• ই-পেপার

ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ

হাদিসের বাণী

এক পেয়ালা দুধে অবিশ্বাস্য বরকত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
এক পেয়ালা দুধে অবিশ্বাস্য বরকত
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সেই আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো রব নেই, আমি ক্ষুধার তাড়নায় মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি করতাম এবং পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম। এভাবে একদিন আমি মানুষের চলার রাস্তায় বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর মহানবী (সা.) এসে আমাকে দেখে মুচকি হাসলেন। তিনি আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, আবু হির, আমি বললাম, লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, আমার পেছনে পেছনে আসো। আমি তাঁর পিছু পিছু তাঁর সঙ্গে গেলাম। তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করার পরে আমার প্রবেশের অনুমতি (তাঁর স্ত্রীদের কাছে) চাইলেন। তারা আমাকে অনুমতি দিলে আমি প্রবেশ করলাম।

মহানবী (সা.) ঘরে ঢুকে এক পেয়ালা দুধ দেখতে পেলেন। জিজ্ঞাস করলেন, এ দুধ আসলো কোথা থেকে? জবাবে তারা বললেন, অমুক আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছে। তিনি বললেন, আবু হির, (হে আবু হুরাইরা) আমি বললাম, লাব্বাইক (আমি উপস্থিত) ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, সুফফাবাসীদের কাছে গিয়ে তাদের ডেকে নিয়ে আসো। আর আহলে সুফফারা ইসলামের মেহমান ছিলেন, তাঁদের কোনো থাকার মতো ঘর-বাড়ি ছিল না। তাদের কোনো পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না।

মহানবী (সা.)-এর কাছে কোনো সাদাকাহের জিনিস এলে, তিনি তা সুফফাবাসীদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। সাদাকাহ থেকে মহানবী (সা.) কখনোই কোনো কিছু নিতেন না। আবার কোনো কিছু হাদিয়া আসলেও তিনি সেটা তাঁদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। হাদিয়ার জিনিস থেকে মহানবী (সা.) নিজে গ্রহণ করতেন এবং অন্যকেও দিতেন। তো, তিনি আমাকে সুফফাবাসীকে ডাকার জন্য বললেন। তখন আমার মনে সংকোচ হলো।

আমি (মনে মনে) বললাম, এই অল্প দুধ সবার জন্য কি যথেষ্ট হবে? তা ছাড়া এই দুধের অধিক হকদার হলাম আমি। এই দুধ পান করে একটু শক্তিশালী হবো। আহলে সুফফারা উপস্থিত হওয়ার পর, তাদের পান করার জন্য মহানবী (সা.) আমাকে আদেশ করবেন। তারপর তাদের পান করানোর পরে কতটুকুই-বা বাকি থাকবে! তা ছাড়া আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথা মানা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।

তাই আমি তাদের কাছে এসে তাদের ডাকতে লাগলাম। তারা এসে অনুমতি চাইল, অনুমতি পেয়ে সবাই নিজ-নিজ জায়গায় বসে পড়লেন। এবার মহানবী (সা.) বললেন, আবু হির, আমি বললাম, লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, পাত্রটি নিয়ে তাদের একেকজনকে দাও। ফলে আমি এক-একজনকে দিতে লাগলাম। প্রথমজন তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পাত্রটি ফেরত দিলেন। অতঃপর আমি অন্য একজনকে দিলাম। তিনি তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পাত্রটি দিলেন। এরপরে আরেকজনকে দিলাম। তিনি তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পাত্রটি দিলেন। এভাবে সবার পালা শেষ করে আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে উপস্থিত হলাম। সবাই তৃপ্তিসহকারে পান করতে পেরেছে। এরপরে মহানবী (সা.) পাত্রটি নিয়ে তাতে নিজ হাত রেখে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, আবু হির, আমি বললাম, লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, এখন তো তুমি আর আমি বাকি। আমি বললাম, জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ।

