• ই-পেপার

বন্যায় নিঃস্ব পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিদান

দোয়া ইউনুস পাঠের বিশেষ উপকারিতা

মুফতি ওমর বিন নাছির
দোয়া ইউনুস পাঠের বিশেষ উপকারিতা
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবন কখনো সুখে, কখনো দুঃখে; কখনো স্বস্তিতে, কখনো কঠিন পরীক্ষায় অতিবাহিত হয়। এমন অনেক সময় আসে, যখন সব পথ যেন বন্ধ হয়ে যায়, কোনো সমাধান চোখে পড়ে না। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মহান আল্লাহ। বিপদে আল্লাহর দিকে ফিরে আন্তরিকভাবে দোয়া করা নবী-রাসুলদের সুন্নত। আর এমনই এক মহিমান্বিত দোয়া হলো দোয়া ইউনুস, যা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং যার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন।

দোয়া ইউনুস কী?
হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন অবাধ্যতা করলে তিনি আল্লাহর অনুমতির আগেই তাদের এলাকা ত্যাগ করেন। সমুদ্রযাত্রার সময় তিনি একটি বিশাল মাছের পেটে বন্দি হন। চারদিকে অন্ধকার—সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। এমন অসহায় অবস্থায় তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে মহান আল্লাহর দরবারে বিনয়ভরে যে দোয়া করেছিলেন, সেটিই আজ দোয়া ইউনুস নামে পরিচিত। দোয়াটি হলো-

لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
অর্থ : ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি সর্বপ্রকার ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭)

কোরআনে দোয়া ইউনুসের শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর স্মরণ করুন জুন-নুনের (ইউনুসের) কথা। তিনি রাগান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন, আমি তাঁকে সংকীর্ণ অবস্থায় ফেলব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন— ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ এরপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭–৮৮)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা শুধু ইউনুস (আ.)-কে উদ্ধার করার ঘটনাই উল্লেখ করেননি; বরং ঘোষণা করেছেন, যে মুমিন আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকেও বিপদ থেকে মুক্তি দেন।

দোয়া ইউনুসের ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুন-নন (ইউনুস আ.)-এর দোয়া ছিল— ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন।’ কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো বিষয়ে এ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দোয়া কবুল করেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)

আরেক বর্ণনায় এসেছে, এই দোয়া মানুষের দুশ্চিন্তা ও সংকট দূর করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।

দোয়া ইউনুস কীভাবে পড়বেন?
দোয়া ইউনুস পাঠের জন্য শরিয়তে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। বিপদ, দুশ্চিন্তা, অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা যে কোনো কঠিন সময়ে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে যতবার সম্ভব এই দোয়া পড়া উত্তম। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে কোথাও কোথাও ‘খতমে ইউনুস’ নামে নির্দিষ্ট সংখ্যা—যেমন এক লাখ পঁচিশ হাজার বার—এই দোয়া পড়ানোর প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এসবের শরয়ি কোনো দলিল নেই। তাই এ ধরনের প্রথা পরিহার করা উচিত। কেননা ইসলামের শিক্ষা হলো—বান্দা নিজেই নিজের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। নিজের মুখে, নিজের হৃদয়ের আকুতি নিয়ে করা দোয়া আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।

দোয়া ইউনুস পাঠের উপকারিতা
আন্তরিকতার সঙ্গে দোয়া ইউনুস পাঠ করলে আল্লাহর ইচ্ছায়—

১. বিপদ-আপদ ও সংকট থেকে মুক্তি লাভের আশা করা যায়।
২. দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা দূর হয়।
৩. আল্লাহর প্রতি ভরসা ও ঈমান আরও দৃঢ় হয়।
৪. নিজের ভুলের জন্য তওবা ও আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
৫. আল্লাহর রহমত ও সাহায্য লাভের পথ সুগম হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, সব উপকারই আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের ওপর নির্ভরশীল। এই দোয়া কোনো যান্ত্রিক বা নিশ্চিত ফলদায়ক সূত্র নয়। দোয়া ইউনুস কোরআনে বর্ণিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ দোয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দোয়া ইউনুসের প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে আন্তরিকতার সঙ্গে তা আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
 

