মানুষের জীবন কখনো সুখে, কখনো দুঃখে; কখনো স্বস্তিতে, কখনো কঠিন পরীক্ষায় অতিবাহিত হয়। এমন অনেক সময় আসে, যখন সব পথ যেন বন্ধ হয়ে যায়, কোনো সমাধান চোখে পড়ে না। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মহান আল্লাহ। বিপদে আল্লাহর দিকে ফিরে আন্তরিকভাবে দোয়া করা নবী-রাসুলদের সুন্নত। আর এমনই এক মহিমান্বিত দোয়া হলো দোয়া ইউনুস, যা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং যার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন।
দোয়া ইউনুস কী?
হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন অবাধ্যতা করলে তিনি আল্লাহর অনুমতির আগেই তাদের এলাকা ত্যাগ করেন। সমুদ্রযাত্রার সময় তিনি একটি বিশাল মাছের পেটে বন্দি হন। চারদিকে অন্ধকার—সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। এমন অসহায় অবস্থায় তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে মহান আল্লাহর দরবারে বিনয়ভরে যে দোয়া করেছিলেন, সেটিই আজ দোয়া ইউনুস নামে পরিচিত। দোয়াটি হলো—
لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
অর্থ : ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি সর্বপ্রকার ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭)
কোরআনে দোয়া ইউনুসের শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর স্মরণ করুন জুন-নুনের (ইউনুসের) কথা। তিনি রাগান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন, আমি তাঁকে সংকীর্ণ অবস্থায় ফেলব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন—‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ এরপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭–৮৮)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা শুধু ইউনুস (আ.)-কে উদ্ধার করার ঘটনাই উল্লেখ করেননি; বরং ঘোষণা করেছেন, যে মুমিন আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকেও বিপদ থেকে মুক্তি দেন।
দোয়া ইউনুসের ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুন-নন (ইউনুস আ.)-এর দোয়া ছিল—‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন।’ কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো বিষয়ে এ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দোয়া কবুল করেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, এই দোয়া মানুষের দুশ্চিন্তা ও সংকট দূর করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
দোয়া ইউনুস কীভাবে পড়বেন?
দোয়া ইউনুস পাঠের জন্য শরিয়তে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। বিপদ, দুশ্চিন্তা, অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা যে কোনো কঠিন সময়ে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে যতবার সম্ভব এই দোয়া পড়া উত্তম। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে কোথাও কোথাও ‘খতমে ইউনুস’ নামে নির্দিষ্ট সংখ্যা—যেমন এক লাখ পঁচিশ হাজার বার—এই দোয়া পড়ানোর প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এসবের শরয়ি কোনো দলিল নেই। তাই এ ধরনের প্রথা পরিহার করা উচিত। কেননা ইসলামের শিক্ষা হলো—বান্দা নিজেই নিজের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। নিজের মুখে, নিজের হৃদয়ের আকুতি নিয়ে করা দোয়া আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।
দোয়া ইউনুস পাঠের উপকারিতা
আন্তরিকতার সঙ্গে দোয়া ইউনুস পাঠ করলে আল্লাহর ইচ্ছায়—
১. বিপদ-আপদ ও সংকট থেকে মুক্তি লাভের আশা করা যায়।
২. দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা দূর হয়।
৩. আল্লাহর প্রতি ভরসা ও ঈমান আরো দৃঢ় হয়।
৪. নিজের ভুলের জন্য তওবা ও আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
৫. আল্লাহর রহমত ও সাহায্য লাভের পথ সুগম হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, সব উপকারই আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের ওপর নির্ভরশীল। এই দোয়া কোনো যান্ত্রিক বা নিশ্চিত ফলদায়ক সূত্র নয়। দোয়া ইউনুস কোরআনে বর্ণিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ দোয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দোয়া ইউনুসের প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে আন্তরিকতার সঙ্গে তা আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