মহানবী (সা.) আমাকে বললেন, তুমি এবার বসে পান করতে থাকো। আমি বসে-বসে পান করতে লাগলাম। তিনি আবার বললেন, পান করো। ফলে আমি আবার পান করতে থাকলাম। তিনি আমাকে বারবার পান করার কথা বললে আমি বললাম, আর পারছি না। সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, পান করার মতো আমার পেটে আর কোনো জায়গা ছিল না। অবশেষে তিনি বললেন, পাত্রটি আমাকে দেখাও। আমি পাত্রটি মহানবী (সা.)-এর কাছে দিলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করে 'বিসমিল্লাহ' বলে বাকি দুধ পান করে নিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৫২, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১০৬৭৯)

হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকার দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকার দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো আল্লাহর দেওয়া হিদায়াত। সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা দুনিয়ার সব অর্জন একদিকে, আর আল্লাহর সঠিক পথের দিশা অন্যদিকে। কেননা হিদায়াতই হলো মুমিনের প্রকৃত সফলতা। তবে হিদায়াত লাভ করাই শেষ কথা নয়; বরং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকা আরো বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ মানুষের অন্তর সর্বদা পরিবর্তনশীল। তাই মুমিনের সবচেয়ে বড় ভয় হওয়া উচিত— কোথাও যেন গুনাহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ বা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সে হিদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে যায়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের এমন এক মহামূল্যবান দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর কাছে হিদায়াতের ওপর দৃঢ়তা, অন্তরের স্থিরতা এবং তাঁর বিশেষ রহমত লাভ হয়। দোয়াটি হলো-

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

উচ্চারণ : ‘রব্বানা লা তুজিগ ক্বুলুবানা বাঅ’দা ইজ হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুংকা রাহমাহ। ইন্নাকা আংতাল ওয়াহহাব।’

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনিই মহাদাতা।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮)

মানবীয় ‘ফিতরাত’ আল্লাহর অস্তিত্বের সহজাত প্রমাণ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মানবীয় ‘ফিতরাত’ আল্লাহর অস্তিত্বের সহজাত প্রমাণ
সংগৃহীত ছবি

ফিতরাত অর্থ হলো প্রথমবার সৃষ্টি করা, উদ্ভাবন করা এবং মৌলিক সৃষ্টির অবস্থা। ফিতরাত মানে মানুষের সৃষ্টিগত সহজাত প্রবৃত্তি।ফিতরাত বলতে মানুষের সেই সহজাত স্বভাবকে বোঝায়, যার ওপর সে জন্মগ্রহণ করে। এতে মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত। এগুলো এমন বৈশিষ্ট্য, যা মানবতার মৌলিক দাবি। এগুলোর বিরোধিতা করা বা এগুলো থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে মানবিক স্বভাব থেকে বিচ্যুত হওয়া—কখনো সম্পূর্ণভাবে, আবার কখনো আংশিকভাবে।

ইসলাম ও মানবীয় ফিতরাত
আসমানি সব ধর্মই মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সব নবী-রাসুলের শিক্ষা মানবীয় ফিতরাতকে সমর্থন করেছে, তাকে শক্তিশালী করেছে এবং সেই স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণেই ইসলামকে ‘ফিতরাতের ধর্ম’ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে এ দ্বিনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। এটি আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বিন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৩০)

আল্লাহর অস্তিত্বের একটি সহজাত প্রমাণ
ফিতরাত আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম বড় প্রমাণ। মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বিস্ময়কর সামঞ্জস্য যেমন একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়, তেমনি মানুষের অন্তরের গভীরে নিহিত একটি সহজাত অনুভূতিও আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে।

এই অনুভূতি আল্লাহ মানুষের অন্তরে জন্মগতভাবে স্থাপন করেছেন। এটিই মানুষের ধর্মীয় প্রবৃত্তি, যা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে। তবে কখনো কখনো বিভিন্ন কারণে এই সহজাত অনুভূতি নিস্তেজ হয়ে যায়। কিন্তু যখন মানুষ বিপদে পড়ে, দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হয় কিংবা চারদিক থেকে অসহায় হয়ে যায়, তখন তার অন্তর্নিহিত ফিতরাত আবার জেগে ওঠে এবং সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। এ বিষয়েই আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন মানুষ কোনো কষ্টে পতিত হয়, তখন সে শোয়া, বসা কিংবা দাঁড়ানো—সব অবস্থায় আমাকে ডাকে। অতঃপর যখন আমি তার কষ্ট দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলে যায় যেন সে কখনো তার কষ্ট দূর করার জন্য আমাকে ডাকেইনি।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১২)