বন্যাকবলিত এলাকায় করণীয় তিনটি আমল

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বন্যাকবলিত এলাকায় করণীয় তিনটি আমল
সংগৃহীত ছবি

বন্যা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা প্রতিবছর মানুষের জীবনযাত্রা, সম্পদ ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব, রোগব্যাধির বিস্তার এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি দেখা দেয়।

ইসলাম ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি মানুষের কল্যাণ, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও হাদিসে বিপদগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং বৃক্ষরোপণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা : বন্যার সময় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে। তাই এ সময়ে বিশুদ্ধ পানি বিতরণ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ এবং নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মহানবী (সা.) মদিনায় এসে মানুষের সুপেয় পানির সংকট দেখে ‘রুমা’ কূপটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদিনায় আগমন করার পর দেখলেন যে সেখানে সুপেয় পানি পান করার ব্যবস্থা নেই।

এক ইহুদির ‘রুমা’ নামক একটি কূপ থাকলেও যার পানি অনেক চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কূপটি ব্যক্তিমালিকানা থেকে সরিয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা করলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন ‘কে রুমা নামক কূপটি কিনে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে? এবং এর বিনিময়ে জান্নাতে আরো উত্তম পুরস্কার লাভ করবে?’ এ কথা শুনে উসমান (রা.) এই কূপ খরিদ করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করলেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৭০৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫১১ ও ৫৫৫)

২. বানভাসি মানুষের সহযোগিতা : বানভাসি মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ কাজ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। এ অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্ব এবং একটি বড় ইবাদত। অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা মানুষদের প্রতি মহান আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ ও সাহায্য বর্ষণ করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে, আল্লাহ তাআলাও তার কল্যাণে রত থাকবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪৬)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি ব্যয় করো, আমিও তোমার প্রতি ব্যয় করব।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৫২)।

৩. বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন : বর্ষায় বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বৃক্ষ ও তরুলতা প্রকৃতির প্রাণ হিসেবে কাজ করে; এগুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বায়ু বিশুদ্ধকরণ, মাটিক্ষয় রোধ, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় গাছের চারা সহজে বেড়ে ওঠে। তাই এ সময়কে বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশগত কাজ নয়; বরং এটি একটি সওয়াবপূর্ণ ইবাদতও বটে। একটি গাছ বহু বছর ধরে মানুষকে ফল, ছায়া ও অক্সিজেন প্রদান করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে; তত দিন গাছ রোপণকারীর সওয়াবও চলমান থাকে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মুসলমান কোনো বৃক্ষ রোপণ করে, তারপর তা থেকে কোনো মানুষ, পশু বা পাখি ভক্ষণ করে, এর বিনিময়ে কিয়ামতে তার জন্য একটি সদকার সওয়াব রয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪০৫৩)

পরিশেষে বলা যায়, বন্যা মোকাবেলায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, বানভাসি মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক কাজ। এসব কাজ একদিকে সামাজিক দায়িত্ব, অন্যদিকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের পুরস্কার লাভের অন্যতম মাধ্যম। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে যেমন দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে, তেমনি একটি মানবিক, কল্যাণমুখী ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠন করা সহজ হবে।

কোরআনে যেভাবে ভ্রাতৃত্বের কথা বারবার বলা হয়েছে

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
কোরআনে যেভাবে ভ্রাতৃত্বের কথা বারবার বলা হয়েছে
সংগৃহীত ছবি

পবিত্র কোরআন শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক (রক্তের সম্পর্ক) নিয়েই আলোচনা করেনি; বরং ‘ভাই’ এবং এর বিভিন্ন রূপক শব্দকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছে। কোরআনে ‘ভাই’ এবং এর বিভিন্ন শব্দরূপ মোট ৯৬ বার এসেছে। তবে সব ক্ষেত্রেই এর অর্থ রক্তের ভাই নয়; বরং প্রসঙ্গভেদে এর বিভিন্ন অর্থ আছে। আরবি ভাষার মূল অর্থ এবং কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ‘ভ্রাতৃত্ব’ শব্দটি নিম্নোক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—

