• ই-পেপার

একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের হৃদয়স্পর্শী অনুশোচনা

সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

মুফতি সাঈদ আহমাদ যশোরী
সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আজ ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার), টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতি মানবজীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। আজ অনেকের দিন শুরু হয় মোবাইলের স্ক্রিন দেখে, আর শেষ হয় সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে। ফলে অজান্তেই প্রযুক্তি মানুষের জীবন পরিচালনার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

নামাজে যেমন ইমাম সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন আর মুক্তাদি তাঁর অনুসরণ করেন, তেমনি আধুনিক সমাজে অনেক মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি মূল্যবোধও অনেকাংশে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। একজন মুমিনের জন্য এটি গভীরভাবে ভাবনার বিষয়। কারণ ইসলাম মানুষকে পরিস্থিতির দাস নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রিত, সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।’(সুরা : আসর, আয়াত : ১-২)

বর্তমানে অসংখ্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটিয়ে দেন, অথচ দিনের শেষে উপলব্ধি করেন যে তারা উল্লেখযোগ্য কোনো উপকারই অর্জন করেননি। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব একদিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার পদযুগল নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)

সুতরাং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করা প্রতিটি মিনিটও আমাদের আমলনামার অংশ।

চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছি না তো?
সোশ্যাল মিডিয়ার অন্যতম বড় প্রভাব হলো এটি মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। কী ট্রেন্ডিং, কী জনপ্রিয়, কে কী বলছে—এসব দেখে অনেক মানুষ নিজের বিবেক ও বিচারশক্তির পরিবর্তে জনমতের অনুসারী হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’(সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৬)

এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।


ইসলাম মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দেয়। একজন মুমিন কখনো তার ইচ্ছা, আবেগ কিংবা পরিবেশের অন্ধ অনুসারী হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজের নফসকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, তার আবাস হবে জান্নাত।;’ (সুরা : নাজিআত, আয়াত : ৪০-৪১)

আজকের দিনে নফসের অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, সময় অপচয় এবং ডিজিটাল আসক্তি। একজন সচেতন মুসলিমকে এসব বিষয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে হবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম লক্ষণ হলো, সে অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭)

সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন অসংখ্য বিষয় রয়েছে যা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ের জন্যই কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। একজন মুমিনের উচিত উপকারী জ্ঞান, ইসলামী শিক্ষা, ব্যবসায়িক দক্ষতা, শিক্ষামূলক বিষয় এবং সমাজকল্যাণমূলক কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

আর সোশ্যাল মিডিয়াকে মুক্তাদি বানানোর অর্থ প্রযুক্তি বর্জন করা নয়; বরং প্রযুক্তিকে নিজের লক্ষ্য ও মূল্যবোধের অধীনস্থ করা। অর্থাৎ— আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার দাস হব না, আমরা সময় নির্ধারণ করে ব্যবহার করব, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং কমিয়ে আনব, উপকারী ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট অনুসরণ করব, গিবত, অপবাদ, অশ্লীলতা ও ফিতনা থেকে দূরে থাকব, প্রযুক্তিকে দ্বীনের খেদমত, জ্ঞান অর্জন ও আত্মউন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করব ইত্যাদি। যখন প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব—তখনই সোশ্যাল মিডিয়া মুক্তাদি হবে আর আমরা নিজেদের জীবনের ইমাম হতে পারব।

একজন মুমিনের ডিজিটাল নীতিমালা
১. দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা।
২. ফজর ও এশার পর অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার কমানো।
৩. প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত ও ইসলামী জ্ঞানার্জনের জন্য নির্ধারণ করা।
৪. কোনো খবর শেয়ার করার আগে যাচাই করা।
৫. গিবত, তর্ক-বিতর্ক ও অশ্লীল কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা।
৬. বাস্তব জীবনের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৭. প্রতিদিন নিজের স্ক্রিন টাইম পর্যালোচনা করা।


