন। কিন্তু বিয়েকে কেন্দ্র করে সমাজে এমন অনেক প্রচলিত ধারণা রয়েছে, যার একটি হলো—স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর বয়স কম হওয়াই বাধ্যতামূলক। অনেকে তো মনে করেন যে, নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে কিংবা অনুচিত। 

মূলত ইসলাম বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সকে নয়; বরং দ্বীনদারিতা, চরিত্র, পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্ববোধ এবং দাম্পত্য জীবনের কল্যাণকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। বয়সের সামঞ্জস্যকে একটি ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটিকে কখনো বৈধতা বা অবৈধতার মানদণ্ড বানানো হয়নি। 

তাই ইসলামী শরিয়তে স্বামী-স্ত্রীর সমবয়সী হওয়া, স্বামীর বয়সে বড় হওয়া কিংবা স্ত্রীর বয়সে বড় হওয়া—সব ক্ষেত্রেই বিয়ে বৈধ। কোরআন বা সহিহ সুন্নাহর কোথাও এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যে, একজন পুরুষ নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করতে পারবে না। বরং ইসলাম এ বিষয়ে মানুষের জন্য প্রশস্ততা রেখেছে। কোন বিয়ে অধিক কল্যাণকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বীনদারিতা, চরিত্র, পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানসিক পরিপক্বতা এবং পারিবারিক বাস্তবতার ওপর।

মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে দৃষ্টান্ত
নিজের চেয়ে বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বয়ং মহানবী (সা.) নিজেই। তিনি সর্বপ্রথম বিবাহ করেন খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)-কে। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, খাদিজা (রা.) নবীজি (সা.)-এর চেয়ে প্রায় ১৫ বছর বয়সে বড় ছিলেন। তিনি ছিলেন সম্মানিত ব্যবসায়ী, প্রজ্ঞাবান এবং কুরাইশ সমাজের অন্যতম মর্যাদাবান নারী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত নবী (সা.) অন্য কোনো নারীকে বিবাহ করেননি। (ফিকহুস সিরাহ)
এ ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বয়সে বড় নারীকে বিয়ে করা ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ এবং এতে কোনো অসম্মান বা অপছন্দের বিষয় নেই।

সাহাবিদের জীবন থেকে দৃষ্টান্ত
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ও উম্মে আইমান (রা.)-এর বিবাহ। উম্মে আইমান (রা.) ছিলেন নবী (সা.)-এর শৈশবের লালন-পালনকারী এবং তাঁর পরিবারের অত্যন্ত সম্মানিত সদস্য। নবী (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘যে ব্যক্তি জান্নাতি একজন নারীকে বিয়ে করতে চায়, সে যেন উম্মে আইমানকে বিয়ে করে।’ মহানবী (সা.)-এর উৎসাহে জায়েদ (রা.) তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন ইসলামের বিখ্যাত সেনাপতি উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)। (উসদুল গাবাহ, আল-ইসাবাহ)
এ ঘটনাও প্রমাণ করে যে, স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়া ইসলামে কোনো বাধা নয়।

তবে পবিত্র কোরআনে জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেখানে থাকবে সমবয়সী সঙ্গিনীরা।’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ৫২)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আমি জান্নাতি নারীদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব, আমি তাদের বানাবো কুমারী, প্রেমময় ও সমবয়সী।’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ৩৫–৩৮)

তাফসিরবিদরা উল্লেখ করেছেন, এখানে ‘সমবয়সী’ হওয়ার বর্ণনা জান্নাতের পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্য ও পারস্পরিক সামঞ্জস্যের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে এসেছে। তবে এটি পৃথিবীতে বিয়ের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়। বরং এটি দাম্পত্য জীবনে মানসিক ও আচরণগত সামঞ্জস্যের গুরুত্বের প্রতি একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করে।

একটি ঘটনা
বিশিষ্ট সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর ঘটনা একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.)- তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুমি কি কুমারী মেয়েকে বিয়ে করতে পারতে না, তাহলে তোমরা একে অপরের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করতে?’ জাবির (রা.) বলেন যে, তাঁর ছোট ছোট বোনদের দেখাশোনার জন্য অভিজ্ঞ একজন নারীকে বিয়ে করাই তাঁর জন্য অধিক উপযুক্ত ছিল। তখন মহানবী (সা.) তাঁর এই বাস্তব কারণকে সমর্থন করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭৫৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবী (সা.) সাধারণ অবস্থায় বয়স ও মানসিক সামঞ্জস্যকে পছন্দ করলেও বাস্তব প্রয়োজন, দায়িত্ব ও কল্যাণের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। সাধারণভাবে স্বামী-স্ত্রীর বয়স কাছাকাছি হলে পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানসিক মিল এবং দাম্পত্য জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা অনেক ক্ষেত্রে সহজ হতে পারে। অনেক সমাজে স্বামীর বয়স স্ত্রীর চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়াও প্রচলিত ও বাস্তবসম্মত বলে বিবেচিত হয়। তবে এগুলো কোনো শরিয়তসম্মত বাধ্যবাধকতা নয়। যদি উভয় পক্ষ দ্বীনদার, পরিপক্ব, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন, তাহলে স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়া বিয়ের বৈধতা বা সফলতার পথে কোনো বাধা নয়।