১. রক্তের সম্পর্কের ভাই (ভ্রাতৃত্বের মূল অর্থ),
এটি শব্দটির প্রকৃত ও মূল অর্থ। এর উদাহরণ আল্লাহ তাআলার বাণী—‘আর যখন মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত অবস্থায় ফিরে এলেন, তখন বলেন, আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা কতই না মন্দ কাজ করলে! তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই তাড়াহুড়া করলে?’ অতঃপর তিনি ফলকগুলো নিক্ষেপ করলেন এবং তাঁর ভাই হারুনের মাথার চুল ধরে নিজের দিকে টেনে আনলেন। হারুন বলেন, ‘হে আমার মাতৃগর্ভের ভাই! এ জাতি আমাকে দুর্বল মনে করেছিল এবং প্রায় আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। অতএব, আপনি শত্রুদের আমার ওপর হাসার সুযোগ দেবেন না এবং আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৫০)
এখানে ‘ভাই’ বলতে প্রকৃত রক্তের ভাইকে বোঝানো হয়েছে।

২. রক্তের সম্পর্ক ছাড়া অন্যান্য অর্থে ভ্রাতৃত্ব
অনেক স্থানে ‘ভাই’ শব্দটি মূল অর্থ থেকে বের হয়ে অংশীদারিত্ব, সাদৃশ্য বা মিল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন নিচে তুলে ধরা হলো—

ক. ঈমান ও আকিদার ভ্রাতৃত্ব : এটি দুই ধরনের হতে পারে—ঈমানের ভ্রাতৃত্ব ও কুফর বা শিরকের ভ্রাতৃত্ব।

(১) ঈমানের ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১০)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘এখানে ভ্রাতৃত্ব বলতে বংশগত সম্পর্ক নয়; বরং দ্বিনের সম্পর্ক বোঝানো হয়েছে। এ কারণেই বলা হয়, দ্বিনের ভ্রাতৃত্ব রক্তের ভ্রাতৃত্বের চেয়েও দৃঢ়। কারণ রক্তের সম্পর্ক ধর্ম ভিন্ন হলে ছিন্ন হয়ে যায়; কিন্তু ঈমানের সম্পর্ক বংশ ভিন্ন হলেও ছিন্ন হয় না।’

(২) কুফর ও মুনাফিকির ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা কুফরি করেছে এবং তাদের ভাইদের সম্পর্কে বলেছে, যখন তারা পৃথিবীতে সফরে ছিল অথবা যুদ্ধে গিয়েছিল, যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তবে মরত না এবং নিহতও হতো না।’ আল্লাহ এ কথাকে তাদের অন্তরে অনুতাপের কারণ বানিয়ে দিয়েছেন। ‘আল্লাহই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৬)

এখানে ‘তাদের ভাই’ বলতে রক্তের ভাই বোঝানো হয়নি; বরং কুফর ও মুনাফিকিতে তাদের সহচরদের বোঝানো হয়েছে।

খ. মানবজাতির ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আদ জাতির কাছে আমরা তাদের ভাই হুদকে প্রেরণ করেছিলাম।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৫০)

কিছু মুফাসসির বলেন, এখানে ‘ভাই’ বলতে বোঝানো হয়েছে—‘তিনি তাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন; সবাই আদম (আ.)-এর সন্তান।’ আবার কেউ বলেছেন, আল্লাহ তাঁকে ‘ভাই’ বলে উল্লেখ করেছেন, যাতে বোঝা যায়, তিনি নিজের জাতির প্রতি ঠিক আপন ভাইয়ের মতোই আন্তরিক, দয়ালু ও কল্যাণকামী ছিলেন।

গ. গোত্রীয় ভ্রাতৃত্ব : ওপরের একই আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে—‘তাদের ভাই’ অর্থাৎ তাদেরই গোত্রের একজন ব্যক্তি। অর্থাৎ হুদ (আ.) আদ জাতিরই একজন সদস্য ছিলেন।