সোশ্যাল মিডিয়া একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারে, আবার সময় ও চিন্তার স্বাধীনতাও কেড়ে নিতে পারে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে না যাওয়া। ইসলাম আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা এবং সময়ের মূল্য শেখায়। সুতরাং আসুন, আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে আমাদের জীবনের ইমাম না বানিয়ে তাকে মুক্তাদির আসনে বসাই। আমাদের চিন্তা, সময়, আমল এবং জীবন পরিচালনার নেতৃত্ব যেন থাকে কোরআন, সুন্নাহ ও বিবেকের হাতে। তখনই আমরা প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে পারব এবং দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় ক্ষেত্রেই সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারব। মনে রাখতে হবে, একজন মুমিনের হাতে প্রযুক্তি একটি উপকারী হাতিয়ার; কিন্তু প্রযুক্তির হাতে একজন মুমিন কখনো খেলনা হতে পারে না।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, মারকাজুল কোরআন ঢাকা। 

খুতবা থামিয়ে মসজিদে নববীর ইমামের সতর্কবার্তা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
খুতবা থামিয়ে মসজিদে নববীর ইমামের সতর্কবার্তা
সংগৃহীত ছবি

মদিনার পবিত্র মসজিদে নববিতে জুমার খুতবার সময় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মসজিদে নববির ইমাম ড. সালাহ আল-বুদাইর খুতবার মাঝখানে কিছুক্ষণের জন্য বক্তব্য থামিয়ে উপস্থিত ফটোগ্রাফার ও চিত্রগ্রহণকারীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছবি ও ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে যেন তারা এমন কোনো আচরণ না করেন, যা মুসল্লিদের কষ্ট দেয় বা তাদের ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ইমামের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য মুহূর্তেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং পবিত্র স্থানগুলোতে ফটোগ্রাফি ও ভিডিও ধারণের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দেয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মসজিদ, হারামাইন শরিফাইন এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থানে মোবাইল ফোন ও ক্যামেরার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক মুসল্লি, ওমরাহ পালনকারী ও জিয়ারতকারী নিজেদের স্মৃতিময় মুহূর্ত সংরক্ষণ কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করার উদ্দেশ্যে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। তবে অনেকের মতে, অতিরিক্ত চিত্রগ্রহণ কখনো কখনো ইবাদতের গভীরতা, একাগ্রতা এবং পবিত্র পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বিশেষ করে নামাজ, দোয়া, তাওয়াফ কিংবা অন্যান্য ইবাদতের সময় ক্যামেরার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আলেম ও সচেতন মুসল্লিরা। কেননা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা; সেটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনের বিষয় বানানো উচিত নয়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মৃতি সংরক্ষণ বা তথ্য প্রচারের উদ্দেশ্যে সীমিত ও শালীনভাবে ছবি তোলা এক বিষয়, আর ইবাদতের পরিবেশ ব্যাহত করে কিংবা অন্যের একাগ্রতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে চিত্রগ্রহণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা, নীরবতা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এ বিষয়ে অধিক সচেতনতা প্রয়োজন। মসজিদে নববির ইমাম ড. সালাহ আল-বুদাইরের এই সতর্কবার্তা তাই শুধু উপস্থিত কয়েকজন ফটোগ্রাফারের জন্য নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ইবাদত ও আত্মপ্রদর্শনের মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখা সম্পর্কে সমগ্র মুসলিম সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণিকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পৃথিবীর বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কবরস্থান ‘ওয়াদি আসসালাম’

ইসলামী জীবন ডেস্ক
পৃথিবীর বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কবরস্থান ‘ওয়াদি আসসালাম’
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে এমন একটি কবরস্থান রয়েছে, যা শুধু মৃতদের আবাসস্থলই নয়; বরং ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সভ্যতার এক বিস্ময়কর সাক্ষী। আধুনিক ইরাকের পবিত্র নাজাফ নগরীতে অবস্থিত ‘ওয়াদি আসসালাম’ বা ‘শান্তির উপত্যকা’ পৃথিবীর বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কবরস্থান হিসেবে সুপরিচিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লাখো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠা এই কবরস্থান আজও বিশ্বের মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।