অতএব, বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক কুসংস্কার বা প্রচলিত ধারণাকে নয়; বরং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাকে প্রাধান্য দেওয়াই একজন মুসলমানের কর্তব্য। বয়স নয়, বরং ঈমান, উত্তম চরিত্র, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহভীতি—এসবই একটি সুখী, স্থায়ী ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত ভিত্তি।

হাদিসের বাণী

মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর যে কারণে কাঁদতেন উম্মে আইমান (রা.)

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর যে কারণে কাঁদতেন উম্মে আইমান (রা.)
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আনাস (রা.)- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর ইন্তিকালের পর আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বললেন, মহানবী (সা.) যেভাবে উম্মে আইমান (রা.)-এর সাক্ষাতে যেতেন, চলুন, আমরাও তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে যাই। তাঁরা উম্মে আইমান (রা.)-এর কাছে গেলে উম্মে আইমান (রা.) কান্না করতে লাগলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি কি জানেন না যে, মহানবী (সা.)-এর জন্য (ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়া থেকে) আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর কাছে মহানবী (সা.)-এর জন্য কী উত্তম জিনিস আছে, তা আমি জানি। তবে আমি সে কারণে কাঁদছি না। আমি এজন্য কাঁদছি যে, আসমান থেকে ওহি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। একপর্যায়ে উম্মে আইমান (রা.)-এর কান্না তাঁদের কাঁদতে বাধ্য করল। ফলে তাঁরাও তাঁর সঙ্গে কাঁদতে লাগলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৩১৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৩৫৯)


শিক্ষা ও বিধান 

১. নেককার ব্যক্তিদের খোঁজখবর নেওয়া ও তাঁদের সম্মান করা উচিত। আর উম্মে আইমান (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবিয়া।

২. ওহি ছিল উম্মাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত। উম্মে আইমান (রা.)-এর কান্নার প্রধান কারণ ছিল ওহি বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর সাহাবায়ে কেরাম দুনিয়াবি ক্ষতির চেয়ে দ্বীনের ক্ষতিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

৩. আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। তিনি জানতেন যে, আল্লাহর কাছে মহানবী (সা.)-এর জন্য দুনিয়ার চেয়ে উত্তম প্রতিদান রয়েছে। তাই তাঁর কান্না আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি ছিল না।

৪. আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও দ্বীনের প্রতি গভীর আবেগ। মূলত তাঁর আবেগ-অনুভূতি ছিল দ্বীনের কল্যাণকে কেন্দ্র করে, ব্যক্তিগত স্বার্থকে নয়।

৫. নেককার মানুষের কান্না অন্যদের হৃদয়কেও নরম করে। উম্মে আইমান (রা.)-এর আন্তরিক আবেগ দেখে আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)-ও কেঁদে ফেলেন। এটি ঈমানদারদের পারস্পরিক হৃদ্যতার প্রমাণ।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের কাছে দুনিয়ার কোনো ক্ষতির চেয়ে দ্বীনের ক্ষতি বেশি বেদনাদায়ক হওয়া উচিত। একই সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ, নেককার মানুষের খোঁজ নেওয়া এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

আইসিটি উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বে এগিয়ে সৌদি আরব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আইসিটি উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বে এগিয়ে সৌদি আরব
সংগৃহীত ছবি

ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্য-প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে সৌদি আরব। ‘আইটিইউ’ প্রকাশিত ২০২৬ সালের আইসিটি উন্নয়নসূচক বিশ্বের ১৫৯টি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে দেশটি। আইটিইউর এই সূচকে বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল অগ্রগতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) ব্যবহার এবং সেবার মান মূল্যায়ন করা হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংযোগ ও কার্যকর সংযোগ—এ দুটি প্রধান সূচককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি কমিশন (সিআইটিসি) জানিয়েছে, এই অসাধারণ অর্জন দেশের প্রযুক্তি খাতের ধারাবাহিক আধুনিকায়ন, দূরদর্শী নেতৃত্বের নীতিগত সহায়তা এবং শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামোরই বাস্তব প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বের অবস্থানকে আরো সুসংহত করেছে। সিআইটিসির মতে, উন্নত নিয়ন্ত্রক কাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে নেওয়া কার্যকর উদ্যোগগুলো সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সৌদি আরবের যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বাজারের আকার বেড়ে ১৯৯ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালে পৌঁছেছে। গত পাঁচ বছরে এই খাতের চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি বাজার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করেছে দেশটি।

ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রেও ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে সৌদি আরব। সিআইটিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ১০০ শতাংশ, একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের মালিকানার হারও ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ১৫১ এমবিপিএস এবং মোবাইল ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ২১৬ এমবিপিএস, যা বিশ্বের অন্যতম উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিচয় বহন করে। সৌদি আরবের এই অর্জন দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার কৌশলের সফল বাস্তবায়নের প্রতিফলন।
 

যুবকদের উদ্দেশে যা বললেন মসজিদে নববির ইমাম শায়খ আল-হুজাইফি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যুবকদের উদ্দেশে যা বললেন মসজিদে নববির ইমাম শায়খ আল-হুজাইফি
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কিছু বাণী আছে, যা জীবন পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা। মহানবী (সা.)-এর এমনই এক অনন্য উপদেশ-বাণীকে কেন্দ্র করে যুবকদের উদ্দেশে পবিত্র মসজিদে নববির জুমার খুতবায় হৃদয়স্পর্শী আলোচনা করেছেন মসজিদে নববির সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আলী বিন আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি। 

তিনি খুতবার শুরুতেই সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উদ্দেশ করে মহানবী (সা.)-এর সেই অমূল্য উপদেশটি স্মরণ করিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিক্ষা দিচ্ছি। আল্লাহকে রক্ষা করো (অর্থাৎ তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলো), তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে। যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে। জেনে রাখো, যদি সমগ্র উম্মত তোমার কোনো উপকার করতে একত্রিত হয়, তবে তারা আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কোনো উপকার করতে পারবে না। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে একত্রিত হয়, তবে আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কোনো ক্ষতিও করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং তাকদিরের পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।’

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ হাদিসে একজন মুসলিমের জীবনের সব মৌলিক নীতিমালা স্থান পেয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আল্লাহকে রক্ষা করো’—এর অর্থ আল্লাহর আদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা, তাঁর নিষেধ থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর নির্ধারিত সীমারেখাকে সম্মান করা। যে ব্যক্তি এভাবে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা, কল্যাণ ও সফলতা দান করেন।

তিনি পবিত্র কোরআনের সেই সুসংবাদ স্মরণ করিয়ে দেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে—সে পুরুষ হোক কিংবা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করব এবং তাদের কর্মের সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করব।’
তারপর তিনি আল্লাহর সেই অঙ্গীকার তুলে ধরেন, যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’

শায়খ আল-হুজাইফি আরো বলেন, তাকওয়ার বরকত শুধু ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি সুরা কাহফ-এ বর্ণিত দুই এতিম শিশুর ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে তাদের নেককার পিতার কারণে আল্লাহ তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করেছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায়, একজন পিতার নেক আমল সন্তানের জন্যও রহমত ও নিরাপত্তার কারণ হতে পারে। এ কারণেই সলফে সালেহিন নিজেদের আমল বৃদ্ধি করতেন এই আশায় যে আল্লাহ তাঁদের সন্তানদেরও হেফাজত করবেন।

শায়খ আল-হুজাইফি ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত—নামাজের গুরুত্বও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নামাজ যথাযথভাবে আদায় করে, নামাজের রুকন, শর্ত ও খুশু-খুজু রক্ষা করে, তার জন্য ইসলামের অন্যান্য ইবাদত ও আনুগত্যের কাজ সংরক্ষণ করা সহজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে তিনি দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থানের হেফাজত করা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং ইসলামী শিষ্টাচার অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। 

তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর ব্যাখ্যা করেন, ‘আল্লাহকে রক্ষা করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে।’ এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন। তিনি তাকে সঠিক পথের দিশা দেন, বিপদে সাহায্য করেন, শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় দান করেন এবং সর্বাবস্থায় তাঁর রহমত ও তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাই একজন মুমিনের জীবনে যত বিপদ-মুসিবতই আসুক না কেন, যদি সে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে, তবে সেই কষ্টই তার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং গুনাহ মাফের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

খুতবায় তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। শায়খ আল-হুজাইফি বলেন, প্রকৃত মুসলমান শুধু আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করে এবং একমাত্র তাঁর ওপরই নির্ভর করে। কারণ উপকার ও ক্ষতির প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ। আসমান ও জমিনের সব ভাণ্ডারের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে। তাই এমন বিষয়ে কোনো সৃষ্টির সাহায্য চাওয়া, যা একমাত্র আল্লাহই করতে সক্ষম, তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

তিনি হাদিসের শেষ অংশ—‘কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে’—এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মাধ্যমে তাকদিরের প্রতি দৃঢ় ঈমানের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা অবশ্যই ঘটবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ চেষ্টা-প্রচেষ্টা ছেড়ে দেবে। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, বৈধ উপায় অবলম্বন করবে এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখবে। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।