মানব ইতিহাসে এমন শাসক খুব কমই এসেছেন, যাদের ক্ষমতা যত বেড়েছে, বিনয় তত গভীর হয়েছে। যাদের মর্যাদা যত উচ্চতায় পৌঁছেছে, আল্লাহভীতি তত বেশি তাদের অন্তরে স্থান করে নিয়েছে। ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা, আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ছিলেন এমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বিজয়ী সাম্রাজ্যের শাসক, কিন্তু একই সঙ্গে ছিলেন নিজের ভুলের কঠোর সমালোচক। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও আল্লাহভীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
খোলাফায়ে রাশেদার সোনালী যুগে মুসলিম বাহিনী একের পর এক বিজয় অর্জন করছিল। সেই সময় খেলাফতের রাজধানী ছিল মদিনা। আমিরুল মুমিনীন ওমর (রা.) যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরিত প্রতিটি বাহিনীকে নির্দেশ দিতেন, যেন যুদ্ধের সকল তথ্য নিয়মিত মদিনায় পাঠানো হয় এবং বিজয়-পরাজয় যাই ঘটুক, তা যেন তাকে জানানো হয়।
একবার আহনাফ ইবনে কায়েস (রা.) কয়েকজন সঙ্গীসহ এক মহান বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে মদিনায় উপস্থিত হন। তাদের আগমনের পর ওমর (রা.) জানতে চাইলেন তারা কোথায় অবস্থান করছেন। এরপর তিনি নিজেই তাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, দীর্ঘ পথ চলার কারণে উটগুলো অত্যন্ত ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছে। উটগুলোর অবস্থা দেখে তিনি ব্যথিত হয়ে বললেন, ‘তোমরা কি এই আরোহী প্রাণীগুলোর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? তোমরা কি জানো না, এদেরও তোমাদের উপর অধিকার রয়েছে? তোমরা কেন তাদের ছেড়ে দিলে না, যাতে তারা কিছু ঘাস খেতে পারে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আমরা মহান বিজয়ের সুসংবাদ দ্রুত আপনার ও মুসলমানদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পথে কোথাও থামিনি।’
এরপর ওমর (রা.) তাদের সঙ্গে ফিরে আসছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হলো। সে বলল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! অমুক ব্যক্তি আমার ওপর জুলুম করেছে। আপনি আমাকে সাহায্য করুন।’ তখন ওমর (রা.) রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন। হঠাৎ অভিযোগ শুনে তিনি কিছুটা বিরক্ত হলেন। তিনি নিজের চাবুক দিয়ে লোকটির মাথায় হালকা আঘাত করে বললেন, ‘আশ্চর্যের বিষয়! ওমর যখন মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত, তখন তোমরা এসে বলতে থাকো—আমাকে সাহায্য করুন!’
লোকটি তখন নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ওমর (রা.)-এর অন্তরে তীব্র অনুশোচনা জেগে উঠে। তিনি উপলব্ধি করলেন, একজন শাসকের কাছে সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তি কখনো অবহেলার পাত্র হতে পারে না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেই লোকটিকে আবার ডেকে আনলেন। লোকটি এলে নিজের চাবুক তার সামনে রেখে বললেন, ‘নাও, তুমি আমার ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করো।’ লোকটি বলল, ‘না, আমি প্রতিশোধ নেব না। আমি বিষয়টি আল্লাহর ওপর এবং আপনার ওপর ছেড়ে দিলাম।’ কিন্তু ওমর (রাঃ) তাতে সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি বললেন, ‘না, বিষয়টি এভাবে শেষ হবে না। তুমি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমাকে ক্ষমা করে দাও, অথবা আমার কাছ থেকে তোমার বদলা নিয়ে নাও।’
অবশেষে লোকটি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁকে ক্ষমা করে দেন। ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়নি। বাড়িতে ফিরে ওমর (রা.) দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি নিজের নফসকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন— ‘হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি এক সময় ছিলে নগণ্য, আল্লাহ তোমাকে মর্যাদা দিয়েছেন। তুমি পথভ্রষ্ট ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হেদায়াত দিয়েছেন। তুমি ছিলে অপমানিত, আল্লাহ তোমাকে সম্মানিত করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তোমাকে মানুষের শাসক বানিয়েছেন। আর আজ এক মজলুম ব্যক্তি তোমার কাছে সাহায্য চাইতে এলো, আর তুমি তাকে আঘাত করলে! কিয়ামতের দিন যখন তুমি তোমার রবের সামনে দাঁড়াবে, তখন এর কী জবাব দেবে?’ তিনি এত এমনভাবে নিজেকে তিরস্কার করছিলেন যে, আহনাফ ইবনে কায়েস (রা.) দেখে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে নিলাম, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের অন্যতম।’
খলিফা ওমর (রা.) শুধু বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের শাসকই ছিলেন না; বরং ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের একটি ছোট ভুলের জন্যও গভীরভাবে অনুতপ্ত হতেন এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে কেঁপে উঠতেন। আজ যখন ক্ষমতা ও নেতৃত্ব অনেক সময় অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন ওমর (রা.)-এর এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত নেতৃত্ব হলো মানুষের সেবা করা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রতিটি কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি হৃদয়ে লালন করা। তাঁর অনুশোচনার এই ঘটনা যুগে যুগে ন্যায়পরায়ণতা, আত্মসমালোচনা ও তাকওয়ার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। (ইবনুল আসির, উসদুল গাবাহ, ৩/৬৫৩-৬৫৪; ইমাম ইবনুল জাওজি, মানাকিবে ওমর, ১০৯ পৃ., ইবনু আসাকির, তারিখু দিমাশক্ব, ৪৪/২৯১-২৯২)




