যেকোনো বিপদ-আপদে মুমিনরা বরাবরই মহান আল্লাহর নিকট দু’হাত তুলে ধরেন। দুনিয়াবি জীবনের নানা দুশ্চিন্তা, হতাশা, রোগমুক্তি কিংবা কল্যাণ চেয়ে স্মরণ করেন মহান রবকে।
অন্যদিকে খোদ মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। যখন কোনো বান্দা তার নিকট দুই হাত তুলে প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেন না।
তবে ক্ষণিকের এ দুনিয়ায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিভিন্ন বিপদ-আপদ কিংবা নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির মাধ্যমেও বান্দার পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে যারা এসব বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন পরিচালনা করে থাকেন তারাই সফলকাম হবেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে (সুরা আল-বালাদ, আয়াত : ৪)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৪৬)।
এমনকি পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা এসেছে, ‘যদি কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট মাত্রা রেখেছেন। (সুরা আত-ত্বলাক্ক, আয়াত : ৩) অন্যদিকে বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে বান্দার গুনাহও মাফ হয়। হাদিসে এসেছে, মুসলিম ব্যক্তির ওপর যেসব যাতনা, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যে কাটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এসবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ৯৬৯; সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫২৩৯)
এজন্য খোদ রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে উম্মতদের বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে দুশ্চিন্তা কিংবা হতাশা থেকে মুক্তি চেয়ে মহান রবের কাছে আশ্রয় প্রার্থনাও শিখিয়েছেন নবীজি (সা.)। তবে যেকোনো বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তা কিংবা হতাশায় কোনোভাবেই নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বরং, প্রকৃত মুমিনের উচিত এই সময়ে মহান রবের রহমত কামনা করে তার কাছে দোয়া করা। এ ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা কিংবা হতাশায় থাকলে দোয়ার পাশাপাশি কোরআনে বর্ণিত নিচের ১৫টি আয়াতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা উচিত।
১) وَلَا تَاْيْــَٔسُواْ مِن رَّوْحِ ٱللَّهِۖ إِنَّهُۥ لَا يَاْيْــَٔسُ مِن رَّوْحِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلْقَوْمُ
অর্থ: ‘আর তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, কেননা কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)
২) وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
অর্থ: ‘তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।’ (সুরা ইমরান, আয়াত : ১৩৯)
৩) لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَاۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا ٱكْتَسَبَتْۗ
অর্থ: ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের বাইরে কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না। সে যা অর্জন করে তা তার জন্যই এবং সে যা কামাই করে তা তার ওপরই বর্তাবে।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ২৮৬)
৪) إِنَّ مَعَ ٱلْعُسْرِ يُسْرًا , فَإِنَّ مَعَ ٱلْعُسْرِ يُسْرًا
অর্থ: ‘অতএব, নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। (সুরা আশ-শারহ, আয়াত : ৫-৬)
৫) وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
অর্থ: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আত-ত্বলাক্ক, আয়াত : ৩)
৬) قُلْ يَـٰعِبَادِىَ ٱلَّذِينَ أَسْرَفُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُواْ مِن رَّحْمَةِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًاۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ
অর্থ: ‘বলো, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)
৭) أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: ‘তারাই ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই অন্তরে সত্যিকারের প্রশান্তি লাভ করা যায়।’ (সুরা আর-রাদ, আয়াত : ২৮)
৮) وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
অর্থ: ‘হতে পারে, তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ২১৬)
৯) يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱسْتَعِينُواْ بِٱلصَّبْرِ وَٱلصَّلَوٲةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّـٰبِرِينَ
অর্থ: ‘হে মুমিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
১০) وَٱصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِٱللَّهِۚ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِى ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُونَ
অর্থ: ‘আর তুমি সবর (ধৈর্য) কর। তোমার সবর তো শুধু আল্লাহর তাওফিকেই। তারা যেসব ষড়যন্ত্র করছে, তুমি সে বিষয়ে সংকীর্ণমনা হয়ো না।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১২৭)
১১) ٱدْعُونِىٓ أَسْتَجِبْ لَكُمْۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِى سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
অর্থ: ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি (তোমাদের ডাকে) সাড়া দেব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদাত করে না, নিশ্চিয়ই তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা গাফির, আয়াত : ৬০)
১২) لَا تَحْزَنْ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَنَا
অর্থ: ‘তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত : ৪০)
১৩) حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
অর্থ: ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সুরা ইমরান, আয়াত : ১৭৩)
১৪) لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنتَ الْأَعْلَىٰ
অর্থ: ‘ভয় করো না, নিশ্চয়ই তুমিই বিজয়ী হবে।’ (সুরা ত্বা-হা, আয়াত : ৬৮)
১৫) وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ: ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা আত-ত্বলাক্ক, আয়াত : ২-৩)