প্রায় ১ হাজার ৪৮৫ একর বা ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল কবরস্থানকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কবরস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে অসংখ্য মানুষকে দাফন করা হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এখানে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি মৃতদেহ সমাহিত রয়েছে। এর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ওয়াদি আসসালাম মুসলিম বিশ্বের, বিশেষত শিয়া মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্থান। এই কবরস্থানের পাশেই অবস্থিত ইসলামের চতুর্থ খলিফা, মহানবী (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা আলী (রা.)-এর পবিত্র মাজার। একই সঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থানও এখানে অবস্থিত। এছাড়া স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জনশ্রুতি অনুসারে আল্লাহর নবী হুদ (আ.) এবং সালেহ (আ.)-এর কবরও এই এলাকায় রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। 

জনশ্রুতি আছে যে, ইবরাহিম (আ.) একবার তাঁর পুত্র ইসহাক (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান নাজাফ অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। সে সময় এলাকাটি নিয়মিত ভূমিকম্পপ্রবণ ছিল। কিন্তু তিনি সেখানে অবস্থানকালে ভূমিকম্প বন্ধ হয়ে যায়। এক রাতে তিনি পাশের একটি গ্রামে গেলে পুনরায় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এতে এলাকাবাসী তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাসের অনুরোধ জানায়। যদিও তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি, তবে স্থানীয়দের কাছ থেকে নিজের নামে একখণ্ড জমি ক্রয় করেন। আর সেই জমিই পরবর্তীকালে ‘ওয়াদি আসসালাম’ কবরস্থানে রূপ নেয়।

ওয়াদি আসসালামের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, দূর থেকে এটি কোনো সাধারণ কবরস্থান বলে মনে হয় না। বরং এটি যেন মৃতদের এক বিশাল শহর। সারি সারি কবর, সমাধিকক্ষ, গম্বুজ এবং বিশেষ স্থাপত্যশৈলী পুরো এলাকাকে একটি স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। অধিকাংশ কবর পোড়ামাটির ইট দিয়ে নির্মিত এবং সেগুলোর ওপর প্লাস্টার করে কোরআনের আয়াত, দোয়া ও বিভিন্ন ধর্মীয় বাণী খোদাই করা হয়েছে। এখানে শুধু একক কবর নয়, রয়েছে বহু পারিবারিক সমাধিকক্ষও। 

জায়গার সংকট মোকাবিলায় ওয়াদি আসসালামে গড়ে তোলা হয়েছে ভূগর্ভস্থ সমাধিকক্ষ ও সুড়ঙ্গপথ। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাওয়া যায় এমন অনেক কক্ষে একসঙ্গে ৩০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত মৃতদেহ দাফনের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের বহুস্তরবিশিষ্ট সমাধি ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্য কোনো কবরস্থানে খুব কমই দেখা যায়। ফলে ওয়াদি আসসালাম শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে নির্মিত কবরগুলোর অধিকাংশই প্রায় তিন মিটার উঁচু এবং গোলাকার চূড়াবিশিষ্ট ছিল। এগুলো দূর থেকেও সহজে চোখে পড়ত। বর্তমানে নতুন নির্মিত কবরগুলোতে আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া স্পষ্ট। আগের ইট ও প্লাস্টারের পরিবর্তে এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মার্বেল, গ্রানাইট ও অন্যান্য মূল্যবান পাথর। হাতে খোদাইয়ের পরিবর্তে অত্যাধুনিক লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে মৃত ব্যক্তির নাম, ছবি এবং কোরআনের আয়াত খোদাই করা হচ্ছে।