ঘ. শয়তানের ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ২৭)

এখানে শয়তানের ভাই বলতে প্রকৃত ভাই বোঝানো হয়নি। অর্থ হলো অপচয়কারীরা তাদের এ নিকৃষ্ট কাজে শয়তানের অনুসারী এবং তার অনুরূপ হয়ে যায়। আরবরা এমন ব্যক্তিকে ‘অমুকের ভাই’ বলে, যেকোনো কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে। যেমন—তিনি দানশীলতার ভাই। তিনি সফরের ভাই। অর্থাৎ তিনি ওই গুণের সঙ্গে সর্বদা যুক্ত।

ঙ. বিভিন্ন জাতির পারস্পরিক সম্পর্ক : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখনই কোনো জাতি জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখনই তারা তাদের পূর্ববর্তী সঙ্গী জাতিকে অভিশাপ দেবে। অবশেষে যখন সবাই সেখানে একত্র হবে, তখন পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের রব! এরাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব, তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ৩৮)

এখানে ‘তাদের বোন’ বলতে বোঝানো হয়েছে তাদের সমজাতীয়, অনুরূপ ও একই পথের অনুসারী জাতিকে।

চ. আল্লাহর নিদর্শনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তাদের যে নিদর্শনই দেখিয়েছি, তা পূর্ববর্তী নিদর্শনের চেয়েও বড় ছিল। আর আমি তাদের শাস্তির মাধ্যমে পাকড়াও করেছি, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : আজ-জুখরুফ, আয়াত : ৪৮)

এখানে ‘তার বোন’ বলতে বোঝানো হয়েছে, মুসা (আ.)-এর প্রতিটি মুজিজা আগেরটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল এবং প্রত্যেকটি আগেরটির চেয়ে আরো অধিক শক্তিশালী ও স্পষ্ট ছিল। কিছু মুফাসসির বলেন, প্রথম নিদর্শন একটি সত্য প্রমাণ করেছিল, দ্বিতীয়টি সেটিকে আরো স্পষ্ট করেছিল। এভাবে প্রতিটি নিদর্শন পূর্ববর্তীটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এখানে ‘ভ্রাতৃত্ব’ বলতে বোঝানো হয়েছে—সাদৃশ্য, মিল ও পারস্পরিক সম্পর্ক। যেমন বলা হয়—এটি ওটির সাথি বা এটি ওটির অনুরূপ।

এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—ওপরের আয়াতগুলোর আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়, ঐক্যবদ্ধ ভাইয়েরা শক্তিশালী হয় আর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এটাই প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের অন্যতম ফল। যখন ঈমান, নৈতিকতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে, তখন ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি শক্তিশালী হয়। আর যখন এই ভ্রাতৃত্ব ভেঙে যায়, তখন দুর্বলতা, বিভক্তি ও পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের ভ্রাতৃত্বকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা ও ঐক্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী মুসলিম সমাজ গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

স্রষ্টার অন্যতম মহা নিদর্শন হলো মানবদেহের হাড়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
স্রষ্টার অন্যতম মহা নিদর্শন হলো মানবদেহের হাড়
সংগৃহীত ছবি

মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের অনন্য নিদর্শন। কিন্তু আমরা সচরাচর এমন এক অমূল্য নিয়ামতের কথা খুব কমই ভাবি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পুরো শরীরের কাঠামো—তা হলো হার বা হাড্ডি।