বাস্তবতা হলো মানুষ যতই আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন, তার অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাত কখনো সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয় না।

অনেক নাস্তিক বা আল্লাহকে অস্বীকারকারী মানুষকেও দেখা যায়, যখন জীবনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সে অজান্তেই আকাশের দিকে তাকায়, দুই হাত তুলে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সর্বশক্তিমান এক সত্তার আশ্রয় কামনা করে। এটাই মানবীয় ফিতরাতের জাগরণ এবং আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম শক্তিশালী সাক্ষ্য।

কোরআনে ফিতরাত সম্পর্কিত আয়াতসমূহ ও তাদের তাৎপর্য

কোরআনে এমন কিছু আয়াত আছে, যেগুলো সরাসরি মানবীয় ফিতরাতের কথা উল্লেখ করেছে। যেমন সুরা রুমের ৩০ নম্বর আয়াত। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ইসলাম মানুষের প্রকৃত স্বভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষকে এমন একটি স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করা হয়েছে, যা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর ইবাদত এবং সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। যদিও ‘ফিতরাত’ শব্দ কোরআনে মাত্র একবার এসেছে, তবু বহু আয়াতে তার অর্থ ও তাৎপর্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

১. আল্লাহ মানুষের কাছ থেকে তাঁর রব হওয়ার সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘আর স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে এনে তাদের নিজেদের ব্যাপারে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলেছিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’ যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো—আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৭২)

অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে এমন এক অন্তর্নিহিত স্বীকৃতি নিয়ে যে তার একজন স্রষ্টা আছেন।

২. আল্লাহর অঙ্গীকার (মিসাক) : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো এবং সেই অঙ্গীকারও স্মরণ করো, যা তিনি তোমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন, যখন তোমরা বলেছিলে—‘আমরা শুনলাম এবং মান্য করলাম।’ আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের সব কথা জানেন।” (সুরা : আল-মায়িদা, আয়াত : ৭)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষকে মূলত আল্লাহর আনুগত্য করার স্বাভাবিক প্রবণতা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে।

৩. সুরা ইয়াসিনে বর্ণিত অঙ্গীকার : আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করিনি যে তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৬০)

এখানে ‘অঙ্গীকার’ বলতে সেই প্রাচীন অঙ্গীকারকেই বোঝানো হয়েছে, যা আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে থাকা মানবজাতির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল।

৪. যারা আল্লাহর অঙ্গীকার রক্ষা করে : আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং কোনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।’ (সুরা : আর-রাদ, আয়াত : ২০)

কাফফাল (রহ.) বলেন, ‘এ অঙ্গীকার বলতে মানুষের বিবেক ও বুদ্ধির মধ্যে স্থাপিত তাওহিদ ও নবুয়তের প্রমাণকে বোঝানো হয়েছে।’

৫. আল্লাহ এরই মধ্যে অঙ্গীকার নিয়েছেন : আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনছ না, অথচ রাসুল তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনার আহবান জানাচ্ছেন? আর যদি তোমরা সত্যিই মুমিন হও, তবে আল্লাহ তো এরই মধ্যে তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন।’ (সুরা : আল-হাদিস, আয়াত : ৮)

কোরআনুল কারিমে মানবীয় ফিতরাতকে একটি শক্তিশালী দলিল ও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি মানুষের অন্তরে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ব এবং তাঁর প্রতি আনুগত্যের স্বাভাবিক অনুভূতি সৃষ্টি করে।

শিয়ালের মাংস খাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
শিয়ালের মাংস খাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রচারিত সংবাদ অনুযায়ী, বরিশালের একটি এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি সাতটি শিয়াল ধরে সেগুলো জবাই করে রুটি দিয়ে খেয়েছেন। এর পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—শিয়ালের গোশত খাওয়া কি ইসলামে বৈধ? কেউ বলছেন, এটি সম্পূর্ণ হারাম; আবার কেউ দাবি করছেন, অসুস্থ অবস্থায় ওষুধ হিসেবে শিয়াল খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নানা বিভ্রান্তি।