ইরাকের বিপুলসংখ্যক শিয়া মুসলমানের কবর এই কবরস্থানে রয়েছে। অতীতে ভারত, লেবানন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও মৃতদেহ এনে এখানে দাফন করার প্রচলন ছিল। তবে কবরস্থানটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য নয়। ধনী-গরিব, আলেম-উলামা, রাজনীতিবিদ কিংবা সাধারণ মানুষ—সবার জন্যই এখানে সমাহিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ওয়াদি আসসালাম শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম কবরস্থানই নয়; এটি মানবসভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মৃত্যুচিন্তার এক অনন্য প্রতীক। শত শত বছর ধরে লাখো মানুষের শেষ ঠিকানা হয়ে থাকা এই বিশাল কবরস্থান মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী সত্যকে। সব মিলিয়ে ওয়াদি আসসালাম আজ বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর ও আলোচিত কবরস্থানে পরিণত হয়েছে, যা প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে চলেছে গবেষক, পর্যটক এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়। (তথ্যঋণ : আনাদোলা এজেন্সী, উইকিপিডিয়া) 

কোরআনের বাণী

শিরকের ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শিরকের ভয়াবহ পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 

 اِنَّكُمۡ وَ مَا تَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ ؕ اَنۡتُمۡ لَهَا وٰرِدُوۡنَ 

সরল অনুবাদ :
‘নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের উপাসনা কর, সেগুলো তো জাহান্নামের জ্বালানী। তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৯৮)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
এই আয়াত মক্কার মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। যারা লাত, মানাত, উজ্যা ও হুবালের উপাসনা করত। তবে এই সব মূর্তি ছিল পাথরের তৈরী, যা ছিল জড়, অচেতন ও জ্ঞানহীন। সেই কারণে আয়াতে مَا تَعبُدُون’  শব্দ ব্যবহার হয়েছে। আর আরবি ভাষায় ‘ مَا’ শব্দটি জ্ঞানহীনদের জন্যই ব্যবহার হয়। অর্থাৎ বলা হচ্ছে যে, তোমরা ও তোমরা যেসব মূর্তির উপাসনা কর, সকলেই জাহান্নামের ইন্ধন হবে। পাথরের গড়া মূর্তিগুলোর যদিও কোন দোষ নেই; কারণ তারা প্রাণহীন জড়পদার্থ, এমনকি এগুলোর কোনো সাধানণ জ্ঞান বা অনুভূতি কিছুই নেই । তবুও তাদেরও উপাসনাকারিদের সঙ্গে জাহান্নামে দেওয়া হবে। শুধু মুশরিকদের এটা বুঝানোর জন্য যে, তোমরা যাদেরকে নিজেদের ভরসাস্থল মনে করতে, তারাও তোমাদের সাথে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়েছে। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান, তাফসিরে জাকারিয়া)

মুশরিকরা পাথরে গড়া যে সব দেব-দেবীর উপাসনা করত তাদেরও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অবশ্য সেটা তাদের শাস্তি হিসেবে নয়; বরং তাদের মুশরিক পূজারীদের সরাসরি দেখিয়ে দেওয়ার জন্য যে, তারা যাদের ক্ষমতাবান মনে করে পূজা-অর্চনা করত, বাস্তবে তারা কতটা অক্ষম ও অসহায়। (তাফসিরে তাওজিহুল কোরআন, মুফতি তাকি উসমানী)


শিক্ষা ও বিধান

১. আল্লাহ তাআলাই একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত সত্তা। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা বা অন্য কারো উপাসনা করা মহাপাপ। 

২. যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুর উপাসনা করে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে। আর শিরক মানুষের সব নেক আমল ধ্বংস করে দেয়।

৩. কাফের-মুশরিকরা যাদের উপাসনা করে, তারা নিজেদেরই কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। 

৪. মানুষকে এমন সব বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হবে, যা তাকে আল্লাহর একত্ববাদ থেকে বিচ্যুত করে।

৫. ইবাদতে একনিষ্ঠতা অপরিহার্য। তাই সব দোয়া, আশা, ভয়, ভালোবাসা ও ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়া উচিত।

অতএব, আমাদের সকলের উচিত, আল্লাহর একত্ববাদে দৃঢ় থাকা, শিরক ও সকল প্রকার বাতিল থেকে সতর্ক থাকা এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কেননা যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করবে, সে-ই প্রকৃত মুক্তি ও সফলতা লাভ করবে।