এটি শুধু শরীরের একটি অংশ নয়; বরং মানবজীবনের চলাফেরা, ভারসাম্য, শক্তি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুরক্ষা এবং দৈহিক সৌন্দর্যের অন্যতম ভিত্তি। মানুষ যতই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করুক না কেন, একটি জীবন্ত হাড় সৃষ্টি করার ক্ষমতা তার নেই। এ কারণেই পবিত্র কোরআন মানুষকে বারবার নিজের সৃষ্টির দিকে তাকাতে, চিন্তা করতে এবং স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করতে আহবান জানিয়েছে।
কোরআনের আলোচনায় মানুষের হাড় শুধু একটি শারীরিক অঙ্গ নয়; বরং তা সৃষ্টি, পুনরুত্থান এবং আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার জ্বলন্ত প্রমাণ। যে ব্যক্তি নিজের হাড়ের দিকে গভীরভাবে তাকায়, সে সহজেই উপলব্ধি করতে পারে—এমন নিখুঁত পরিকল্পনা ও সুসমন্বিত কাঠামো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি। মহান আল্লাহ মানুষের সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করলাম, তারপর সেই জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করলাম, এরপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে হাড় সৃষ্টি করলাম, অতঃপর সেই হাড়কে মাংস দ্বারা আবৃত করলাম। তারপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম। অতএব কতই না বরকতময় আল্লাহ, সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১৪)

এই আয়াতে মানবভ্রূণের বিকাশের যে ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে, তা আল্লাহর সৃষ্টিকৌশলের বিস্ময়কর নিদর্শন। মানুষের শরীরে শত শত হাড় এমনভাবে বিন্যস্ত যে এগুলো ছাড়া দাঁড়ানো, হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা সামান্য নড়াচড়াও সম্ভব হতো না। অবিশ্বাসীরা একসময় প্রশ্ন তুলেছিল—মৃত্যুর পর মানুষের পচে-গলে যাওয়া হাড় আবার কিভাবে জীবিত হবে? তাদের এই সংশয়ের জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সে আমার সম্পর্কে উপমা বর্ণনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টি ভুলে গেছে। সে বলে, কে জীবিত করবে এই হাড়গুলোকে, যখন তা পচে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার এগুলো সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এগুলোকে পুনরায় জীবিত করবেন। তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৭৮-৭৯)

এ আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, প্রথমবার যিনি মানুষকে অস্তিত্ব দান করেছেন, তাঁর জন্য পুনরায় সৃষ্টি করা কোনো কঠিন বিষয় নয়। তাই হাড়ের পুনরুত্থান অস্বীকার করা মূলত আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে অস্বীকার করার শামিল। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে, আমি তার হাড়গুলো একত্র করব না? অবশ্যই করব। বরং আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত যথাযথভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম।’ (সুরা : কিয়ামাহ, আয়াত : ৩-৪)

এখানে আঙুলের অগ্রভাগের উল্লেখ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি আল্লাহ মানুষের প্রতিটি অঙ্গের সূক্ষ্মতম বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। কিয়ামতের দিন তিনি মানুষকে সম্পূর্ণ অবিকল অবস্থায় পুনরুত্থিত করবেন।

কোরআনে আরেকটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর এক বান্দা দীর্ঘ সময় মৃত্যুর মতো অবস্থায় থাকার পর পুনর্জীবিত হলে তাঁকে একটি গাধার হাড় দেখিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি হাড়গুলোর দিকে তাকাও—আমি কিভাবে সেগুলো জোড়া লাগাই, তারপর সেগুলোকে মাংস দ্বারা আবৃত করি।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৯)

এ দৃশ্যের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়প্রাপ্ত হাড়কে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ দেহে পরিণত করা তাঁর জন্য অত্যন্ত সহজ।

মানবদেহের হাড়ের গঠন যতই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, ততই স্পষ্ট হয় সৃষ্টিকর্তার প্রজ্ঞা। কোথাও শক্ত কাঠামো, কোথাও নমনীয় সংযোগ, কোথাও মজ্জা উৎপাদনের ব্যবস্থা, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্ষার জন্য বিশেষ আকৃতির হাড়—সব কিছু এক অসাধারণ পরিকল্পনার পরিচয় বহন করে। মাথার খুলি মস্তিষ্ককে রক্ষা করে, পাঁজরের হাড় হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসকে নিরাপত্তা দেয়, মেরুদণ্ড পুরো শরীরের ভার বহন করে এবং হাত-পায়ের হাড় মানুষকে চলাফেরা ও কর্মক্ষমতা দান করে। এ সবই আল্লাহর অসীম হিকমত ও কুদরতের বহিঃপ্রকাশ।