এ ধরনের বিষয়ে আবেগ বা প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে কোরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের আলোকে সিদ্ধান্ত জানা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৮)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)
অর্থাৎ, কোনো প্রাণী হালাল না হারাম—এটি মানুষের রুচি বা সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশই চূড়ান্ত হয়। 

শিয়াল সম্পর্কে হাদিসের নির্দেশনা
সহিহ হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক নখ-বিশিষ্ট হিংস্র জন্তুর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৩৩)

শিয়াল শিকারি প্রাণী। এটি ধারালো দাঁত দিয়ে শিকার ধরে এবং মাংস ভক্ষণ করে। এ কারণে অভিজ্ঞ ফকিহদের মতে এটি ‘সিবা’ তথা হিংস্র জন্তুর অন্তর্ভুক্ত। তাই কোনোভাবেই ইসলামী শরিয়তে শিয়ালের গোশত খাওয়া বৈধ নয়। বরং খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম। 

এ বিষয়ে বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা আলাউদ্দিন কাসানি (রহ.) বলেন, ‘প্রত্যেক নখবিশিষ্ট হিংস্র জন্তুর গোশত হারাম।’ (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৩৫)
আর ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন, ‘হিংস্র জন্তুসমূহ—যেগুলো দাঁত দিয়ে শিকার করে—সেগুলোর গোশত খাওয়া হারাম।’ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩০৭)
তাই ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে শিয়ালকে হারাম প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ওষুধ হিসেবে শিয়াল খাওয়া কি জায়েজ?
অনেকে দাবি করেন, শিয়ালের গোশত বা চর্বি বিভিন্ন রোগের ওষুধ। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো হারাম বস্তুকে সাধারণ চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের রোগ সৃষ্টি করেছেন এবং তার চিকিৎসাও সৃষ্টি করেছেন। অতএব, চিকিৎসা গ্রহণ করো, তবে হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা কোরো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৪)

আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন, তাতে তোমাদের আরোগ্য রাখেননি।’ (ইবনে হিব্বান)

অতএব, শুধু লোকমুখে প্রচলিত বিশ্বাস বা কুসংস্কারের ভিত্তিতে শিয়াল খাওয়া বা তার মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি এমন জীবন-মৃত্যুর সংকট তৈরি হয়, যেখানে একজন বিশ্বস্ত ও দক্ষ মুসলিম চিকিৎসক নিশ্চিতভাবে বলেন যে, হারাম বস্তু ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প চিকিৎসা নেই এবং তা ব্যবহার না করলে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে ‘প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ বস্তু সীমিত পরিমাণে আহার করা’  শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হতে পারে। তবে এটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী অবস্থা; সাধারণ নিয়ম নয়। কোনো খাদ্য বা চিকিৎসা সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমের গুজব বা প্রচারণার পরিবর্তে কোরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়ার ওপর নির্ভর করা উচিত।

ইতিপূর্বে যারা শিয়ালের মাংস খেয়েছে তারা কবিরা গুনাহ করেছে। এই গর্হিত কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে কায়মনোবাক্যে তাওবা করা তাদের জন্য আবশ্যক। তা ছাড়া বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে শিয়াল শিকার করা, বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

সারকথা হলো, শিয়ালের গোশত খাওয়া হারাম। কারণ এটি দাঁত দিয়ে শিকার করা হিংস্র প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের প্রাণীর গোশত খেতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। অসুস্থতার অজুহাতে বা লোকমুখে প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে শিয়াল খাওয়াও বৈধ নয়। শুধু জীবনরক্ষার মতো চরম ও অনিবার্য পরিস্থিতিতে, শরিয়তের নির্ধারিত কঠোর শর্ত পূরণ হলে ব্যতিক্রমী বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। একজন মুসলমানের উচিত ভাইরাল তথ্য বা লোকবিশ্বাস নয়; বরং কোরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে নিজের খাদ্য ও জীবন পরিচালনা করা। কেননা, হালাল খাদ্য শুধু দেহকে নয়, ঈমান, ইবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল খাদ্য গ্রহণ করার তাওফিক দান করুক। আমিন। 

ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ | কালের কণ্ঠ